যুৎসই ইস্যুর খোঁজে বিএনপি

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা
Untitled-1

গ্রেফতারি পরোয়ানা মানেই ’অ্যারেস্ট অর্ডার’। অথচ পরোয়ানা সত্ত্বেও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সাম্প্রতিক সময়ে একবারও গ্রেফতারের চেষ্টা করা হয়নি। সূত্র বলছে, হতে পারে বিএনপিকে মামলার বেড়াজালে আটকে রাখতে এটি কৌশলেরই অংশ। আন্দোলনের জন্য যুৎসই ইস্যুর দিকে তাকিয়ে থাকা দলটিকে এখনই কোনো সুযোগ দিতে চাইছে না ক্ষমতাসীন দল- এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।
বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় মাঠ গরম করতে চায় বিএনপি। কার্যত দুটো কারণে ইস্যু চায় তারা। দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় রেখে নির্বাচনমুখী করা আর সরকারবিরোধী জনমত গড়ে তোলা। কিন্তু এর জন্য যে টাটকা ইস্যু দরকার, সেটি ধরতে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে দীর্ঘকাল আন্দোলনের বাইরে থাকা দলটি।
চার বছর আগের এই সময়কার দিনগুলির দিকে চোখ ফেরালে শুধু জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-অবরোধের ছবিই ভেসে ওঠে। অবরোধ থেকে রেহাই পায়নি শুক্রবার এবং সরকারি ছুটির দিনগুলিও। আন্দোলনের সেই কঠিন দিনগুলি এখন শুধুই অতীত। বরং সেই সময়কার সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতার মামলা টানতে-টানতেই ক্লান্ত বিএনপির বহু নেতাকর্মী। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর। নিয়ম অনুযায়ী, ২০১৯ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে, বিএনপি সেদিক থেকে অনেকখানিই পিছিয়ে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সেই যে হারিয়ে গেল তারা , আন্দোলনের ট্র্যাকে আর ফিরতে পারেনি দুবার দেশ চালানো দলটি।
এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে নেতাকর্মীদের একত্র করতে বিএনপির একাধিক উদ্যোগ মাঠে মারা পড়েছে। হয়তো সমাবেশের অনুমতি মেলে না, কিংবা মিললেও নেতাকর্মীদের ওপর নানারকম নিষেধাজ্ঞার খড়্‌গ ঝোলে। মামলার ভারে ন্যুব্জ নেতাকর্মীদের মাঝে থাকে পুলিশি ভয়ও। লম্বা সময় পরে কিছুটা জনস্রো দেখা গেছে খালেদা জিয়ার উখিয়া অভিমুখে যাত্রাকে ঘিরে। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের দেখতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু পথে পথে বেগম জিয়াকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের যে উচ্ছ্বাস আর ব্যানার-প্ল্যাকার্ড-পোস্টারের প্রদর্শনী, তাতে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে আলোচনায় ঠাঁই করে নেয় রাজনীতি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে খালেদা জিয়াকে ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের যে ঢল নেমেছিল, সেটি থেকে ভীষণ অনুপ্রেরণা পায় বিএনপি। নেতারা ভেবেছিলেন, এখনই বুঝি ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। কিন্তু সেই সুযোগ বিএনপি আর পেলো কই! এরপরই আবার তাদের ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয় মামলা আর আদালত নিয়ে। খালেদা জিয়ার নামে জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। বিশেষ করে দলীয় চেয়ারপারসনের মামলা ঘিরে রাজনীতির মাঠ জমিয়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে পারছে না বিএনপি।
মাঝখানে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল এবং প্রধান বিচারপতি প্রসঙ্গ নিয়েও রাজনীতি শুরু করতে চেয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে ঘিরে সৃষ্ট ইস্যুটিও ধরতে পারেনি দলটি। এর আগে উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিতে তৎপরতা দেখিয়েছিল বিএনপি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও কেবল নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ। গত মাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে সমাবেশ করেছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু এগুলো খুব একটা উত্তাপ ছড়াতে পারেনি।
বিএনপি যখন রাজনীতির মাঠে ফিরতে গিয়ে বারবারই হোঁচট খাচ্ছে, ঠিক তখনই দেশে নতুন জোটের আবির্ভাব। নাম যুক্তফ্রন্ট। নেতৃত্বে এ কিউ এম বদরুদ্দৌজা চৌধুরী; যিনি একসময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। সরকারের সমালোচনায় সরব থাকা মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, বীরবিক্রম কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ এবং আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এই জোটের সঙ্গী। আপাতত বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি বি চৌধুরীই জোটের আহ্বায়ক থাকছেন।
তবে এই জোটের ভবিষ্যত নিয়ে খুব বেশি আশাবাদি হতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কারণ হিসেবে অনেকে তুলে আনছেন জোট নেতাদের বিভিন্ন সময়ের ভোটের ফল। সেদিক থেকে প্রায় সব নেতাই ফেল। এ জন্য ভবিষ্যতে ভোটের রাজনীতিতে নয়াগঠিত যুক্তফ্রন্ট যে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারবে না, তা আগে থেকেই অনুমেয়।
এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। প্রতীক বরাদ্দের পর দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে পড়েছে। বরাবরই স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ নির্বাচনগুলোতে অংশ নিচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সোচ্চার দলটি। তারই অংশ হিসেবে এখন দলটির চোখ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনে। মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ১ ডিসেম্বর থেকে পদটি শূন্য। সে হিসেবে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এখানে মেয়র পদে উপনির্বাচন হওয়ার কথা।
কিন্তু এসব ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাঠ কতটা গরম করা সম্ভব- বিষয়টি নিয়ে ভাবনা আছে নেতাদেরও। তাঁরা চাইছেন শক্ত বা যুৎসই কোনো ইস্যু নিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পথে পা বাড়াতে। কিন্তু দলীয় চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে এতিমখানার অর্থ আত্মসাতের মামলাটি নিয়ে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে তাঁদের। একই সঙ্গে দলের শীর্ষপর্যায় এই মামলার ভবিষ্যত নিয়ে শংকিতও। মামলার রায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গেলে, এ বিষয়ক ব্যস্ততা আরও বাড়বে। এর সঙ্গে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আছে ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলমান একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলাটিও।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খোন্দকার মোশাররফ হোসেন সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বিএনপিকে ছাড়া ভোট আশা করাই যায় না। গতবার যেটি হয়েছে, সেটি তো আসলে ভোট না। আমরা আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে মুখিয়ে আছি। কিন্তু আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি-না আজও তা নিয়ে শংকায় আছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একদিকে বিএনপিকে ভোটে আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারের ইশারায় বিএনপির চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে মামলার নেতিবাচক রায় দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এটি কখনোই সরকারের আন্তরিকতা প্রমাণ করে না।’
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলার রায় যা-ই হোক না কেন, এটি আরও দীর্ঘকাল ধরে চলমান থাকবে, তা অনেকটা নিশ্চিত। রায় পক্ষে গেলে বাদিপক্ষের আপিল, বিপক্ষে গেলে বিবাদির। ফলে সহজেই অনুমেয় যে এই মামলা সুরাহা হওয়ার আগেই শুরু হবে ভোটের হাওয়া। তবে নির্বাচন আরও ঘনিয়ে এলে নিশ্চিতভাবেই বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপও শুরু হবে পাল্লা দিয়ে। তারাও চাইবেন, দেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু রাজনীতির রাস্তায় হোঁচট খেতে থাকা অপ্রস্তুত বিএনপি সেই ভোটের দৌড়ে নিজেদের কীভাবে শামিল করবে, এ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না এখনই।