দুবাই কনস্যুলেটে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সংগ্রহ

রাত-ভোর বারান্দায়!

কামরুল হাসান জনি, ইউএই

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সকালের তাপ, দুপুরের তপ্ত গরম, বিকেলে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রমজান। একপ্রকার অসহায় হয়েই লাইন ছেড়ে হাতের কাগজটি নিয়ে এদিকে ওদিক ঘুরছেন। সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট ঘামে আর বালিতে ময়লাটে হয়ে গেছে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উদ্দেশ্য চলতি মৌসুমে আরব আমিরাত সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া। খুব বেশি দেরি হয়নি, মরুর বুকে মাত্র ছয় বছর তার। থাকেন শারজা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ায়। কথায় কথায় রমজান বললেন, রাত ২টায় এসেছি সিরিয়াল ধরতে। সকালে এলে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। গেইট খোলার পর থেকে লম্বা লাইন, অপেক্ষা। এখন বিকাল ৫টা, কাউন্টার পর্যন্তও পৌঁছতে পারিনি এখনও।’
রাজবাড়ীর আলমগীর হোসেন, আজমান প্রবাসী। দীর্ঘদিন অবৈধ ছিলেন আমিরাতে। চলতি সাধারণ ক্ষমায় বৈধ হবার সুযোগ রয়েছে তারও। তাই হাতে লেখা পাসপোর্টের বদলে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে এসেছেন। পুরাতন পাসপোর্টের ফটোকপি, স’ানীয় ইমেগ্রেশনের পেপার, জন্মসনদসহ যাবতীয় কাগজ পত্রের একটি প্লাস্টিকের ফাইল হাতে। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর পর ওই ফাইল দিয়ে বাতাস করছেন নিজের শরীরে। অপেক্ষার সময় কাটতেই চায় না তার। কপালের উপর জমে থাকা ঘাম মুছে আলমগীর বললেন- ‘ফজরের আজান কনস্যুলেটে এসে শুনেছি। তখন থেকেই গেইটের বাইরে অপেক্ষায় ছিলাম। সকালে গেইট খোলার পর সিকিউরিটির লোকেরা কয়েকজন করে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে, বাকিদের বাইরে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। খুব অসহায়ের মত ভেতরে ঢোকার সুযোগ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই কাউন্টার, ওই কাউন্টার করে ঘুরেছি সারাদিন।’
সিলেটের নওফেল মিয়া ওদের মত নয়। নতুন পাসপোর্টের জন্যে আঙুলের ছাপ দিয়েছিলেন দুই মাস আগে। তাই নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে এসেছেন কনস্যুলেটে। নতুন পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের ভিড় ঠেলে যাবার উপায় নেই তার। কাজ কর্ম টোকেন সিস্টেমে হয়। প্রথমে টোকেন সংগ্রহ করে লাইনে দাঁড়াতে হয়, লাইন শেষ হলে মিলে কাঙ্ক্ষিত পাসপোর্ট। নওফেল এর চোখ ওই একটি মাত্র কাউন্টারের দিকে। ছোট একটি গ্লাসের জানালায় উঁকি দিয়ে তাকিয়ে তখনও তার মত অসংখ্য চোখ। নিজের পাসপোর্ট কখন, কবে নাগাদ পাবে নওফেল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অথচ তারও অপেক্ষা ভোর থেকে। তার ভাষ্যমতে ‘রাত তিনটায় এলেও একটা পাসপোর্টের জন্যে বিকেল পাঁচটা হচ্ছে। আজ পাবো কিনা তাও বুঝে উঠতে পারছি না।’
রমজান, আলমগীর, নওফেলদের মত প্রতিদিন হাজারও প্রবাসীর ভোর হয় এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেটের বারান্দায়। আরব আমিরাত সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ কাজে লাগাতে তাদের এমন অপেক্ষা। চলতি মৌসুমে আমিরাত সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে ১ আগস্ট থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অবৈধ থেকে বৈধ হবার লক্ষ্যে প্রতিদিন তারা এভাবেই ছুটে আসছেন কনস্যুলেটে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, নিয়ম করেই সেবা গ্রহণ করতে আসা প্রবাসীরা সঠিক তথ্য সেবা না পেয়ে যেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি কনস্যুলেট প্রাঙ্গণে ঘুরঘুর করা দালালদের হাতেও জিম্মি হচ্ছেন অনেকে। অভিযোগ উঠছে, তথ্য সেবা নিতে কাউন্টারে কাউন্টারে ঘুরা প্রবাসীরা কনস্যুলেটে কর্মরত কতিপয় কর্মচারীর খারাপ আচরণে অতিষ্ঠ। একইভাবে কিছু অসাধু কর্মচারীর সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে দালাল চক্র। যারা দ্রুত কাজ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে অসহায় প্রবাসীদের থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।
জানা গেছে, দৈনিক প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার প্রবাসী ভিড় করেন দুবাই ও উত্তর আমিরাত বাংলাদেশ কনস্যুলেটে। উত্তর আমিরাতের অধীনস’ দুবাই, শারজা, আজমান, উম্ম আল কোয়াইন, রাস আল খাইমা ও ফুজাইরা শহর হতেই এখানে সেবা নিতে আসেন প্রবাসীরা। কার্যত টোকেন সংগ্রহ করতে পারেন আট’শ থেকে একহাজার প্রবাসী। তার মধ্যেও কাজ হয় মাত্র ছয়’শ থেকে আট’শ জনের। বাকিদের তথ্য সেবা কেন্দ্র ও কাউন্টার থেকে আবার পরের দিন অথবা অন্য তারিখে আসার কথা জানানো হয়। এই করে চলতি সাধারণ ক্ষমার কার্যক্রমের চলে গেছে ৫৫ দিন। বাকি আছে আর মাত্র ৩৭ দিন। দুবাই বাংলাদেশ কনস্যুলেট হতে প্রদত্ত তথ্য মতে গত সোমবার পর্যন্ত সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে আউট পাস সংগ্রহ করেছে ৪,৩৪০ জন, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট পেয়েছেন আগস্ট মাসে ৯,১৩৫ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ৯,২৩৬ জন। এছাড়া হাতে লেখা পাসপোর্টের সেবা গ্রহণ করেছেন ৪,২৪৭ জন প্রবাসী। সাধারণ ক্ষমা কার্যক্রম শুরু থেকেই কনস্যুলেটের লোকবলের অভাব পরিলক্ষিত হলেও তেমন কোনো জরুরি ব্যবস’া বা সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সরকারি এই দপ্তর। তবে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে আগের মতোই। লোকবল কম হওয়ায় নির্ধারিত কর্মীদের কাজ করতে হচ্ছে সকাল সাতটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত। কখনো কখনো বন্ধের দিনও হাজির হতে হচ্ছে অফিসে। পাসপোর্ট সেক্টরে কর্মরত হাফেজ উল্লাহ জানান, ‘সাধারণ ক্ষমা কার্যক্রমের শুরু থেকে আমাদের প্রতিদিন প্রায় রাত ১২টার সময় বাসায় ফিরতে হয়। লক্ষ্য থাকে প্রবাসীদের যথাযথ সেবা প্রদান করা। আগের তুলনায় আমাদের দ্বিগুণ কাজ করতে হচ্ছে এখন।’
এদিকে, প্রবাসীদের এমন দুরবস’ায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছে কমিউনিটির কেউ কেউ। সাধারণ ক্ষমা চলাকালীন সময় তথ্য সেবা দিতে বাংলাদেশ কমিউনিটি থেকে চার জন ও সৈয়দ আহাদ ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন থেকে আরো নয় জন কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এসব প্রসঙ্গে কথা হলে দুবাই ও উত্তর আমিরাতের কনসাল জেনারেল এস বদিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের স্টাফরা প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে। আমরা চাই অবৈধ প্রবাসীরা সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈধতা নিয়ে নিজ নিজ পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাবেন। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখবেন তারা।আর যারা অবৈধ কিন’ দেশে ফিরতে চায় তারাও জেল-জরিমানা ছাড়া এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবে। তবে যেসকল প্রবাসী অবৈধ পথে আমিরাতে এসেছেন, বর্ডার অতিক্রম করে এসেছেন, পানি পথে অবৈধভাবে এসেছেন তাদের আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরতে হবে। তাদের বৈধ হবার কোনো সুযোগ নেই। একইভাবে যারা ভিজিটে এসেও নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন, তারাও স’ানীয় ইমিগ্রেশনে গেলে ধরা পড়ে যাবেন।’
কনস্যুলেটে দালালদের প্রসঙ্গ তুললে কনসাল জেনারেল বলেন, ‘তাদের হাত জোড় করে মিনতি করে বলেছি, বার বার অনুরোধ করেছি। কনস্যুলেটে আসতে না করেছি। না বুঝলে আর কি করতে পারি!’
পুরো আমিরাতে এই পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়েছে উল্লেখ্য আরব আমিরাতের আবুধাবি দূতাবাসে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ডা. মুহাম্মদ ইমরান বলেন, ‘যারা অবৈধ প্রবাসী রয়েছেন, আমি তাদের খুঁজছি। সময় চলে যাচ্ছে, অবৈধ প্রবাসীরা যে যেখানেই রয়েছেন, প্রত্যেকের এই সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। অবৈধরা বৈধ হবার জন্যে এটাই সবচে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এমন সময় ও সুযোগ আর আসবে না।’