মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও তাঁর সভ্যতা বিচার

মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম

মোতাহের হোসেন চৌধুরী আর তাঁর সংস্কৃতি-কথা বইটির সঙ্গে যাঁদের পরিচয় নেই, এই ক্ষুদ্র লেখাটি তাঁদের জন্যে। কাজেই আগে খুব সংক্ষেপে ওঁর পরিচয় দিই। ১৯০৩ সালে ১লা এপ্রিল নোয়াখালি জেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে ওঁর জন্ম হয়। পিতা্তসৈয়দ আবদুল মজিদ, মাতা্তফাতেমা খাতুন। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কাটিয়েছিলেন নানার বাড়ি কুমিল্লায়। সেকালে সে বাড়িটি ‘দারোগাবাড়ি’ নামে লোকের কাছে পরিচিত ছিল। মোতাহের হোসেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯২৫ সালে বিএ এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে, ১৯৪২ সালে বহিরাগত ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে এম এ পাশ করেন। কিছুকাল মিলিটারি কন্ট্রাকটরের কাজ দিয়ে ওঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়। পরে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে শিক্ষকতা করেন। এখান থেকে বদলি হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে আসেন। ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের (১৯২৬) অন্যতম কর্মী আবুল ফজলের সঙ্গে এই কলেজে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন, কিন্তু পারিবারিক কারণে যোগ দিতে পারেন নি। সেজন্যে চট্টগ্রাম কলেজেই তাঁর পেশাগত জীবনের পুরোটাই কাটে। মাত্র তেপ্পান্ন বছর বয়সে, ১৯৫৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
ইংরেজ লেখক ও নন্দনতাত্ত্বিক ক্লাইভ বেল (১৮৮১-১৯৬৪) মনে করতেন সভ্যতা সম্পর্কে যাঁর যথার্থ কোনো মত নেই তিনি সভ্য নন। মোতাহের হোসেন চৌধুরী ক্লাইভ বেলের এই মতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। সভ্যতা সম্পর্কিত বেলের ধারণা ও মতামত মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বেলের একজন অনুরাগী পাঠক ছিলেন। এই অনুরাগ থেকে তিনি ক্লাইভ বেলের সিভিলাইজেশন বইটি তরজমা করেছিলেন। বেলের সভ্যতা সম্পর্কিত মতামত এই বইতে পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে জানা যায় মোতাহের হোসেন চৌধুরীর অনুপ্রাণিত হবার কারণ। বেলের ধারণা আর মোতাহের হোসেন চৌধুরীর অনুপ্রাণনা বাংলা ভাষায় তরজমাকৃত বইটিতে একাকার হয়ে আছে। সংক্ষেপে মূল কথাটি বোঝার চেষ্টা করা যাক।
সভ্যতা হচ্ছে মনের বস্তু্তঅর্থাৎ প্রাণের কাজে যার প্রথম প্রকাশ, মনের ভোগে তার শেষ পরিণতির নাম সভ্যতা। কথাটির কিছু ব্যাখ্যা আবশ্যক। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রাণে বাঁচা তার সর্বপ্রথম দায়। এই বেঁচে থাকার জন্যে তার যা কিছু চাই, সভ্যতার ভিত তাই দিয়ে তৈরি হয়। অতি সাধারণ একটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি বোঝা সহজ হতে পারে। জগতের সকল প্রাণী খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। মানুষ এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু মানুষের খাদ্য গ্রহণের প্রণালী আর-সব প্রাণীর মতো এক নয়। খাদ্য গ্রহণে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে, রুচি দিয়ে, চিন্তন ও মনন দিয়ে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা। তার এই স্বাতন্ত্র্য তার মনের বস্তু। জগতের অন্যসব প্রাণী বাঁচার জন্যে খায়। মানুষ খাওয়ার জন্যে বাঁচে না। তেমন বাঁচা সে বাঁচতেও চায় না। চেতনার এই স্তর থেকে সৃষ্টি হয়েছে এক প্রবাদতুল্য বাক্যের। যেখানে বলা হয়েছে, মানুষ খাওয়ার জন্যে বাঁচে না, বাঁচার জন্যে খায়। সংস্কৃতি ভেদে, রুচির তারতম্যে সেই খাদ্যও তেরি হয় উন্নত প্রণালী আর নানা আঙ্গিকে। এর থেকে বোঝা যায়, মানুষ বাঁচতে চায় তার বুদ্ধির ওপর, মননের ওপর, বিবেক ও বিবেচনার ওপর, স্বপ্ন ও কল্পনার ওপর, উচ্চায়ত চিন্তার ওপর।
প্রাণ চায় বাঁচতে, মন চায় সৃষ্টি করতে। সভ্যতা এই মনের সৃষ্টি। সৃজনশীল চিন্তার সঙ্গে নিরন্তর সচেতন কর্মপ্রয়াস মনের ধর্ম। এই মন কিভাবে সভ্যতা সৃষ্টি করতে পার্তেএ রকম জিজ্ঞাসায় মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘রাষ্ট্র সভ্যতা সৃষ্টির ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারে না। সভ্যতা সৃষ্টি করে ব্যক্ত্তিসুন্দর চিত্ত মানুষের প্রভাবেই সভ্যতা সৃষ্টি হয়। যে যুগে ব্যক্তি অবসর ও নিরাপত্তা সূক্ষ্ম উপভোগের কাজে প্রয়োগ করে, যে যুগে মমত্ববোধের চেয়ে বিচারবোধ বড় হয়ে ওঠে, সে যুগটা সুসভ্য যুগ। কেননা, তখনই মানুষের চিত্তের সমৃদ্ধি বড় হয়ে ওঠে।’
মোতাহের হোসেন চৌধুরী যা বলতে চেয়েছেন, তার মৌল কথাটি এই যে, ‘সুন্দর চিত্ত মানুষের প্রভাবেই সভ্যতা সৃষ্টি হয়।’ বুঝতে অসুবিধে নেই যে, প্রাণ কেবল বাঁচতে চায়, বাঁচার জন্যেই সে কাঁদে। সেখানে তার অস্তিত্বের প্রশ্ন। কিন্তু শুধু অস্তিত্ব দিয়ে সভ্যতা সৃষ্টি হয় না। কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে আর না আছে, তাই দিয়ে সভ্যতার বিচার সম্ভব নয়। সভ্যতার বিচার হয় মানুষের কৃতিত্ব দিয়ে। কেননা সভ্যতা তৈরি হয় মানুষের কৃতিত্ব দিয়ে, অস্তিত্ব দিয়ে নয়। রাষ্ট্র কিভাবে এই সভ্যতা সৃষ্টিতে সহায়ক, আসল প্রশ্নটি সেখানেই। আর্থিকভাবে পরনির্ভর, প্রশাসনিক ক্ষমতায় দুর্বল, রাজনৈতিক চেতনায় পঙ্গু, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সাধনায় উদাসীন্তএমন রাষ্ট্রের মধ্যে মানুষের সৃষ্টিশীলতা এবং নিরাপত্তা অসম্ভব। সভ্যতায় উন্নত হতে হলে উন্নত গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক চর্চা অপরিহার্য। তেমন অবস্থাতেই কেবল সম্ভব মানুষের স্বস্তি, শান্তি, অবসর ও নিরাপত্তা। ও-শর্ত পূরণ না হলে উন্নত সভ্যতার চিন্তা স্বপ্নমাত্র। তেমন অবস্থায় ব্যক্তির কৃতিত্বও তথৈবচ।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী বিচারবোধের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপরিহার্যতা বিলক্ষণ জরুরি। কেন? কারণ ‘সভ্যতার বিশেষ লক্ষণ মূল্যবোধ ও যুক্তি-বিচারের প্রতিষ্ঠা।’ এটা যেখানে সম্ভব হয়, সেখানে প্রাণের থেকে মনের গুরুত্ব বেড়ে যায়। চেতনার এই দুই স্তরের অর্থ কী? এর ব্যাখ্যায় মোতাহের হোসেন বলেন, ‘একটি ভাজা ডিমের চেয়ে একটি সনেট উৎকৃষ্ট, এই মনোভাবই মূল্যবোধ, আর প্রায় প্রতিটি ব্যাপার বুদ্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার ব্যাপক প্রবৃত্তিই যুক্তি-বিচারের প্রতিষ্ঠা। এই দুই গুণ যেখানে আছে, সেখানেই সুসভ্যতা বিদ্যমান, আর যেখানে নেই সেখানে সুসভ্যতার অভাব।’ মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচারের বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তিনি বলেন,
নিকটবর্তী স্থূল সুখের চেয়ে দূরবর্তী সূক্ষ্ম সুখকে, আরামের চেয়ে সৌন্দর্যকে, লাভজনক যন্ত্রবিদ্যারর চেয়ে শিক্ষা ও আনন্দপ্রদ সুকুমার বিদ্যাকে শ্রেষ্ঠ মনে করা, [এবং তাদের জন্যে প্রতীক্ষা করতে শেখা] ্তএসবই মূল্যবোধের নিদর্শন, আর এসবের অভাবই মূল্যবোধের অভাব, যুক্তিবিচারের প্রভুত্ব বলতে বোঝায় জীবনের সকল ব্যাপারকে বিচারবুদ্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেবার প্রবণতা। যুক্তিবিচার সকলের ভেতরেই কিছু-না-কিছু থাকে, কিন্তু এই সাধারণভাবে থাকা নয়, বিশেষ ও ব্যাপকভাবে থাকার কথাই বলা হচ্ছে। এ যুক্তি যেন যুক্তিবিচারের পূজা, কার্যসিদ্ধির জন্য তার নামমাত্র ব্যবহার নয়। বিচার-বুদ্ধির যতবেশি প্রতিষ্ঠা সমাজ তথা সভ্যতারও তত বেশি উন্নতি।
সভ্যতার জন্যে চাই্ত‘ধ্যান, কল্পনা, প্রেম, বুদ্ধি ও অনুভূতি, এসবের যথার্থ মূল্য দান এবং এদের প্রকাশ যে সাহিত্য, শিল্প ও বিজ্ঞান, এদের সারবস্তু বলে গ্রহণ্তএই মূল্যবোধের নিদর্শন, আর সভ্যতা এই মূল্যবোধের সৃষ্টি। এদের অভাব, সভ্যতার অভাব। এ কথাটি মনে না রাখলে সুসভ্যতা সৃষ্টি অসম্ভব। মূল্যবোধের অভাব হলে হাজার হাজার উড়োজাহাজ মাথার উপরে ঘুরলেও সুসভ্যতা সৃষ্টি হবে না।’
আজ আমরা যে-রাষ্ট্রে বাস করবার সৌভাগ্য লাভ করেছি, সেখানে চোখে পড়ে কেবলই ‘উড়োজাহাজ’ অর্থাৎ প্রাণের ভোগের কাজে ব্যস্ততা। এটাকে নিরেট অন্ধতা না বলে উপায় নেই। অন্ধ ভোগের মধ্যে লক্ষ্য থাকে একটি। শুধু দাও। না পেলে কেড়ে নেবার ফন্দি, জুলুম করবার উত্তেজনা ভিতরে তৈরি হয়। হিংসার জন্ম এই পথে। কেননা লুব্ধ বাসনার এ এক অনিঃশেষ অতৃপ্তি। সৃষ্টি করবার প্রয়াস ও ভালোবাসার দায় নিভে গেলে অন্যায় প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই সকল রকম বিকৃতির মূল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এই ভোগের মধ্যে। হিংসার জন্ম প্রাণিত্ব থেকে। ভালোবাসা অর্জন সাপেক্ষ। এজন্যে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সভ্যতা সহজাত ব্যাপার নয়, সাধনার সৃষ্টি’ অর্থাৎ কৃতিত্ব এর যথার্থ সৌন্দর্য।
সভ্যতা বিষয়ক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই ব্যাখ্যা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর সংস্কৃতি-কথার সেই ক্লাসিক ধর্মী বাক্যের। যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্ম্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত-মার্জ্জিত লোকের ধর্ম্ম।’ এই ধর্ম সহজাত সামাজিক জীবন যাপনের মধ্যদিয়ে অন্তরে স্থান করে নিতে পারে। কিন্তু লেখাপড়া না জেনে, কালচারের সঙ্গে যথার্থভাবে পরিচয় না হয়ে ‘শিক্ষিত-মার্জ্জিত’ হওয়া সহজ নয়। এটা অর্জন সাপেক্ষ। সভ্যতা এই অর্জিত ফলের মধ্যে একটি।

লেখক : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক