যে কারণে স্বামীকে খুন করেন আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরে ভাড়া বাসায় ওঠে একই দিন স্বামীকে খুন করে পালিয়ে যাওয়া সেই স্ত্রীকে বগুড়া শহর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার নাম আশা আক্তার (২৩)। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বামী মো. শামীমকে (৩০) পরিকল্পিতভাবে গলা কেটে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন এই নারী। গত ১৯ ফেব্রম্নয়ারি বগুড়া শহর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় আশার কাছ থেকে রক্তমাখা জামা-কাপড়ও উদ্ধার করে পুলিশ।
গতকাল দুপুরে এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নগর পুলিশ কর্তৃপড়্গ। পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে স্বামী খুনের বর্ণনা দেন আশা। তিনি জানান, ফেসবুকে পরিচয়ের
সূত্র ধরে চার মাস আগে শামীমকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। কিন’ শামীম বিবাহিত এবং তার স্ত্রী-সনত্মান আছে, এ কথা গোপন রেখেছিল। বিয়ের পর শামীমের প্রথম স্ত্রী ও সনত্মানের কথা জানতে পারেন আশা। প্রতারিত হওয়ার ড়্গোভ থেকে স্বামীকে খুনের পরিকল্পনা করেন। অবশেষে শামীমকে গলা কেটে খুন করে আশা পালিয়ে যান গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়। গ্রেফতারের পর গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু সালেম মো. নোমানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আশা আক্তার।
গত ১৬ জানুয়ারি বিকালে নগরের পাহাড়তলী থানার আব্দুল আলী নগরের নেছারিয়া মাদ্রাসার সামনে একটি কলোনির বাসা থেকে শামীমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আশার বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে শামীম খুনের বর্ণনা দেন নগর পুলিশের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা কুসুম দেওয়ান। তিনি জানান, এক বছর আগে ফেসবুকে আশা আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয় শামীমের। আশার বাড়ি বগুড়া শহরে। তিনি এবারের এসএসসি পরীড়্গার্থী। চাকরিও করেন সেখানকার একটি বায়িং হাউজে। শামীম পেশায় বাবুর্চি। তার বাড়ি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায়। মা-বোন ও স্ত্রী-সনত্মান নিয়ে থাকতেন নগরের ঢেবারপাড় এলাকায়। ফেসবুকে দুজনের কথা চলতে থাকে। এক সময় তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিচয়ের ওই সূত্রে বগুড়ায় গিয়ে আশার সঙ্গে দেখা করেন শামীম। চার মাস আগে আশার পরিবারের সম্মতিতে দুজনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর বগুড়া শহরে বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরম্ন করেন নতুন দম্পতি। বিষয়টি জানতেন না শামীমের মা ও প্রথম স্ত্রী। এদিকে বিয়ের পরপরই প্রথম স্ত্রী ও সনত্মানের কথা জেনে যান আশা।
তবু সংসার করা আশায় ৬৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শামীমকে একটি টমটম গাড়ি কিনে দেন আশা। এর আগেও শামীমকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তিনদিন চালানোর পর আশাকে না জানিয়ে টমটম রেখে চট্টগ্রামে চলে আসেন শামীম। এতে মনে কষ্ট পান আশা। পরে যোগাযোগ করলে ‘টমটম’ বিক্রি করে আশাকে চট্টগ্রামে চলে আসার প্রসত্মাব দেন শামীম। কথা হয়, তিনদিন পর আশা ঢাকার সায়েদাবাদে আসবেন। সেখান থেকে আশাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসবেন শামীম। কিন’ ইতোমধ্যে শামীমকে খুনের পরিকল্পনা করে বসেন আশা। আশার কথা, যার জন্য সবকিছু উজাড় করেছি, সে আমার সাথে প্রতারণা করলো কেন? তাই তার (শামীম) সংসারও করবো না, পৃথিবী থেকে তাকে চিরতরে বিদায় করে দেব। পরিকলপনা মাফিক বগুড়া থেকে ছুরি কেনেন আশা। এরপর মাকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন আশা। ছুরিটিও ব্যাগে নেন।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পৌঁছে যান শামীমও। আশাও চলে আসেন সায়েদাবাদে। কেউ যাতে খুঁেজ না পায় সেজন্য দুজনই মোবাইল ভেঙে সিম নষ্ট করে ফেলেন। গত ১৬ ফেব্রম্নয়ারি ভোরে চট্টগ্রামে এসে পাহাড়তলী থানার আব্দুল আলী নগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন তারা। বাসায় ওঠার পর দোকানে গিয়ে দুজনের জন্য কলা-কেক কিনে আনেন আশা। খাওয়ার পর গোসল সেরে ঘুমিয়ে পড়েন শামীম। ওই বাসায় ছিল একটি লাল কম্বল ও বিছানার চাদর। স্বামী যখন গভীর ঘুমে অচেতন, ঠিক তখন কম্বল দিয়ে চেপে ধরে শামীমের গলায় ছুরি চালিয়ে দেন আশা। রক্তাক্ত চেহারা দেখে ১০ মিনিট সত্মব্ধ থাকেন আশা। এরপর মুখের ওপর চাদর চাপা দিয়ে আবারও স্বামীর মুখের ওপর ছুরিকাঘাত করেন আশা। কয়েক মিনিটের মধ্যে রক্তমাখা পোশাক পাল্টে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা দেন আশা। চারদিন পর সূত্রবিহীন চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার রহস্য উন্মোচনে সড়্গম হয় পুলিশ।
পাহাড়তলী থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ জানান, ১৬ ফেব্রম্নয়ারি সকালে আশাকে নিয়ে ওই ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন শামীম। বাড়ির মালিকের কাছে তাদের নাম-ঠিকানা ছিল না। তবে বাসায় ওঠার আগে বাড়ির মালিকের এক মেয়ের কাছে কয়েকবার ফোন করেছিলেন শামীম। সেই নম্বরের সূত্র ধরে শামীমের ঠিকানা পেয়ে তার স্বজনদের খুঁজে বের করে পুলিশ। মা ও প্রথম স্ত্রী এসে শামীমের লাশ শনাক্ত করেন। ফেসবুকে এক মেয়ের সাথে শামীম কথা বলতেন, পুলিশকে এমন তথ্য দেন তার প্রথম স্ত্রী। এ তথ্যের ভিত্তিতে ১৯ ফেব্রম্নয়ারি আশা আক্তারকে বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া নতুনপাড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সড়্গম হয় পুলিশ। আশা আক্তার ওই এলাকার আব্দুল আজিজের মেয়ে।