রবীন্দ্রনাথের তিনটি গান ও বঙ্গবন্ধুর জীবন

মফিদুল হক

রবীন্দ্রনাথের তিনটি গান, তিন ভিন্ন উপলক্ষে তিন সময়ে রচিত, কীভাবে যে বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল আষ্টেপৃষ্ঠে, মাঝে মাঝে অবাক হয়ে সে কথা ভাবি। ‘গীতবিতান’-এ রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানসমূহ বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করেছেন, স্বদেশ, পূজা কিংবা প্রকৃতি অথবা প্রেম পর্যায়ের গানই বেশি। তবে আমরা তো জানি এবং জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উপলব্ধি করি, পূজা পর্যায়ের গান হয়ে যেতে পারে স্বদেশভাবনার উদগাতা, প্রকৃতির গান প্রকাশ করতে পারে প্রেমের আকুতি, কোনো গণ্ডীর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গান আটকে রাখা যায় না। বাণীর যে গভীরতা ও সুরের যে বিস্তার তা রবীন্দ্রনাথের গানকে কেবল কালোত্তীর্ণ করেনি, দিয়েছে নতুন অর্থময়তা, ভিন্নতর ব্যঞ্জনা। পরিবেশ পরিস্থিতি কীভাবে পাল্টে দেয় অর্থ, বয়ে আনে নতুন তাৎপর্য, সেটা তিনটি গানের উল্লেখের মাধ্যমে আমরা বুঝে নিতে চেষ্টা করবো।
প্রথম গানটি ভরাট গলায় গেয়েছিলেন ইকবাল আহমেদ, ১৯৬৯ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা তার পরপর। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র, সংস্কৃতি সংসদের মূল গায়ক, ছায়ানটের কৃতি শিক্ষার্থী, গানের দল নিয়ে হৈ হৈ করে গণ-আন্দোলনে সামিল রয়েছে সংস্কৃতি সংসদ। রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ কারাগার থেকে মুক্ত করে এনেছে শেখ মুজিবর রহমানকে, বাতিল হয়েছে আগরতলা মামলা, ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠিত বিচারশালা আর রায় প্রদানের অবকাশ পায়নি, গণ-অভ্যুত্থানে তছনছ হয়ে গিয়েছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শক্ত শাসন। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ শেখ মুজিবের কারামুক্তি ছিল অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য ঘটনা, ঐতিহাসিক তাৎপর্যে পরিপূর্ণ এমন মহীয়ান কারামুক্তি আর কোনো রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। ২৪ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত করলেন, কোনো সরকারি খেতাব নয়, জনগণের ভালোবাসায় অভিষিক্ত এই শ্রদ্ধাঞ্জলি ছিল অভিনব ও ব্যতিক্রমী। সেই থেকে তিনি সবার বঙ্গবন্ধু।
এমনি পটভূমিকায়, বঙ্গবন্ধুর কারামুক্তির পরপর, সভা-সমাবেশে সঙ্গীত-আয়োজনে ইকবাল আহমেদ গাইতেন রবীন্দ্রনাথের সেই গান, ‘উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদি রথে, ঐ যে তিনি ঐ যে বাহির পথে।’ শুনতে শুনতে মনে হতো এ-গান যেন সদ্য-রচিত, কারাগারের বদ্ধ কুঠুরিতে মুক্তির সম্ভাবনাহীন অন্ধকারে আটক ছিলেন যিনি জনতা তাঁর মুক্তি ছিনিয়ে আনলো বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে, বাস্তবেই তিনি জয় পতাকা উড়িয়ে আকাশ-ছোঁয়া রথে সওয়ারি হয়ে দেখা দিলেন রাজপথে। সেই অসাধারণ মুহূর্তে দেশজুড়ে সকল মানুষের অন্তরের আকুতি প্রকাশ করেই বুঝি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন : ‘আয় রে ছুটে, টানতে হবে রশি/ঘরের কোণে রইবি কোথায় বসি।’
ঊনসত্তরের সেই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ পৌঁছে গিয়েছিল এক নতুন প্রান্তরে, বাঙালি আপন সত্তা ও শক্তিময়তা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিল, রক্তে তার জেগেছিল আরেক স্পন্দন, জাতি প্রস্তুত হয়ে উঠছিল আগামীর কঠিন সংগ্রামে ঝাঁপ দিতে। সামনের দিনগুলোর ছবি তখনও স্পষ্ট হয়ে উঠেনি, কিন্তু মুক্তি স্পৃহায় মানুষ তখন ঐক্যবদ্ধ এবং লড়াইয়ের জন্য মনে মনে প্রস্তুত, ঘুরতে শুরু করেছে রথের চাকা। গানে বুঝি মেলে তারই প্রতিফলন, রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ওই যে চাকা ঘুরছে ঝনঝনি/বুকের মাঝে শুনছ কি সেই ধ্বনি।/রক্তে তোমার দুলছে নাকি প্রাণ/ গাইছে না মন মরণজয়ী গান?/ আকাঙক্ষা তোর বন্যাবেগের মতো/ ছুটছে নাকি বিপুল ভবিষ্যতে।’ সত্যিকার অর্থেই ঘরের কোণে আর কেউ বসে ছিল না, লক্ষ মানুষ নেমেছিল রাজপথে, রশি আঁকড়ে তারা টেনেছিল কালের রথ, আর সেই অভ্রভেদী রথের রথী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।
এভাবে সূচিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অভ্রভেদী রথে বাঙালির অভিযাত্রা, জাতির নিজস্ব পতাকা উড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপ দিয়েছিল অকুতোভয় মানুষ, ছুটে চলেছিল বিপুল ভবিষ্যতের দিকে।
২.
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতির যে মহান বিজয় তা দেশে-বিদেশে নানাভাবে কীর্তিত হয়েছে। বাঙালির এই সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির জন্য দেশে দেশে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ নিয়েছিলেন প্রখ্যাত বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাস-বিশ্লেষক অধ্যাপক হীরেন মুখার্জি। ১৯৭২ সালে ‘শারদীয় পরিচয়’ পত্রিকায় তাঁর প্রকাশিত নিবন্ধের শিরোনাম তিনি দিয়েছিলেন, ‘দেখি নাই কভু দেখি নাই’, রবীন্দ্রনাথের গানের পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে। তবে হীরেন মুখার্জি কেবল শিরোনামে বিচ্ছিন্নভাবে গানের একটি কলি বেছে নেননি, রচনায় তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন-সাধনা বিশ্লেষণে ফিরে ফিরে সেই গানের আশ্রয় নিয়েছেন। ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমদির হাওয়া/দেখি নাই কভু দেখি নাই, এমন তরণী বাওয়া,’ এই কথার মধ্য দিয়ে লেখক বলতে চেয়েছেন বাঙালি জাতির বৈতরণীর হাল ধরে এমনভাবে বিজয়ের ঘাটে পৌঁছে গেলেন শেখ মুজিব যার তুলনা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে বিশেষ দেখা যায় না। বিগত শতকের ষাটের দশকে এশিয়া এবং বিশেষভাবে আফ্রিকার মুক্তি আন্দোলনের যাঁরা নেতা হয়েছিলেন, কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা, নাইজেরিয়ার কোয়ামে নক্রমা, আলজেরিয়ার বেল বেল্লা, ভিয়েতনামে হো চি মিন প্রমুখ সবাই ছিলেন সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রধান, পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলন ছিল জনতার শক্তিতে বলীয়ান এবং সময়ের প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপান্তরিত হতে কালবিলম্ব করেনি, পরিণামে সংগঠিত পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। হীরেন মুখার্জির মনে হয়েছিল এ-অভিযাত্রা মন্দমধুর হাওয়ায় পাল তুলে তরণী বাওয়া, যাকে তিনি তৎকালে প্রচলিত সোভিয়েত দৃষ্টিকোণ থেকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ হিসেবে যা সমাজতন্ত্র-অভিমুখী পরিবর্তন সূচনা করবে রক্তাক্ত বিপ্লব পরিহার করে জাতীয় ঐক্য গঠন দ্বারা। আর তাই রবীন্দ্রনাথের গানের আলোকে বঙ্গবন্ধুর অবদান বিচারে বিশেষ উৎসাহী হয়েছিলেন হীরেন মুখার্জি, তাঁর নেতৃত্বের অনন্যতা তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন। প্রচলিত ধারার বাইরে এই নতুন অভিযাত্রা কীভাবে অগ্রসর হবে সে-বিষয়ে তিনি অবশ্য স্থির-নিশ্চিত ছিলেন না, হওয়া সম্ভবও ছিল না। তবে গানের শেষ পঙ্‌ক্তিগুলো হয়ে ওঠে অশেষ তাৎপর্যময়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসি-কান্নার ধন;/ ভেবে মরে মোর মন-/ কোন্‌ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র, কী মন্ত্র হবে গাওয়া।’ প্রবন্ধে বারবার এই গানের পঙ্‌ক্তির কাছে ফিরে এসেছেন হীরেন মুখার্জি, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা বিশ্লেষণকালে অভিভূত হয়ে তিনি বলেছিলেন, এমন তরণী বাওয়া আর তো দেখা যায়নি।
৩.
বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের গানের নতুন তাৎপর্যলাভের শেষ দীক্ষাটুকু আমি পাই কবি-বন্ধু নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকে। জানি না এই ঘটনা তাঁর স্মরণে রয়েছে কিনা; কিন্তু আমি কখনো এক বিশেষ পরিবেশে বিশেষ পটভূমিকায় কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গীত এই গান বিস্মৃত হতে পারি না। ১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকের কথা, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর তখন দেশে নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নীরবতা। ব্যক্তিগতভাবে যে-দুঃখ মানুষ অন্তরে বহন করছে তা নিয়ে প্রকাশ্য হতে পারছেন না কেউ। এর মধ্যে ব্যতিক্রমীভাবে কবিতায় সাহসী উচ্চারণ করছেন নির্মলেন্দু গুণ, তাঁরও তখন প্রায় ঘোরগ্রস্ত দশা। এমনি এক সময়ে ছায়ানটের আমন্ত্রণে-রবীন্দ্রসঙ্গীতের গুণি শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি স্বয়ং যাকে সম্বোধন করতেন ‘মোহর’ বলে, তিনি এসেছেন ঢাকায়। ছায়ানটের অন্যতম সুহৃদ ও একনিষ্ঠ কর্মী নূরুন্নাহার আবেদীনের ধানমণ্ডির বাসায় কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় অবস্থান করছেন। সেখানে দিনভর চলে গানের প্রশিক্ষণ, নবীন শিক্ষার্থীরা তালিম নেয় শিল্পীর কাছে। সন্ধ্যায় বসে গল্প-আড্ডার আসর। সেই বিষণ্ন পরিবেশে এক সন্ধ্যায় স্থির হলো কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘরোয়াভাবে গান পরিবেশন করবেন। যথারীতি ছায়ানটের কর্মীদলের আমরা সবাই উপস্থিত রয়েছি, আরো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে শামসুর রাহমান, রশীদ করীম, কাইয়ুম চৌধুরীসহ শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের অনেককে। তরুণ কবিরাও কেউ কেউ রয়েছেন সেই আসরে। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় শোনাচ্ছিলেন একের পর এক গান, মাঝে মধ্যে শ্রোতাদের তরফ থেকে জানানো হচ্ছিল অনুরোধ, বেশির ভাগ তাঁর জনপ্রিয় ও চিত্তস্পর্শী রেকর্ড সঙ্গীত থেকে। নির্মলেন্দু গুণ আচমকা দাঁড়িয়ে অনুরোধ জানালেন স্বল্প-পরিচিত এক গান শোনাবার জন্য। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের ভাণ্ডার বিশাল, তিনি ধরলেন গান, তাঁর সুরেলা সাবলীল কণ্ঠে গানের অন্তর্নিহিত বেদনা গোটা পরিবেশ পাল্টে দিল মুহূর্তে, মোহরদি গাইলেন, ‘বনে যদি ফুটল কুসুম, নেই কেন সেই পাখি, নেই কেন।’ ফিরে ফিরে তিনি যখন গাইছিলেন ‘নেই কেন সেই পাখি’, তখন এক নিগূঢ় বেদনা আচ্ছন্ন করছিল সবাইকে, বুঝতে কারো অসুবিধা হয় নি নির্মলেন্দু গুণ এই গানে কোন্‌ অর্থময়তা খুঁজে পেয়েছেন, আর কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় সুর ও বাণীতে সেই অর্থ কীভাবে বাঙ্ময় করে তুললেন। গানের কলিগুলো ঘরময় ভেসে বেড়ায়, স্মরণ করিয়ে দেয় জাতির জীবনের অপরিসীম শূন্যতা, রূপ নেয় অন্যতর এক হাহাকারের। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় গাইছিলেন ‘হাওয়ায় হাওয়ায় মাতন জাগে, পাতায় পাতায় নাচন লাগে/ এমন মধুর গানের বেলায় সেই শুধু রয় বাকি।’ কবে কোন্‌ পরিবেশে কি ভেবে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন এই গান তা অবান্তর হয়ে পড়ে, নতুন অর্থ নতুন তাৎপর্য নিয়ে ভেসে বেড়ায় গানের কলি, ‘আমার হেথায় ফাগুন বৃথায়, বারে বারে ডাকে যে তায়/এমন রাতের ব্যাকুল ব্যথায়, কেন সে দেয় ফাঁকি।’
কেবল হারাবার বেদনা নয়, জাতির ব্যর্থতারও স্মারক হয়ে ওঠে গান। এভাবেই তিন কালের তিন গানে আমরা পাই বঙ্গবন্ধুকে।

আপনার মন্তব্য লিখুন