যদ্যপি আমার মামা

এজাজ ইউসুফী

মুক্তিযুদ্ধের সময় ’৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝি আমরা সপরিবার নানা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। যুদ্ধচলাকালীন কোন এক সময় মামাকে সেই প্রথম দেখেছিলাম। ছোটখাট একটি মানুষ। মাথাটি একটু বড়-ব্যাকব্রাশ করা মন চুল। চোয়াল শক্ত। চওড়া কপালের নিচে বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ। তাঁকে মাস্টার বলে ডাকতেন সবাই। পুরোনো আমলের মাটির ঘরে মামারা পাশাপাশি থাকতেন। তাঁদের ঘরটিতে গিয়ে দেখি কাঠের বিমের সঙ্গে অনেকগুলো বস্তা ঝোলানো। তাতে ঝুলকালি পড়েছে। নানিকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম মামার সংগৃহীত বই এগুলো। এত বই! তাও কড়িকাঠে খুলছে!! অতঃপর যুদ্ধ শেষ। আমরা শহরে ফিরে আসি। মামা কোনদিন আমাদের শহরের বাড়িতে আসেন নি। তাঁর সঙ্গে আর দেখাও হয়নি।
বিগত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে আমি কবিতা লিখতে শুরু করি। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি। মামা যে লেখালেখি করেন সে খবর পাই আরও পরে। সে সময় কবি বিপ্লব বিজয় বিশ্বাস ‘মৃগয়া’ বের করতেন। তিনি মাঝে মাঝে সবুজের আড্ডায় আসতেন। তাঁর মাধ্যমেই মামাকে নতুন করে আবিষ্কার করি। মামা যখন কবি অরুণ দাশগুপ্তের বৌদ্ধ মন্দির মোড়ের বাসায় এসে উঠলেন তখন মাঝে মধ্যে দেখা হতো। ততোদিনে জেনে গেছি এই লোকটি অসম্ভব পড়ুয়া এবং বিশ্বের তাবৎ বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য আছে। নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবেই তাঁর কাছে ভিড়তাম না। কখনও সামনে পড়লেই তিনি পড়া ধরার মতো প্রশ্ন করতেন এমন সব বিষয়ে, যেগুলো আমার জানা থাকতো না। দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন ঐ লেখকের বই পড়েছো?
ঐ দার্শনিকের কথা জানো? আমি কাঁচুমাচু-তিনি এতে মজা পেতেন। তাঁর মাধ্যমেই টি এস এলিয়টের ইংরেজি বই পড়া। বিশেষ করে এলিয়টের দুর্লভ বই ‘দি লাভ সং অব আলেকজেন্ডার জে প্রফক’, ঝবষবপঃবফ চৎড়ংব্থ হাতে পাওয়া। তারপর ক্যামুর ‘আউট সাইড’র’, কাফকার ‘ম্যাটামরফসিস’ আরো কতো কি বই! সেই যে তিনি কঠিন বই পড়াতে শেখালেন তারপর তো টলস্টয়, তুর্গেনিভ, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, ফ্রয়েড, মায়াকোভস্কি, পাভলভ, পাবলো নেরুদা, বিনয় ঘোষ, শিবনারায়ণ রায়, বাট্রান্ড রাসেল, লোরকা, অঁরি মিশো, আলেহো কার্পেন্তিয়ার, কার্ল মার্কস, মাক্সিম গোর্কি, বালজাক, হাওয়ার্ড ফাস্ট, গ্যাটে, অবীন্দ্রনাথ, প্লেটোর রিপাবলিক, মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষা, উইল ডুরান্ড, জাঁপল সার্ত্র, মিলান কুন্ডেরা, শার্ল বোদলেয়ার, রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন, জন মিল্টন, মোপাসাঁসহ কত যে বই পড়েছি তার ইয়ত্তা নাই। এখনও সেই পঠন চলছে। কিছু বুঝে পড়ছি-কিছু না বুঝে। এভাবে পরোক্ষে তিনি যেন আমার বিদ্যাচর্চার গুরু হয়ে গেলেন। তখন দূরে দূরে থাকতাম-এখনও তাই। যদ্যপি আমার মামা শুঁড়িবাড়ি না যায় তিনি তথাপি আমার নিত্যানন্দ রায় হয়ে গেলেন। পাঠক, যাকে নিয়ে এতো কথা লিখলাম তাঁর নামটি এখনও বলা হলো না। তিনি হলেন-কবি প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, অনুবাদক, সাংবাদিক সিদ্দিক আহমেদ।
আজকে আমরা উত্তর আধুনিকতার চিন্তা-চেতনা বাংলা কবিতায় বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এর পেছনেও ছিলো মামার পরোক্ষ প্রভাব। তিনিই পশ্চিমবঙ্গের ‘গাঙ্গেয় পত্র’ সম্পাদক অঞ্জন সেন-এর ঠিকানা আমাকে যোগাড় করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন-অঞ্জনরা একটি নতুন কাব্য ভাবনার সন্ধান করছেন। আমিও যেন এপার বাংলা থেকে তার সঙ্গে যুক্ত হই। কিন্তু তিনি নিজে যুক্ত হননি। কারণ, তিনি সর্বংসহা কোন একক দার্শনিক তত্ত্বের ছত্রছায়ায় যেতে নারাজ।
সিদ্দিক আহমেদ-এর বর্ণাঢ্য জীবন। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন ঠিকই কিন্তু এখনও তিনি তথাকথিত কমিউনিস্টের মতো কথা বলেন না। চিন্তাও করেন না। গোঁড়া কমিউনিস্টদের সঙ্গে এখানেই তাঁর পার্থক্য। তাঁকে আমি লিবারাল ভাবনার মানুষ হিসেবে জানি। আমাদের এদেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী খাণ্ডারনি স্বভাবের আর কিছু গজাল মাছের মতো গম্ভীর। এসব জোব্বাধারীদের থেকে তিনি আমার কাছে দীপ্তাংশুর মতো। শব্দ প্রক্ষেপণের সমস্যা না থাকলে প্রখর বাগ্মীতার অধিকারী হতে পারতেন তাঁর অধীত জ্ঞানের কারণে। এতো পাণ্ডিত্যের পরও তিনি সহজ মানুষ। যার ভজনা করতে মন যায়। আমার ফড়ঁনঃরহম সধহরধ আছে। সাহিত্য নিয়ে তো বেশি বেশি এটা আমাকে ভোগায়। মামাকে দেখলে আমার হিংসে হয়। মনে হয় চট্টগ্রামে বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনিই চরড়হববৎ.
সিদ্দিক আহমেদ-এর ছোট ছোট গদ্যগুলো এবং সাবলীল অনুবাদ আমাকে ভীষণ টানে। কারণ, এগুলোর মধ্যে জ্ঞানের কথা সংগুপ্ত থাকে। দ্ব্যর্থক লেখাগুলোর দ্যুতি ভীষণ সুন্দর। কখনো কখনো তা রোমান্টিক দ্রাঘিমা ছুঁয়ে যায়। তাঁর ধনুর্বাণ তরুণ মনকে সহজেই বিদ্ধ করে। এগুলোর নিগূঢ় সৌন্দর্য উপভোগ্য। তিনি দিলেন না। এ এক বড় ট্র্যাজেডি। তাই আমরা এক মৌন তাপসকে দেখি। তাঁর সত্যিকার প্রভাত দেখা থেকে বঞ্চিত হই। হায় ঈশ্বর, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে এক ধরনের রুদ্ধক্রন্দন লক্ষ করি। তাঁর ভেতরের জ্ঞানকে রূপায়ণ হতে না দেখে নিজে রুদিত হই। কৃষিজীবী পরিবারের মৃত্তিকা থেকে উঠে আসা বহু ঘাট পেরিয়ে জ্ঞানের রাজনীতির কাছে সমর্পিত এই মানুষটিকে মামা হিসেবে নয়, একজন তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষ হিসেবে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।