রহস্যের বৃত্তেই ঘুরপাক মিতু খুনের তদন্ত

মোহাম্মদ রফিক
index

তদন্তের সাত মাস পরও স্পষ্ট হচ্ছে না সাবেক এসপি বাবুল আকতারের স্ত্রী চাঞ্চল্যকর মিতু খুনের রহস্য। দিন যত এগোচ্ছে ততই তদন্তে রহস্যের সৃষ্টি করছে নানা ঘটনা। হত্যাকাণ্ডের পর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আকতারকে ঘিরে নানা কথার ডালপালা মেললেও এর উত্তর দিতে পারছে না পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য একটাই ‘তদন্তের স্বার্থে কিছু বলা যাচ্ছে না।’ জনমনে প্রশ্ন, মিতু খুনের ঘটনায় দায়ের করা অস্ত্র মামলার বিচার ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাহলে মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কেন গত সাত মাসে শেষ করতে পারল না পুলিশ।
ঘটনার পর পর মিতু খুনের বিষয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, কোনো জঙ্গি গোষ্ঠি কিংবা বাবুল আকতারের প্রতি কোনো আসামি সংক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটাতে পারে। ঘটনার পর ডিএমপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্টার টেরোরিজম (সিটিইউ) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বিদেশি মদদপুষ্ট হয়েই মিতুকে হত্যা করা হয়েছে।’
এ পরে পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। মিতু হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়জনের মধ্যে সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দুই আসামি রাশেদ ও নবী পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এর আগে দুই আসামি ওয়াসিম ও আনোয়ার গত বছর ২৬ জুন আদালতে জবানবন্দি দেন। এতে তারা উল্লেখ করেন, মিতু হত্যাকাণ্ডে ওয়াসিম, আনোয়ার, মো. রাশেদ, নবী, মো. শাহজাহান, কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে সোর্স মুছা ও মো. কালু অংশ নেন। মুছার নির্দেশেই মিতুকে হত্যা করা হয় বলে আদালতকে জানান তারা। কিন’ কার নির্দেশে এ হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেনি আজও।
এদিকে সোর্স মুছাকে গ্রেফতার করা নিয়ে সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশা। তার স্ত্রীর দাবি, মিতু খুনের ২২ দিন পর বন্দর এলাকা থেকে মুছাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন’ পুলিশ তা অস্বীকার করছে। মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামানের জানান, মিতু খুনে জড়িত সোর্স মুছা ও কালুকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।
২০১৬ সালের ২৪ জুন রাতে ঢাকায় শ্বশুরের বাসা থেকে মিতুর স্বামী বাবুল আকতারকে নিয়ে গিয়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। মামলার বাদিকে আসামির মতো তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করায় মিতু হত্যার কারণ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে মিতু হত্যায় বাবুল আকতারকে ইঙ্গিত করে খবরও প্রকাশিত হয়।
গণমাধ্যমে এ খবরও আসে যে, স্ত্রী খুনে জড়িত থাকার অভিযোগে বাবুল আকতারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন পুলিশের শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা। তবে পুলিশের দাবি, বাবুল আকতার স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। পরে সেটি কর্তৃপক্ষ মঞ্জুর করে। কিছুদিন পর আবার খবরের শিরোনাম হন বাবুল আকতার। এবার বাবুল আকতারের দাবি, পদত্যাগপত্রে তার কাছ থেকে জোর করে সই নেওয়া হয়। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। এরপর চাকরি ফিরে পেতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেন তিনি।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে খবর বেরোয় যে, ‘পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে মিতুকে খুন করার নির্দেশ দেন বাবুল আকতার।’ পুলিশের মধ্যে কেউ বলছেন, মিতুর খুনে জঙ্গি কানেকশন থাকতে পারে। আবার কেউ বলছেন, চোরাকারবারী আবু আহমেদের সোনার চালান ধরে ফেলার জের ধরে মিতুকে মাফিয়রা খুন করেছে। কিন’ প্রকৃতপক্ষে প্রকাশ্যে দিবালোকে অবুঝ সন্তানের সামনে কার নির্দেশে বা কী কারণে মিতুকে নির্মমভাবে খুন করা হলো তা কেবলই রহস্য। ঘটনাটি সাত ধরে মাস তদন্তের পরেও প্রকৃত রহস্য জনগণের সামনে পেশ করতে পারেনি পুলিশ।
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাবুল আকতার অনেকটা নীরবে চট্টগ্রাম এসে তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের সাথে কথা বলে যান। এরপর ফের আলোচনায় আসে মিতু হত্যা মামলা। পরে ২২ ডিসেম্বর তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হত্যাকারী যেই হোক তার তথ্য উদঘাটনের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছি।’
তিনি এও বলেন, ‘বাবুল ও তার মেয়ের মধ্যে দাম্পত্য কলহ ছিল না। তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছি এ মামলার অন্যতম পলাতক দুই আসামি মুছা ও কালুকে গ্রেফতার করে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হোক খুনের পেছনে কি উদ্দেশ্য ছিল তাদের কিংবা খুনের নির্দেশ দাতা কে?’
এরপর চলতি বছর ১ জানুয়ারি বাবুল আকতারের মা-বাবা, ৮ জানুয়ারি বাবুল আকতারের আরেক খালাত ভাই মফিজ এবং সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি বাবুল আকতারের আরেক খালাত ভাই সফিউদ্দিনকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এডিসি কামরুজ্জামান। মিতু ও বাবুল আকতারের পরিবারের একের পর এক সদস্যকে তদন্ত কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে প্রশ্ন জনমনে, মিতু হত্যার কিনারা হবে তো?

আপনার মন্তব্য লিখুন