যৌতুকবিরোধী আন্দোলন : চাই সামাজিক জাগরণ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

সকল রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনে চট্টগ্রাম ছিল অগ্রবর্তী ভূমিকায়। নানা সংকটে-দুর্দশায় দেশবাসীকে পথ দেখিয়েছেন চট্টগ্রামের বরেণ্য ব্যক্তিত্বগণ। ঠিক তেমনি চট্টগ্রামের বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে সূচিত যৌতুক ও নারী নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন আজ সবার নজর কেড়েছে। দেশ, সমাজ, মানুষ তথা নারীজাতির প্রতি দরদ, মমত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে ২০০৮ সনে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সর্বপ্রথম যৌতুক ও নারী নিপীড়নবিরোধী মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যা পরবর্তীতে চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ মার্চ শনিবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠেয় যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ এবারসহ ৯ম বছরে পদার্পণ করছে। এর আগে ফটিকছড়ি ও পটিয়ায় যৌতুকবিরোধী সমাবেশ বেশ সাড়া জাগায়।
নারী নিপীড়ন বন্ধ করা, যৌতুক দেয়া-নেয়া বন্ধ, বরযাত্রী ভোজন নয়-ওয়ালিমা প্রথা চালু, যুবক-যুবতীদের জন্য ম্যারেজ ফান্ড গঠন, বিবাহিত যুবকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা, যৌতুকমুক্ত বিয়ে সামাজিকভাবে চালু করা, কন্যাসন্তানের প্রতি অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ বন্ধ করা এবং নারীদের সুুশিক্ষিত করে আদর্শ সুনাগরিক গড়ার পথ তৈরি করাসহ নানা দাবিতে যৌতুক বিরোধী এই মহাসমাবেশ আয়োজিত হচ্ছে প্রতি বছর। যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশের পাশাপাশি প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে তাফসিরুল কুরআন মাহফিলও আয়োজন করে আসছেন আল্লামা নূরী (মজিআ)। কুরআন মজিদের অপব্যাখ্যা রোধ এবং সঠিক দর্শন তুলে ধরাই তাফসিরুল কুরআন মাহফিল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার বিকাশে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আল্লামা নূরী প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রায় ১৬টি মাদ্‌রাসা, এতিমখানা ও হেফজাখানা।
সমাজের নেতৃস্থানীয় শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হলেন আলেম সমাজ। আলেম সমাজ মাঠে ময়দানে, মসজিদে-ওয়াজ মাহফিলে ও গণমাধ্যমে কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে জনমত তৈরি করতে চাইলে তাতে সুফল মিলবে শতভাগ-এতে কারো সংশয় নেই। বরেণ্য আলেমে দ্বীন আন্তর্জাতিক বক্তা মুফাস্‌সিরে কুরআন পীরে তরিকত আল্লামা আবুল কাশেম নূরী (মজিআ) সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নারী সমাজের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই যৌতুকের অভিশাপ থেকে তাদেরকে মুক্ত করতে যৌতুকবিরোধী আন্দোলন আজ শাণিত করে তুলেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট। গন্তব্য নির্ধারিত।
গণমুখী কাজে তিনি নিজেকে উৎসর্গিত রেখেছেন। নারী সমাজের মতো মাতৃস্থানীয় মর্যাদাতুল্য একটি বিশেষ শ্রেণিকে সামাজিক কুপ্রথা, যৌতুকের গ্লানি থেকে উদ্ধারে জাতীয় জাগরণ গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ-এই হচ্ছে যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ আয়োজনের বড় লক্ষ্য। যৌতুকের কারণে ঘরে ঘরে চলা গরিব পরিবারগুলোর নীরব কান্না ও আহাজারি থামাতেই এ আন্দোলন ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।
ইসলামের কল্যাণমুখী দর্শন দেশে-বিদেশে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে তিনি বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরছেন, তেমনি সমাজের দুষ্টক্ষত নারী নিপীড়ন ও যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে বরাবরই তিনি সোচ্চার থেকেছেন। গত দুই বছর আগে চট্টগ্রামের পটিয়ায় অনুষ্ঠিত যৌতুকবিেেরাধী সমাবেশে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী। যৌতুকবিরোধী এ সফল গণআন্দোলন সারাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এই সাংসদ আল্লামা নূরীর প্রশংসা করে বলেন, যে দায়িত্ব সরকারের পালন করার কথা, সেই দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিলেন বরেণ্য আলেমে দ্বীন আল্লামা আবুল কাশেম নূরী।
১৮ মার্চ শনিবার চট্টগ্রাম লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠেয় যৌতুকবিরোধী মহাসমাবেশ সফল হোক এবং এতে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে যৌতুকবিরোধী জনমত গড়ায় এগিয়ে আসুক – এই আমাদের কামনা। যৌতুকের অভিশাপ থেকে নারীসমাজ ও কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারগুলোকে বাঁচাতে চাই সামাজিক সচেতনতা ও গণজাগরণ। সেই সাথে দরকার রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ। যৌতুকবিরোধী আইন দেশে রয়েছে। যৌতুক দেয়া-নেয়ার জন্য আইনগত শাস্তির বিধানও রয়েছে।
যৌতুকজনিত কারণে নারী নির্যাতন ও হত্যা করা হলে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গত ৩০ জানুয়ারি আরেকটি আইন সংসদে পাস হয়েছে। আমরা মনে করি, যৌতুকবিরোধী আন্দোলনের ফসল হলো এ আইন। এজন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। যৌতুকবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ দুষ্টক্ষত থেকে নারীসমাজ তথা সমাজের রেহাই মিলবে না। শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই। সবাই সচেতন হলে এবং আল্লামা নূরী সাহেবের মতো নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই দায়িত্ব পালন করলে যৌতুকমুক্ত স্বদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে নিঃসন্দেহে।
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক