রবীন্দ্র প্রয়াণে

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌

বাইশে শ্রাবণ ১৩৪৮, ৭ আগস্ট ১৯৪১, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ ঘটে। সেদিনই সন্ধ্যায় অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র থেকে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ ভাষণ দেন রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ে। ভাষণটি অল ইন্ডিয়া রেডিওর সৌজন্যে প্রকাশিত মাসিক ‘জয়শ্রী’ ভাদ্র ১৩৪৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। বহুদিনের পুরোনো পত্রিকা হওয়ায় দু-একটি জায়গায় পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। জয়শ্রী থেকে ভাষণটি সঙ্কলন করে দিয়েছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র পুত্র মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ্‌
রবি আজ ডুবে গেল। এ রবি আর উঠবে না। কেবল কি বাংলা আজ আঁধার হয়েছে? না, সারা ভারত, সারা ভারত কেন, সারা বিশ্ব আজ আঁধার। আধুনিক ভারত নয়, মধ্যযুগের ভারত নয়, প্রাচীন ভারত নয়, সমগ্র শ্রেষ্ঠ অবদান, রবীন্দ্রনাথ।
আমাদের সেদিনের কথা এখনও মনে আছে, যেদিন রবীন্দ্রনাথ কেবল নোবেল পুরস্কার লাভ করে জগতকে বিস্ময়বিমুগ্ধ করেছিলেন। সভ্যতার প্রাচীন জননী এসিয়াভূমির কথা নবীন ইউরোপ, এমেরিকা ভুলে গিয়েছিল। এসিয়ান সন্তান রবীন্দ্রাথ তাদের অনিচ্ছুক দৃষ্টিকে আবার এসিয়ার দিকে তথা ভারতের দিকে কোন মন্ত্রবলে যেন ফিরিয়ে এনেছিলেন। এ বিস্ময় কি কম বিস্ময়?
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ভিতরে-বাইরে সুন্দর। তার আকৃতি সুন্দর, মন সুন্দর, আত্মা সুন্দর। তাই তিনি এত বড় সৌন্দর্য্যের কবি হতে পেরেছিলেন। জগতের যা কিছু সৌন্দর্য্য তার কাছে নিবিড়ভাবে ধরা দিয়েছিল। কুৎসিতের মধ্যে, পাপের মধ্যেও তিনি সৌন্দর্য্যের ছবি দেখেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের এই সৌন্দর্যের বাণী তাঁর শ্রেষ্ঠ বাণী। সৌন্দর্য্য অনুভূতির সঙ্গে আনন্দের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, তাই রবীন্দ্রনাথ যেমন সৌন্দর্য্যের কবি তেমন আনন্দেরও কবি। প্রেম সৌন্দর্য্যের সহচর। যিনি সৌন্দর্য্যের কবি তিনি প্রেমেরও কবি। এ দেশে প্রেমের গান জয়দেব থেকে চন্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস – কত কবিই না কত সুরে গেয়ে গেছেন। কিন্তু সেগুলি বৈষ্ণব কবির গান। এই বৈষ্ণব বিশেষণ তাঁদের দিতেই হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশেষণবর্জ্জিত প্রেমের কবি। এ প্রেম দেশ-কাল-ব্যক্তি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে। সাধারণ লোক যাকে বলে কর্মীপুরুষ তা তিনি ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন প্রকৃত কর্মী। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যে ও প্রবন্ধে কর্মের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর রচনাই তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্ম। যে মৌন মুখে ভাষা দেয়, যে ভাঙা বুকে আশা দেয়, যে কাপুরুষকে সাহস দেয়, যে জীবম্মৃতকে নবজীবন দেয়, সে যদি কর্মী না হয় তবে আর কর্মী কে? তিনি কেবল কর্মী নন, তিনি কর্মীদের কর্মী। দেশাত্মবোধ তাঁর গান, কবিতায় যেমন ফুটে উঠেছে বন্দেমাতরমের পরে আর কোথাও তেমন ফুটেছে? বঙ্কিমচন্দ্র বাঙ্গালী জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই হলো আমাদের বর্তমানের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের আশা।
রবীন্দ্রনাথ অমর কবি, তিনি অমরধামে গিয়েছেন। মরণ কখনো তাঁর কাছে ভয়ানক ছিল না। পরম বন্ধুর মত তিনি ভানুসিংহ ঠাকুরের ভনিতায় মরণকে সম্বোধন করে বলেছিলেন –
“মরণ রে তুঁ হুঁ মম শ্যাম সমান”
যৌবনেও তিনি তাঁরই প্রতীক্ষায় ছিলেন। নিজের অন্তিম
ছবিখানি তিনি কি নিপুণভাবে নিজেই এঁকে দিয়েছেন।
একদা নামিয়ে সন্ধ্যা বাজিবে আরতি শঙ্খ
অদূরে মন্দিরে,
বিহঙ্গ নীরবে হবে উঠিবে ঝিল্লীর ধ্বনি
অরণ্যে গম্ভীরে
সমাপ্ত হইবে কর্ম্ম সংসার সংগ্রাম শেষ
জয় পরাজয়
আসিবে তন্দ্রার ঘোর পান্থের নয়ন পরে
ক্লান্ত অতিশয়।
তবে যাও কবি অমর ধামে, যেখানে পূর্ণ সৌন্দর্য্য, পূর্ণ আনন্দ, পূর্ণ প্রেম নিত্য বিরাজ করে সেই শাশ্বত ধামে।