রূপকথা থেকে পরিণত প্রজ্ঞার জগতবাসী

আবুল মোমেন
Hayet-Mahmud-2

হায়াৎভাই বন্ধুবৎসল উদার মনের মানুষ। তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতার ছোঁয়া একটু কাছে গেলেই পাওয়া যায়। শৈশবেই যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগের মত ইতিহাসের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ মর্মান্তিক সব অভিজ্ঞতার স্বাদ পেলেও এক প্রীতিময় ইতিবাচক মন নিয়েই তিনি আজীবন পথ চলেছেন। সে মনের গোড়াপত্তন তো নিশ্চয় শৈশবেই হয়েছে। সে মনটা স্বভাবত সরল। তবে তাঁর মানসজগতের মূল রসদ সাহিত্য। সাহিত্যের পাঁড় পাঠক তিনি। তাঁর সময়ের অনেকের মতই বুদ্ধদেব বসুর স্কুলেরই অনুসারী ছিলেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ যেন তার ইতিহাসের মতই সংবেদন ও মননশীল বুদ্ধিজীবীদের মানসজগৎটি পুনর্নির্মাণ করে নিয়েছিল। কবিতা দিয়েই লেখালেখির শুরু হলেও অচিরেই তাঁর মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে প্রবন্ধ। আর সময়ের প্রয়োজনে সাহিত্য ছাপিয়ে ক্রমে সমাজ তাঁর ভাবনার বিষয় হয়ে ওঠে। সে সূত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। হায়াৎভাইয়ের ছাত্রজীবন এবং তারুণ্যে গত শতকের ষাটের দশক জুড়েই এ দেশে ও সারা বিশ্বে তরুণসমাজের মধ্যে জোরদার হয়েছে সমাজতন্ত্রের ঢেউ। তাতে হায়াৎভাইও জড়িয়ে পড়েছিলেন। ছাত্রজীবনে হয়ত ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদের সাথে আলতোভাবেই ছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার আগে ও পরে প্রগতিশীল নানা সংগঠনের সাথে তাঁর রীতিমত সাংগঠনিক যোগাযোগ তৈরি হতে থাকে। এ সময় হায়াৎভাই চট্টগ্রামে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। উদীচী, খেলাঘর, বাংলাদেশ-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি, আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদ, শান্তি পরিষদ ইত্যাদি সোভিয়েত ঘরানার নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁকে যুক্ত করে নিয়েছিল। আর স্বাধীনতার আগে ১৯৬৮ তে ম্যাক্সিম গোর্কির শতবার্ষিকী বা ১৯৭০ এ লেনিন শতবার্ষিকীতেও হায়াৎভাই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে ঢাকায় রাজনীতি ঘেঁষা প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর, যা হয়ত এ বয়সে এখনো আছে।
হায়াৎভাইয়ের জীবনের প্রধান অংশ ঢাকায় কেটেছে ও কাটছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অংশ মস্কো এবং কলকাতায় কাটিয়েছেন তিনি। আরেকটি অংশ কেটেছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে অধ্যাপনা করেছেন, মস্কোতে প্রগতি প্রকাশনীতে অনুবাদকের কাজ করেছেন আর কলকাতায় পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং শিশু-কিশোর সাহিত্য মূলত তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র। ছোটদের জন্যে নানান রকম বই লিখেছেন – জীবনী, ভাষাবিষয়ক লেখা, চিরায়ত শিশুসাহিত্যের অনুবাদ, বাংলা প্রাইমার ইত্যাদি।
১৯৬৮ তে চট্টগ্রামের বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইঘর-এর সহপ্রতিষ্ঠান শিশু সাহিত্য বিতান থেকে প্রকাশিত হয় এক অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ – রবীন্দ্রনাথ : কিশোরজীবনী। যেমন রচনার বৈভব তেমনি প্রকাশনার সৌষ্ঠব। প্রকাশমাত্রই বইটি ছোটবড় সবার নজর তো কাড়েই, মনও কেড়ে নেয়। সেকালে, বা এখনো, আমাদের দেশে গ্রন্থজগতে বিক্রিতে সেরা বা বেস্ট সেলার নির্ধারণের রেওয়াজ ছিল না, নেই। তবে অনায়াসে বলা যায় হায়াৎ মামুদের এই রবীন্দ্রজীবনী দীর্ঘদিন এদেশে বিক্রয়ের শীর্ষে ছিল। ছোটদের উপহার দেওয়ার সেরা বই বিবেচিত হত এটি।
হায়াৎভাইয়ের ভাষা প্রাঞ্জল কিন্তু চিত্রময়, গতিশীল এবং বাঙ্ময়। জীবনী, তাও রবীন্দ্রনাথের মত বহুপ্রজ মহাব্যস্ত লেখক মনীষীর ঘটনাবহুল জীবন তো তথ্যে ঠাসা হওয়ার কথা, তাতে বই হয়ে উঠতে পারত তথ্য-ভারাক্রান্ত, খুদে পাঠক তথ্যের ভারে ও ভিড়ে সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ত, পড়া এগুতো না। কিন্তু কবির জীবনের নানা ঘটনা তো নিছক তথ্য নয়, এক মহান জীবনের বিচিত্র তাৎপর্যকে তুলে ধরে, বিবৃত করে। আর ভাষার যথাযথ শৈলীতে জীবনকাহিনী বলা গেলে তা কতটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তাই যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন হায়াৎ মামুদ। বলা যায়, এ হল ভাষার জাদু। এই জাদুকরি ভাষা ও প্রাঞ্জল বর্ণনার কিছু নমুনা তুলে না ধরলে হয় না।
প্রথম নমুনাতে পাব শান্তিনিকেতনে কবির বহু বছরের স্বপ্নলালিত প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার খবর-
দেখতে-দেখতে পৌষ উৎসব এসে গেল। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার আয়োজন চলছে। এরই মধ্যে একদিন গান্ধীজী জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ঘণ্টা চারেক ধরে আলাপ করে গেলেন কবির সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে।
৮ই পৌষ ১৩২৮ সন, ইংরেজি ১৯২১-এর ২৩ শে ডিসেম্বর। সকালবেলায় বিশ্বভারতীর উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠিত হল শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে। আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন। কুড়ি বছরের ব্রহ্মচর্যাশ্রম এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্বভারতী’তে রূপায়িত হল। একে একে বিশ্ববিশ্রুত অধ্যাপক ও মনীষীবৃন্দ আসতে লাগলেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এ-মিলনতীর্থে : ভারততত্ত্ববিদ্‌ অধ্যাপক সিল্‌ভ্যাঁ লেভি, অধ্যাপক হ্বিন্টের্‌নিট্‌স্‌; নন্দনতাত্ত্বিক শ্রীমতী স্টেলা ক্রাম্‌রিশ্‌; ফার্সি ভাষা ও ইসলামীয় ইতিহাসে বিশেষজ্ঞ রুশ পণ্ডিত বগ্‌দানফ্‌ ও ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ হাঙ্গেরীয় পণ্ডিত ইউলিয়ুস্‌ গের্মানুস্‌; প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী মার্ক কলিন্স। আর এতকালের সুহৃদ পিয়ার্সন, এণ্ড্রুজ, এল্‌ম্‌হার্স্ট – এঁরা তো আছেনই। (পৃ : ৪৮, প্রতীক প্রকাশনী, ২০১৩)
দ্বিতীয় নমুনায় হায়াৎভাই কবির মৃত্যুর বয়ান দিয়েছেন সংযত আবেগের শালীন মর্যাদায় –
একুশে শ্রাবণ সন্ধ্যা। শান্তিনিকেতনের চীনা ভবনের অধ্যাপক এসেছেন, কবির বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের তস্‌বি গুনতে গুনতে উপাসনা করলেন। কবিকে শোয়ানো হয়েছে পূর্ব-পশ্চিমে, পুব দিকে মাথা রেখে শায়িত। পুবের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, রাখী পূর্ণিমা। অনেকদিন আগে গান লিখেছিলেন – ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’ আর ‘পূর্ণ চাঁদের মায়ায়’।
রাত শেষ হয়ে গেল অচৈতন্যের ভিতর। চিরকালের সূর্য আর দেখলেন না। অন্তিম নিশ্বাস পড়ল স্তব্ধ দুপুরে; তখন বারোটা বেজে দশ মিনিট। ২২ শে শ্রাবণ ১৩৪৮ সাল।
ঘর লোকে লোকারণ্য। পুরোনো দিনের চাকর বনমালী এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। অন্তিম শয্যার প্রতিটি মুহূর্ত ছায়ার মতো সে এই ঘরে আশেপাশে ঘুরেছে। আজ গণ্যমান্য লোক গিজগিজ করছে ঘরের ভিতরে। ভিড় ঠেলে কেমন করে পৌঁছুবে সে তার বাবামশায়ের কাছে? কে একজন ডাক দিল, ‘বনমালী। এস, এগিয়ে এসে দেখ। ভালো করে দেখ। শেষ বারের মতো। আর তো দেখতে পাবে না।’
সারা কলকাতা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাংলাদেশের ও বাঙালি জীবনের শেষ জ্যোতির কণিকা নিভে গেল। (পৃ: ৮১, ঐ)
বইটা শুরুই করেছেন খুব মজা করে। কবির জীবনী, তাই কবিতা পড়ার স্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা দিয়েই শুরু – ‘সেদিন বাইরে কী দারুণ বৃষ্টি। সেই যে রাত থেকে আরম্ভ হয়েছে একটি বারও থামেনি। পড়ছে তো পড়ছেই।’ বৃষ্টির অবিরাম টাপুরটুপুর শব্দ, টইটুম্বুর বুদ্বুদ! কিন্তু তাও তাঁর মনের শান্তি নেই, এমনকি একটু ঈর্ষা আর অস্থিরতা কাজ করছিল। কেন? না, একটা বই হাতে পেতে হবে, কবিতার বই, পড়তে হবে একটি কবিতা – ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এলো বান’। হ্যাঁ রবীন্দ্রনাথের কবিতা। তারপরে বলছেন – ‘কবিতা তোমরা ভালবাস না? ছোট্টবেলায় ঐ যেরকম কবিতায় পেয়েছিল একদিন আমাকে, হাজার বার না-পড়া অবধি তৃপ্তি ছিল না আমার, সেরকম কবিতার জ্বর হয়নি তোমাদের?’
কৈশোরের এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ধীরে ধীরে কিশোর-পাঠকদের তিনি নিয়ে এলেন কবির জীবনকথায়। কখন যে কবির জীবন কিশোর-মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে তা টের পাওয়ার আগেই পাঠ এগিয়ে চলে। ৮০-৮৫ পৃষ্ঠার বই, আর নোবেলজয়ী বিশ্বকবির জীবন তো নিত্যদিন নানা ঘটনা আর বিচিত্র অপরূপ সব সৃষ্টিতে ভরপুর, সে জীবনের আসল ঘটনাগুলো হায়াৎভাই তুলে এনেছেন। যেসব ঘটনা ও সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর চমৎকার বর্ণনা রবীন্দ্রনাথকে চিনতে সাহায্য করে কিশোর পাঠককে।
ডাকঘরের কথা হায়াৎভাই কিশোরের মনে রেখাপাত করিয়ে দেন। ‘ডাকঘর পড়েছ তোমরা? সেখানে অমল নামে তোমাদের বয়সী এক ছেলে আছে। অসুখ করেছে, কবরেজ বলছে, বাড়ির বাইরে বেরুবে না। সারাদিন সে বাড়ির মধ্যে বন্দি থাকে। নিজে বাইরে বেরুতে পারে না, কিন্তু মন বেরিয়ে যায়।’ অমলের সাথে আরো গাঢ় পরিচয় করিয়ে দেন লেখক। খুদে পাঠক তাকে ভুলবে কী করে? কৈশোরের এই পাঠ বড় হয়ে নিশ্চয় তাকে ডাকঘরের গভীরতর তাৎপর্য বুঝতে সাহায্যে করবে। তাই হায়াৎভাই বলছেন – ‘ডাকঘর পড়বে তোমরা। একবার পড়লে সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকবে।’
নোবেল পুরস্কারের জন্যে এক বাঙালি কবির নাম বিবেচিত হওয়া, শেষ পর্যন্ত তাঁর পুরস্কার পাওয়া – পুরো ঘটনার মধ্যে যত নাটকীয়তা, উত্তেজনা সবটাই অল্প কথার আঁচড়েই তিনি তুলে এনেছেন। নবীন পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে তুলে দিয়েছেন নোবেল পুরস্কারের শংসাবচন।
রবীন্দ্রজীবনে যেমন নানা প্রাপ্তি আছে তেমনি আছে অনেক দুঃখ, নিজের সন্তানসহ প্রিয়জনদের মৃত্যুর শোক। আছে দেশের কথা, গুরুত্বপূর্ণ কাব্য ও অন্যান্য রচনার প্রসঙ্গ, বিশিষ্ট জনদের সাথে সাক্ষাতের কথা। বিস্তারিত আছে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার বিবরণী। এ বইতে খুদে পাঠক পরিচিত হয় রবীন্দ্রজীবনকে ঘিরে সেকালের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব আর স্বয়ং এক বিশ্ববরেণ্য কবির অপূর্ব সব সৃষ্টির সাথে।
তাঁর গদ্য যেহেতু মাধুর্যমণ্ডিত হয়েও জটিল ভাবপ্রকাশে সমর্থ, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে সক্ষম তাই হায়াৎ মামুদের পক্ষে নানা বিষয়ে গদ্য লেখা ছিল সহজ। আমাদের শিক্ষিত সমাজে ভালো গদ্য লিখিয়ের সংখ্যা কম, গভীর জটিল ভাবসমৃদ্ধ বিষয় প্রাঞ্জলভাবে লিখতে পারেন এমন মানুষ হাতে গোনা। তাই স্বভাবতই তাঁকে নানা ফরমায়েশি গদ্যের চাপ নিশ্চয় বইতে হয়েছে। আর যেদেশের ইতিহাস বারবার হোঁচট খেয়ে চলেছে; ফলে তার সাথে তাল রেখে থামা আর পিছিয়ে পড়ে আবার চলার প্রয়াসেই কেটেছে তাঁরও জীবনকালটা, তাই তাঁকে ইতিহাসের সে দায়ও মেটাতে হয়েছে। এরই মধ্যে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক বাংলা কবিতা, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির নানা গ্রন্থি নিয়ে তাঁকে বারবার লিখতে হয়েছে। হয়ত সময়ের বা সমকালের দাবি পূরণ করতে করতে আরো অনেকের মতই হায়াৎভাইয়েরও নিজের ভাবনার, স্বপ্নের, পরিকল্পনার অনেক লেখাতেই আর হাত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে পিছন ফিরে তাকালে বোঝা যায় তাঁর রচনার ভাণ্ডার তো কম বড় ও কম সমৃদ্ধ নয়। তাঁর চর্চার আরেকটি ক্ষেত্রের কথা বলতেই হবে। সেটা হল অনুবাদ। তাঁর দক্ষ যোগ্য হাতে বেশ কিছু ভালো অনুবাদ হয়েছে।
তাতে মনীষী হুমায়ুন কবীরের রবীন্দ্রবিষয়ক ইংরেজি বক্তৃতার অনুুবাদ যেমন আছে তেমনি আছে হান্স অ্যাণ্ডার্সনের ছোটদের রূপকথাও। হায়াৎভাইয়ের জগৎটা রূপকথা থেকে গভীর মননের পরিণত প্রজ্ঞা অবধি বিস্তৃত।