রিসালাতুন নাজাত বা মুক্তির বার্তা

ড. সেলিম জাহাঙ্গীর

পাঠকের সাথে লেখকের যে সম্পর্ক তাই সাহিত্য। এ ক্ষেত্রে পাঠক সমাজের চিরকাঙ্ক্ষিত কোন চিরায়ত শাশ্বত বিষয়ের প্রতি আন্তরিকভাবে গুরুত্বারোপ করে কোন মহৎ লেখক যদি কলম ধরেন তখন লেখক ও পাঠকের মধ্যে একটি মধুর মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। বলাবাহুল্য, বিনি সুতোর মালার মতো এ অনুপম মেলবন্ধন অনেক সময় আত্মীয়তার যোগসূত্রকেও ডিঙ্গিয়ে একটি ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ অনাবিল প্রশান্তির সম্পর্ক গড়ে তোলে। যার স্নিগ্ধতার পরশে উভয় পক্ষই স্নাত হয়। এ এক অপার আনন্দ, ফলে গড়ে ওঠে এক শাশ্বত মধুর সম্পর্ক। বৃহত্তর পাঠক সমাজ লেখককে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক পর্যায়ের আত্মার সম্পর্ক।
আর এখানেই হলো পাঠকের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীলতা, সর্বোপরি মমত্ববোধ মিশ্রিত একজন জীবনধর্মী লেখকের প্রকৃত সার্থকতা ও লেখালেখির মৌলিক চাহিদা পূরণের কথকতা।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষের এ ভূখণ্ডে মহাসমুদ্ররূপী মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার উদ্ভবের সূচনাপর্বে, ইতঃপূর্বে চলে আসা রাষ্ট্রভাষায় ফার্সীর চলমান প্রভাব, সর্বোপরি ধর্মীয় কারণে মুসলিম মানসে আরবি-উর্দু-ফার্সীর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে এ ত্বরিকার মৌলিক কর্মকাণ্ড মূলত আরবি-উর্দু-ফার্সী ভাষায় সম্পাদিত হতো। এমনকি এর তাত্ত্বিক প্রচার-প্রসারও হতো আরবি-উর্দু-ফার্সীতে।
বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে শতাব্দীর সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় সমাজজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরবি-উর্দু-ফার্সীর প্রভাব অনেকাংশে কমে এসে বাংলা নামক এ ভূখণ্ডে, বাঙালির বাংলা ভাষার ব্যাপক চর্চার কারণে আরবি-উর্দু-ফার্সীর চর্চা প্রায় উঠে গিয়েছে বললেই চলে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রচারিত ও প্রকাশিত মাইজভাণ্ডারী সাহিত্যে অন্তর্লীন স্রোতধারার মতো, ফল্গুধারার মতো আরবি-উর্দু-ফার্সীর যে প্রভাব তা আজও প্রায় সমানতালে প্রবহমান।
কালের বিবর্তনে সময় ও ভাষার পরিবর্তনের ফলে আদি মাইজভাণ্ডারী সাহিত্যের সাথে প্রায় দেড়শত বছরের পরের সময়কালের যে ফারাক, ভাষাগত যে দূরত্ব, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সমকালীন সর্বস্তরের পাঠকের মন-মানসিকতার সাথে সঙ্গতি রেখে সীমিত পরিসরে হলেও পরীক্ষামূলকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন লেখক মোহাম্মদ শাহেদ আলী চৌধুরী। কিন্তু পূর্বোক্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই তাঁর এ গ্রন্থটি বিশেষভাবে বিবেচ্য।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে নবী আখেরুজ্জামান হযরত আহমদ মুজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.) এর শরিয়তি ও মারফতি মাহাত্ম্যের ধারায় তাসাউফ জগতের কথা, কাদেরিয়া ত্বরিকার সিলসিলায় মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার প্রবর্তকসহ এ ত্বরিকার স্বনামধন্য মহান বুজুর্গদের সংক্ষিপ্ত জীবনী, সর্বোপরি তাঁদের জীবনদর্শনের আলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ত্বরিকাভুক্ত মুরিদানদের, একান্ত আশেকভক্তজনদের জন্য নির্ধারিত নির্বাচিত মোনাজাত এর সহজ-সরল বঙ্গানুবাদের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। দীর্ঘ সময়কাল ধরে দরবারের খেদমতে নিজেকে নিবেদনের অভিজ্ঞতা তাঁকে এ কাজে প্রণোদনা যেমন যুগিয়েছে তেমনি মাইজভাণ্ডারী ঘরানার সুপরিচিত জীবনধর্মী পাঠক বান্ধব শব্দ চয়ন তাঁর লেখাকে জীবন ঘনিষ্ঠ ভাবে নতুন মাত্রা দান করেছে।
বলাবাহুল্য, সামগ্রিক মাইজভাণ্ডারী সাহিত্যের প্রতি তুলনায় পরীক্ষা পর্বের ফসল এই একান্ত আন্তরিক উদ্যোগ সীমিত পর্যায়ের হলেও কালের বিচারে এর ব্যঞ্জনাধর্মী বিশেষত্ব আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আমি লেখকের পাঠক বান্ধব প্রয়াসের পরীক্ষা পর্বের এ চমৎকার ফসলের বহুল প্রচার এবং একইসাথে প্রবহমান ধারায় তাঁর সৃজনশীল লেখনীর উত্তরোত্তর সাফল্য ও বিকাশ একান্তভাবে কামনা করছি।

লেখক : সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ফিনিস একাডেমী
হেলসিংকি- ফিনল্যান্ড।