যে কারণে মৃত্যুফাঁদ চকরিয়ায় মহাসড়ক

নিজস্ব প্রতিনিধি, চকরিয়া

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের শেষ সীমানা আজিজনগরস’ জেলা পরিষদের গেট ও দক্ষিণে খুটাখালী ইউনিয়নের নতুন অফিস পর্যন্ত উপজেলার ভেতর মহাসড়কের আয়তন ৪৪ কিলোমিটার। উল্লিখিত পরিমাণ সড়কের মধ্যে অন্তত আটটি পয়েন্টে আঁকাবাঁকা স’ানে রয়েছে মৃত্যুফাঁদ। সড়কপথে লবণ পরিববহনে গলে পড়া পানিতে পিচ্ছিল হচ্ছে সড়ক। অপরদিকে সড়কজুড়ে রয়েছে আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু ও সরু স’ান। পর্যটন শহর কক্সবাজারের সঙ্গে স’লপথের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হচ্ছে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ কারণে সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার ছোটবড় যানবাহন কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম বা রাজধানী ঢাকা আসা-যাওয়া করে আসছে। বিকল্প সড়ক না থাকায় ভারী যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি এ সড়কে ছোট যানবাহনও চলাচল করছে নিয়মিত। এতে প্রতিদিন কোনো না কোনো স’ানে বড় যানবাহনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ কিংবা পাশ দিতে গিয়ে ধাক্কায় দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে ছোট যানবাহনগুলো। এতে অকালে জীবন হারাচ্ছে নারী-পুরুষ-শিশু। আহত হচ্ছে অসংখ্য।

অভিযোগ উঠেছে, মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ৪৪ কিলোমিটার অংশে দুর্ঘটনার জন্য অনেকে হাইওয়ে পুলিশের কর্তব্যে অবহেলাকে দায়ী করলেও স’ানীয় সচেতনমহল বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ বেশি দায়ী। তাঁরা কারণ হিসেবে বলেছেন, মহাসড়কের চকরিয়ার রিংভং ছগির শাহ ঘাটা দরগাহ গেট সংলগ্ন মোড় এবং ফাঁসিয়াখালী আর্মিক্যাম্পের সামনের মোড়, এই দুস’ানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে অনেক বছর ধরে। এই দুটি পয়েন্টে গেল ৫-৭ বছরে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত দুশতাধিক মানুষ। আহত হয়েছেন অসংখ্য যাত্রীসাধারণ ও পথচারী। অথচ কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ বিভাগ মহাসড়কের অধিক ঝুকিঁপূর্ণ এই দুটি মোড় সোজা করে সড়কে সংযুক্ত করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতো না, হতো না প্রাণহানি।

অপরদিকে মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরী ব্রিজে অপরিকল্পিত মেরামতের কারণে সৃষ্ট আংশিক উঁচু, আংশিক নিচু অবস’ার কারণে ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৮জন বাস যাত্রী। সেই দুর্ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত ব্রিজটির হাল আগের মতোই রয়েছে। সচেতনমহলের অভিযোগ, মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট গাফিলতি থাকলেও সকলমহল দুর্ঘটনার ব্যাপারে শুধু পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চান।
তবে আশার কথা, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চারলেনে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ সড়কে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে সকলকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল একেবারে নিষিদ্ধ করলেও তা মানছেন না সংশ্লিষ্টরা। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে মহাসড়কে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক টমটম, মাহিন্দ্রসহ হরেক রকমের ত্রি-হুইলার।
জানা গেছে, লবণ মৌসুমের সময় মহাসড়কে লবণবোঝাই গাড়ি চলাচলের কারণে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়। বিভিন্ন স’ান থেকে মাটি পরিবহনকালে গাড়ি থেকে সড়কে মাটি পড়ে। বৃষ্টির পর ওই লবণজল ও মাটি কাদায় পরিণত হয়ে সড়ক অত্যধিক পিচ্ছিল হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, মহাসড়কে ছোট যানবাহন চলাচল একেবারে নিষিদ্ধ এবং আইন অমান্য করলে ব্যবস’া নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে হাইওয়ে পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন’ নানা কারণে এই নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারছে না তারা। হাইওয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন মহাসড়কে এ ধরণের যানবাহন চলাচল করছে। মূলত ছোট যানবাহনগুলো মহাসড়কে ওঠার কারণেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। সচেতনমহল মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বাঁককে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন।
স’ানীয় সচেতনমহলের অভিযোগ, হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মহাসড়কে ছোট যানবাহনগুলো চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করলেও অধস্তন কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তা না হলে সরকারের কঠোর নির্দেশনা সত্ত্বেও কিভাবে ছোট যানবাহনগুলো মহাসড়কে উঠতে পারে। এজন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

স’ানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ নানা স’াপনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ছোট-ছোট এসব গাড়ি। যার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ এসব যানবাহনে চলাচল করতে বাধ্য হয়। তারা দাবি করেন, মহাসড়ক হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষদের যাতায়াতে মিনিবাস অথবা বিকল্প সড়কের ব্যবস’া করলে তারা আর ছোটযানে যাতায়াত করবে না।
চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম তদারক করেন দোহাজারী হাইওয়ে থানা। থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক মহাসড়কে যাতে তিন ও চার চাকার ছোট যানবাহনগুলো উঠতে না পারে সেজন্য আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সমপ্রতি সরকারের কঠোর নির্দেশনার পর হাইওয়ে পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।

তিনি বলেন,‘আমাদের জনবল একেবারে স্বল্পসংখ্যক। তাই মহাসড়কের এই বিশাল অংশের পুরোটা একচোখে পাহারা দেওয়াটা বেশ কষ্টকর। আর এর সুযোগ নিচ্ছে তিন ও চার চাকার ছোট-ছোট যানবাহনগুলো। তবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আরো বেশি কঠোর হবো আমরা। যাতে কোনো অবস’াতেই এ ধরনের যানবাহন মহাসড়কে উঠতে না পারে।’
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সভাপতি সোহেল মাহমুদ বলেন, চকরিয়ায় সংঘটিত দুটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, স্টার লাইন পরিবহনের বাস ও লেগুনা গাড়ির মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন নিহতের ঘটনায় চালক দায়ী। কারণ ওইদিন স্টার লাইন পরিবহনের চালক ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সারারাত জেগে থেকে ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে সকালে বাসটি চট্টগ্রাম পৌঁছালেও একই চালক চোখে ঘুম নিয়ে ফের ওই বাসটি চালিয়ে কক্সবাজার আসছিলেন। ফলে চালকের চোখে ঘুম থাকার কারণে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ‘মহাসড়কের চকরিয়ায় সম্প্রতি সময়ে সংঘটিত দুটি দুর্ঘটনার কারণ বের করতে ইতোমধ্যে ১০ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোন্দকার ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাতকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে স্বাস’্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সদস্য করা হয়েছে। এই কমিটি সহসা প্রতিবেদন দেবে।’

তিনি বলেন, মহাসড়কে কোনো অবস’াতেই তিন বা চার চাকার ছোট যানবাহন চলতে পারবে না। তাছাড়া হেলমেটহীন মোটরবাইক চালকদের তেল না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পেট্রল পাম্পগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস’া নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।