রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনা

গোলাম মুস্তাফা
rabi1

রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষারই লেখক, কিন্তু তিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন ইংরেজিতে অনূদিত কাব্যগ্রন্থ Songs Offerings এর জন্য। Songs Offerings প্রকাশিত হয়েছিল বিলেতের ইন্ডিয়া সোসাইট থেকে, ১৯১২ সালে। রবীন্দ্রনাথের এই ইংরেজি অনুবাদ পাশ্চাত্যের বেশ ক’জন সাহিত্যমোদীকে আকৃষ্ট করেছিল। ইংরেজ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটস তাঁদের অন্যতম। ইয়েটস উচ্ছ্বসিত হয়ে এই কাব্য-অনুবাদ গ্রন্থের একটি ভূমিকা লিখে দেন।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর রচনার ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেছিলেন অবশ্য বেশ আগেই। ১৮৯০-এর দিকে ‘নিষ্ফল কামনা’ কবিতাটির অনুবাদ করেছিলেন তিনি। এর পর বেশ কিছুদিন আর অনুবাদ করেননি। বিশ শতকের গোড়ার দিকে জগদীশচন্দ্র বসু তাঁকে অনুবাদের জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। ১৯০০ সালে বিলেত থেকে রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন : I will not allow you to remain in obscurity in the countryside। জগদীশচন্দ্র বিলেতে থাকার সময় নিজেও রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। বিপিনচন্দ্র পালের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও রবীন্দ্রনাথের চারটি গল্প অনুবাদ করেছিলেন। গল্পগুলো তাঁর সম্পাদিত New India-য় ছাপা হয়। কেশবচন্দ্র সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র।
ইয়েটসের আগেও অনেক ইংরেজ লেখক রবীন্দ্র রচনার ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। অজিতকুমার চক্রবর্তী বিলেতের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিলেন ১৯১০ সালে। সেই সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু রচনা অনুবাদ করেন। ইংরেজ সাহিত্যবোদ্ধাদের অনেকেই সেই অনুবাদের মাধ্যমে রবীন্দ্র সাহিত্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন। তাঁদের একজন, আর.এফ. রটারি, নিজেকে ইউরোপীয়দের মধ্যে রবীন্দ্র রচনার প্রথম পাঠক হিসেবে উল্লেখ করে বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলেন।
১৯০৯ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে রবীন্দ্র সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন বেশ ক’জন। অজিতকুমার চক্রবর্তী ছাড়াও এই সময় কবি রবি দত্ত, আনন্দ কুমারস্বামী, ভগিনী নিবেদিতা প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের ইংরেজি অনুবাদে মনোনিবেশ করেন। এই সময়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি ছোটগল্প ও কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ঞযব গড়ফবৎহ জবারব িপত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনার চাহিদা ইংরেজভাষীদের মধ্যে দ্রুত বাড়তে থাকে। এই ফলে ১৯১২ থেকে ১৯৩১ – এই কুড়ি বছরে বিলেত ও আমেরিকা থেকে তাঁর কুড়িটি বই প্রকাশিত হয়।
এ তো গেল রবীন্দ্র-রচনা অনুবাদের প্রাথমিক প্রয়াসের কথা। ইংরেজি ভাষায় রচিত রবীন্দ্র-রচনার সংখ্যাও কম নয়। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র রচনাবলীতে ইংরেজি লেখাগুলো সংকলিত হয়নি। ভারতের সাহিত্য অকাডেমি রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনার সংকলন প্রকাশ করেছেন চারখণ্ডে। এই চারটি সংকলন সম্পাদনা করেছেন শিশিরকুমার দাশ।
রবীন্দ্রনাথ কেন বাংলা ও ইংরেজি – এই ভাষাতেই লিখতে শুরু করলেন? এই প্রশ্নটি বিচার করেছেন শিশিরকুমার দাশ রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি রচনাবলীর প্রথমখণ্ডের ভূমিকায়। উনিশ ও বিশ শতকের অনেক ভারতীয় লেখকই তাঁদের ভাবের বাহন হিসেবে ভাষা নির্বাচনের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র ও মধুসূদনের কথা বলা যায়। এঁরা দুজনই অবশ্য অচিরেই বুঝেছিলেন, “মাতৃ-কোষে রতনের রাজি।”
এই দ্বিধা রবীন্দ্রনাথের ছিল না। কয়েকজন বাঙালি লেখকের ইংরেজি রচনা সংকলনের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষাকেই আমাদের সাহিত্যচর্চার স্বাভাবিক পথ বলে অভিহিত করেছিলেন। শিশিরকুমার রবীন্দ্রনাথকে একজন লেখক হিসেবেই সীমিত করতে চাননি। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় জীবন-দর্শনের একজন প্রচারক হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে যে সব প্রবন্ধ রচনা করেছেন বা অভিভাষণ দিয়েছেন সেগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে শিশিরকুমারের মূল্যায়ন : The genesis of Tagore as a prose writer in English is intimately connected with his role as a preacher or a spokesman of modern India… ।
শিশিরকুমার দাশের উপরিউক্ত মন্তব্য অস্বীকার করার উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ইংরেজি রচনাগুলোতে তাঁর ভাবনা ও ভারত-আত্মার বাণী শোনাতে চেয়েছেন বিশ্ববাসীকে। ১৯১৬ সালে জাপান ও আমেরিকা ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তিনটি বক্তৃতা করেছিলেন। এই বক্তৃতাগুলো ১৯১৭ সালে Natonalism পুস্তকে সংকলিত হয়। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা যে গৎবাঁধা ধরনের ছিল না। জাতীয়তাবাদের উন্মাদনার কালেও রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি’কে যান্ত্রিক উদ্দেশ্য সাধনের সংগঠন হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন : ‘A Nation, in the sense of political and economic union of a people is that aspect which a whole population assumes when organized for a mechanical purpose.Õ’এটুকু বলেই তিনি ক্ষান্ত হননি। জাতীয়তা সর্বময় কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠলে তা যে মানবতার জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে – এই সতর্কতা উচ্চারণ করতেও তিনি দ্বিধান্বিত হননি। সময় জাতির মতো একটি বিমূর্ত শক্তির শাসনে সেই সময়ের ভারতবাসী কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছিলো তার কথাও বলেছেন তিনি। শাসকগণ বিমূর্ত জাতির প্রতীক, শাসিতজন ? না তাঁদের অনুভূতিহীন বিমূর্ত সত্তা হিসেবে দেখেননি রবীন্দ্রনাথ : “But we, who are governed, are not mere abstraction. We on our side, are individuals of living sensibilities.” ভারতীয় সমাজের জাতীয়তার প্রশ্নটি তিনি দেখেছেন সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে। রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে সামাজিক সমস্যাই এখানে ব্যাপক ও প্রবল। বর্ণ বিভাজনের সমস্যা তাঁকে পীড়িত করেছিল। ভারতের নানক, কবীর, চৈতন্যের সাধনায় রবীন্দ্রনাথ এই সমস্যার সমাধানসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের বাণী ও পথ ধরেই বিভাজন-আক্রান্ত পৃথিবীকে সমাধানের পথ দেখাতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কারণ তাঁর বিবেচনা : ‘There is only one history—the history of man. All national histories are merely chapters in the larger one.’ মানবজাতির মধ্যে ঐক্যসাধনের এই চিন্তাই রবীন্দ্র জীবনাদর্শের মূলকথা।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অনুসন্ধান করতে গিয়েই রবীন্দ্রনাথ মানুষের ধর্মসাধনার লক্ষ্য উপলব্ধির চেষ্টা করেছেন। ১৯৩০ সালে অক্‌সফোর্ডে হিবার্ট ট্রাস্টির আয়োজনে কয়েকটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। এগুলো পরে Religion of Man নামে প্রকাশিত হয়। ধর্মকে রবীন্দ্রনাথ নিছক দর্শন বলে ভাবেননি। দীর্ঘদিন সৃজনশীল কর্মে নিয়োজিত থাকার ফলে তাঁর চিন্তায় মানুষের ধর্ম সম্পর্কে একটি ধারণা বিকশিত হয়। এই স্বীয় অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণাই তাঁকে মানুষের ধর্ম সম্পর্কে একটি বিশ্বাসে উপনীত করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ধর্মকে কবির ধর্ম বলে উল্লেখ করেছেন। কবি তাঁর মধ্যে চিরায়ত এক সত্তাকে অবলোকন করেন।
সত্তার এই চিরায়ত রূপই কবিকে তাঁর ধর্মসাধনায় প্রবৃত্ত করে। কবি তাঁর ধর্মসাধনায় নিজের মধ্যে পরম মানুষের অস্তিত্ব উপলব্ধি করবেন – এটিই তাঁর জীবনব্রত। ঈশ্বর রবীন্দ্রনাথের কাছে সখা-পান্থজনের সখা; দূরের কেউ নন। বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি বাণী রবীন্দ্রনাথের খুবই প্রিয় ছিল। এই বাণীর মর্মকথা : “যে ঈশ্বরকে বাইরের কোনো শক্তি হিসেবে পূজা করে, নিজের মধ্যে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে না, সে ঈশ্বরাধীন এক প্রাণীর মতো।” নিজের অস্তিত্বের বাইরে ঈশ্বরকে অনুসন্ধান করে তাঁকে পাওয়া যাবে না, তাঁকে নিজের মধ্যেই খুঁজতে হবে, নিজের মধ্যেই তাঁকে সত্য করে তুলতে হবে। এই সত্যোপলব্ধিই রবীন্দ্রনাথ ও I and He প্রবন্ধে ব্যক্ত করেছেন।
মানুষকে তিনি এক সার্বভৌম সত্তা হিসেবেই বিকশিত দেখতে চেয়েছেন। মানুষের কায়িক অস্তিত্ব তাঁর কাছে মুখ্য নয়। কায়িক ও আধ্যাত্মিক শক্তির সমন্বয়ের ফলেই প্রকৃত মানবসত্তা গড়ে ওঠে এই সত্য তিনি বিশ্বাস করতেন। মানুষ নিজের চলার পথ নিজেই তৈরি করে নেবে, নিজের জীবন বিধান নিজেই রচনা করবে – এই আশা নিয়েই তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ সত্যপথের সন্ধান একদিন নিশ্চয়ই পাবে। বস্তুগত সম্পদের পরিমাপ নিয়ে মানুষের মহত্ব বিচার করাকে তাঁর মনে হয়েছে, বর্তমান সময়ের এক মস্ত বড় বিভ্রম। মানুষে মানুষে ঐক্যসাধনার একটি বড় দিক হলো গ্রহণের মানসিকতা। সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তার মধ্যে বর্জনের প্রবণতা প্রকট হয়ে ওঠে। গ্রহণ স্বভাবের মধ্যেই ঐক্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় মানব সমাজ এই গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সত্য হয়ে উঠবে – এই স্বপ্নই দেখতেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কথায় : India has ever declared that Unity is truth, and separateness is maya.
রবীন্দ্রনাথের জীবনসাধনার লক্ষ্যই ছিল, সার্বভৌম সত্তারূপে মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ, মানুষে মানুষে মিলন ও সম্প্রীতি। এই জীবনাদর্শ তাঁর বাংলা রচনার মতো ইংরেজি রচনায়ও পরিস্ফুট।