‘রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়’ বাড়ছে কিশোর অপরাধ

সুপ্রভাত ডেস্ক

স্কুল-পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ‘গ্রুপভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায়’ চট্টগ্রাম নগরীতে বাড়ছে কিশোর অপরাধ; তাদের মারামারি কখনও কখনও গড়াচ্ছে খুনোখুনিতে। সমপ্রতি স্কুলছাত্র আদনান ইসফার হত্যার ঘটনাতেও কিশোর অপরাধীদের দায়ী করেছে পুলিশ। খবর বিডিনিউজ।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বাড়ছে এই কিশোর অপরাধ। আদনান হত্যায় গ্রেফতার পাঁচজনও আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে উঠেছে।
উঠতি বয়সীদের এই উচ্ছৃঙ্খলরা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বন্দরনগরীর চকবাজার, জামালখান, চেরাগী পাহাড়, রহমতগঞ্জ ও আন্দরকিল্লা এলাকায়।
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যেসব জায়গায় কোচিং সেন্টার ও ফ্রি ওয়াইফাই জোন আছে, সেসব জায়গায় উঠতি বয়সী এ অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেশি। ‘চকবাজার, রহমতগঞ্জ, জামালখান, চেরাগী পাহাড় এলাকায় এ ধরনের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে।’ মূলত ‘বড় ভাই’রা তাদের বিভিন্নভাবে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়ার কথা বলেন তিনি।
উৎপাত চেরাগী পাহাড়ে
নগরীর চেরাগী পাহাড় এলাকার বেশ কয়েকজন দোকানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ওই এলাকায় উঠতি বয়সী ছেলেদের মারামারি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে আড্ডা ও হৈ-হুল্লোড় চলে। অনেক সময় তারা বাইরে থেকে সমবয়সীদের ধরে এনেও মারধর করে। তাদের কর্মকাণ্ডে এলাকার নারীরা দোকানে আসতে বিব্রত হয়।
এই কিশোরদের অধিকাংশই বিভিন্ন স্কুলের নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ১২ জানুয়ারি সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালের ভাঙা ভবনের নিচে এক কিশোরকে ধরে এনে মারধর করে কয়েকজন। পুলিশ আসার পর তারা সটকে পড়ে। বিভিন্ন সময়ে চেরাগী পাহাড় এলাকায় স্কুল কলেজের পোশাক পরেই কিশোরদের মারামারি করতে দেখা গেছে। তাদের ছিনতাইয়ে জড়ানোর প্রমাণও রয়েছে পুলিশের হাতে। ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বাই সাইকেল ও ক্যামেরা ছিনতাইয়ের অভিযোগে আট কিশোরকে গ্রেফতার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
তাদের মধ্যে তিনজন হাজেরা তজু কলেজ, একজন সিডিএ পাবলিক কলেজের একাদশ শ্রেণির এবং অন্য চারজন সরকারি কলেজিয়েট, মুসলিম হাই ও জেএম সেন স্কুলের নবম দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
গত বছরের আগস্ট মাসে ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলী রেল লাইন এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় এক যুবক।
ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ যে তিনজনকে গ্রেফতার করেছিল, তাদের সবার বয়স ছিল ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।
আদনানও ছিলেন ‘ছাত্রলীগ নেতার’ অনুসারী
গত মঙ্গলবার নগরীর জামাল খান এলাকায় খুন হয় কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফার। এ ঘটনায় যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয় তাদের মধ্যে চারজন নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র। মঈন খান, সাব্বির খান ও মুনতাছির মোস্তফা পড়েন নগরীর হাজেরা তজু কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে; এখলাস উদ্দিন আরমান হলি ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে এবছর এসএসসি দেবেন। আর আব্দুল্লাল আল সাঈদ এইচএসসি পাস করেছেন ইসলামিয়া কলেজ থেকে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তাররা সবাই নগরীর চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেওয়া আব্দুর রউফ নামে একজনের অনুসারী। তাদের গ্রেফতার করা হয় ফটিকছড়ি উপজেলার স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতার বাড়ি থেকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছুরিকাঘাতে নিহত আদনানও নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাব্বির সাদেকের অনুসারী ছিলেন। সমবয়সী অন্য দুই ছাত্রকে ধাওয়ার ঘটনার পাল্টায় আদনানকে ধাওয়া দিয়ে ছুরি মারা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আদনান হত্যায় পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) আব্দুর রউফ বলেন, কিশোর বয়সের ‘হিরোইজম’ থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দুইপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা বলছেন, রউফ ও সাব্বির দুইজনই নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী হলেও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে।
নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মোস্তাইন হোসাইন বলেন, ‘সামাজিক শিক্ষা না থাকায় কিশোররা এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আর তাদের রাজনৈতিক নেতারা প্রশ্রয় দিলে তা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে।’
ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্ব
২০১৬ সালে চট্টগ্রাম ও মহসিন কলেজের নিয়ন্ত্রণ ছাত্রলীগের হাতে আসার পর সেখানে প্রয়াত সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বর্তমান মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী তিনটি পক্ষ গড়ে উঠে। নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী স্থানীয় যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া নুরুল মোস্তফা টিনু ওই এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। আবার চন্দনপুরা এলাকার বাসিন্দা রউফ, যিনি মেয়র নাছিরের অনুসারী, তিনিও কলেজ কেন্দ্রিক একটি বলয় গড়ে তুলেছেন এলাকার উঠতি বয়সীদের নিয়ে।
মহসিন কলেজ সংলগ্ন একটি ভবনে জামায়াত ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ইসলামী সমাজকল্যাণ ফেডারেশনের কার্যালয়ে ২০১৫ সালের ১৮ মার্চ অভিযান চালায় পুলিশ। পরে ওই ভবনের একটি কক্ষ দখলে নেন রউফ। সেখানে জিলহাজ, এনাম ও বোরহান নামে তার তিন অনুসারী থাকে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তাদের সবাই ‘বড় ভাই’ বলে ডাকে। জামালখান ও গণি বেকারি এলাকায় ছিনতাই-চাঁদাবাজিতে জড়িত তারা। রউফের অনুসারীদের মধ্যে আদনান হত্যায় গ্রেফতার সাব্বির, সাইদ ও মঈন গত ডিসেম্বরে দায়ের করা একটি চাঁদাবাজির মামলারও আসামি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আদনানকে ছুরি মারার দিন রাত পর্যন্ত গ্রেফতারকৃতরা নগরীতেই ছিল। রাতে তারা ফটিকছড়ি সমিতির হাট এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। যে বাড়ি থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়, সেটি সমিতির হাট ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সালের।
কোতোয়ালি থানার ওসি জসীম উদ্দিন বলেন, ‘রউফ নামে একজনের সঙ্গে গ্রেফতারকৃতদের সু-সম্পর্ক আছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’এ ব্যাপারে রউফের কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।