রুপালি গিটার ফেলে বহু দূরে আইয়ুব বাচ্চু

সিফায়াত উল্লাহ

এই রুপালি গিটার ফেলে/ একদিন চলে যাব দূরে/ বহু দূরে/ সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো/ গোপন করে …।

হেমন্তের আকাশ যখন শীতের আগমনী বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, তখনই এলো বিদায় বার্তা। দেশীয় ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু এক অচিন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যেখান থেকে তিনি আর কখনো ফিরবেন না। তিনি আমাদের দেশের ব্যান্ড সংগীত ভুবনে ফেরারি পাখি হয়ে এসেছিলেন ক্ষণিকের তরে। সংগীতের অমিয়ধারায় আমাদের সিক্ত করে আবার পাড়ি জমালেন অজানায়।
মানুষের বেঁচে থাকার দুটো রূপ। একটি শারীরিক, আরেকটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে বহুকাল নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। পরেরটিকে আমরা বলি কালজয়ী। সে জন্যে খুব বেশি কাজের দরকার হয় না। আইয়ুব বাচ্চু যদি ‘চলো বদলে যাই’-এর পর আমাদের ব্যান্ড সংগীতের আর কিছু নাও বদলে দিতেন, থাকতেন। বেঁচে থাকতেন অনায়াসে। সেই কবে তিনি গেয়েছিলেন, ‘সবাইকে একা করে চলে যাব অন্ধ ঘরে’। সেই অন্ধ ঘরে চলে গেলেন, রুপালি গিটারের সাধক, কিংবদন্তি ব্যান্ড সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু।
গত বছর সংগীতশিল্পী লাকী আখন্দের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু লিখেছিলেন, ‘হাসি-গানে ভরা, এইতো-জীবন। সাজানো পৃথিবী তারপর মরণ। অথচ কত সুন্দর পাহাড়ি ঝরনা। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সবটুকু থাকবে আজীবন আপনার জন্য, শ্রদ্ধেয় লাকী আখন্দ ভাই। রাতের আকাশ থেকে হঠাৎ করে ছিটকে পরা ধ্রুবতারার মতো অনেক অভিমান নিয়ে! এভাবে হুট করে চলে যাওয়াটা মেনে নেয়া আমাদের সবার জন্য ভীষণ কষ্টের। কিন’ জানিয়ে দিয়ে গেলেন আমাদের সবাইকেই ফিরতে হবে একদিন না একদিন, একে একে ওই না ফেরার দেশে।’ আর নিজের বলা কথা মতোই ওই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন প্রিয় শিল্পী।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতকে আইয়ুব বাচ্চু দুহাত ভরে দিয়েছেন। তার সৃষ্টিশীলতায় পরিপূর্ণ হয়েছে ব্যান্ড সংগীতাঙ্গন। বাচ্চু শুধু গলা দিয়েই মুগ্ধতা ছড়াননি, দক্ষতার সঙ্গে বাজিয়ে গেছেন গিটার। এজন্য আইয়ুব বাচ্চুকে বাংলাদেশের ব্যান্ড ও গিটারের জগতে নক্ষত্র বলে অভিহিত করা হয়। দেশের ব্যান্ড সংগীত এতদূর আসার পেছনে আইয়ুব বাচ্চুর কীর্তি অনেক।
যার গান শুনে, গিটারের টানে এখনকার বহু যুবকের কৈশোর কেটেছে, প্রিয় শিল্পী চলে যাওয়ার তাদের মাঝে হাহাকার দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছিলে শোকের ছায়া। বেসরকারি উন্নয়ন সংস’া ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান তার ফেইসবুক লিখেছেন, ‘কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর খবরটা তেমনি। আমাদের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যকে যারা রাঙিয়েছেন, তিনি সেই তালিকায় ওপরের দিকে।’ গণমাধ্যমকর্মী গাজী নাসির উদ্দিন লিখেছেন, বাচ্চু ভাই, আপনার লাশ বইবার শক্তি আমাদের নাই।’ সমর বড়-য়া নামে একজন লিখেছেন, ‘মাত্র ৬শ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন, এই রূপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব বহুদূরে, সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে- গানে গানে সেকথা বলেছিলেন। আজ সত্যি হলো।’ এরকম হাজারো স্ট্যাটাসে ভরা ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শরীর খারাপ লাগলে আইয়ুব বাচ্চু তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে ফোন করেন। এরপর গাড়িচালক তাকে নিয়ে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইয়ুব বাচ্চু ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামের এনায়েতবাজার এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। আইয়ুব বাচ্চু ডাকনাম- রবিন। তার সংগীত জীবন শুরু হয় ১৯৭৭। হারানো বিকেলের গল্প তার প্রথম গান। প্রথম ব্যান্ড ফিলিংস (১৯৭৮)। এরপর যোগ দেন সোলসে। ১৯৮০ থেকে পরবর্তী এক দশক এই ব্যান্ডে যুক্ত ছিলেন। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম রক্তগোলাপ (১৯৮৬)। এলআরবির প্রথম অ্যালবাম: এলআরবি (১৯৯২)। এ ছাড়া অনেক মিশ্র অ্যালবামে কাজ করেছেন তিনি। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রেও গেয়েছেন। তার আম্মাজান গানটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ধরা হয়।
আজ শুক্রবার বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহে আইয়ুব বাচ্চুর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁর মরদেহ রাখা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর কিংবদন্তি এই সংগীতশিল্পীর মরদেহ আনা হবে চট্টগ্রামের পৈতৃকনিবাস এনায়েত বাজারে। আইয়ুব বাচ্চুর মেয়ে ও ছেলে বিদেশ থেকে আসার পরই শনিবার বাদ আছর দামপাড়াস’ জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠে তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে চৈতন্যগলি কবরস’ানে মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন আইয়ুব বাচ্চু।