‘মেয়েকে কাফনের শাড়ি পরিয়ে বিয়ে দিও’

মোহাম্মদ রফিক

সর্বনাশা আগুনে স্ত্রীসহ চার সন্তান হারিয়ে অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন সুরুজ মিয়া। বাকরুদ্ধ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। তার পাশে বসে কাঁদছে আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া মেয়ে নার্গিস আকতার (৯)। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। বাবার চোখ মুছছেন মেয়ে। আর মেয়ের চোখ মুছছেন বাবা। জিজ্ঞাসা করতেই ‘নাজমা’ বলে চিৎকার দিয়ে বিছানা থেকে উঠে গেলেন সুরুজ মিয়া।
সুরুজ বলছেন, ‘ও মা তুই কোথায় গেলিরে। আমি কেন পুড়ে অঙ্গার হলাম না। ক’দিন পরেই তো তোর বিয়ে হবার কথা ছিল। ব্যাংক থেকে দু’লাখ টাকা ঋণ করেছি। তোর মা দোকানে কিছু পুঁজি দিয়েছিল। বাকি টাকা তো তোর বিয়ের জন্য রেখেছিল। টাকা আনতে গিয়েই তুইও শেষ তোর মাও শেষ। ও ভাই ‘তোমরা আমার মেয়েকে সাদা কাফনের শাড়ি পরিয়ে বিয়ে দিও’ এভাবেই বিলাপ করতে থাকে সুরুজ মিয়া।
কাঁদতে কাঁদতে সুরুজ মিয়া জানান, ৬-৭ মাস আগে ফরিদ সওদাগর থেকে মাসিক সাড়ে চার হাজার টাকায় বস্তির দুটি কক্ষ তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন। পেছনের রুমে থাকতেন তার স্ত্রী রহিমাসহ পাঁচ সন্তান। রহিমার এক ছেলে তিন মেয়ে। ৩০ বছর আগে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। রহিমা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে একই বস্তিতে থাকেন সুরুজ মিয়া।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সুরুজ বলেন, ‘রাত তখন সাড়ে তিনটা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। চারদিকে শুধু শুনি আগুন, আগুন। এসময় আমার স্ত্রী রহিমা ঘর থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে বস্তির অনেককে জাগিয়ে তুলে। তিন মেয়ে ও ছেলে তখন ঘরে ঘুমে ছিল। মেয়ে নাজমার বিয়ের জন্য ঘরে রাখা নগদ টাকা ও সন্তানদের আনতে গিয়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেল সে।’
পোড়ামাটির ওপর বসে বিলাপ করছিলেন রহিমার প্রতিবেশী পটিয়ার শান্তিহাটের রুমা আকতার। বলেন, ‘আগুন লাগার পর আমরা রহিমার চিৎকার শুনে জেগে উঠি। সবাইকে ডাকার পর নিজের ঘরে যান মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা টাকা ও সন্তানদের নিয়ে আসতে। আমি যেতে নিষেধ করলেও সে শুনেনি। তিন সন্তানসহ পুড়ে মারা গেল সে। আমাদের বাঁচিয়ে দুনিয়া ছেড়ে গেল সে। এ কষ্ট কোথায় রাখি।’
পোড়া ভস্মের মধ্যে হাতড়াচ্ছেন কুলসুমা বেগম। চারমাস আগে মাসিক ৪২ শ’ টাকায় একটি দোকান ঘর ও বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দোকানে চাল-ডালসহ নানা খাদ্যপণ্য তুলেছিলেন। ‘আগুন সব শেষ করে দিয়েছে। পরনের কাপড়ও বাঁচাতে পারিনি’ বিলাপ করতে করতে বলেন কুলসুমা। পুড়ে যাওয়া ঘরের জিনিসপত্র দেখে দেখে কাঁদছেন রুনা বেগম। ‘সাত্তার সওদাগর থেকে মাসিক ১৮০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। আমার দুই সন্তান। স্বামী মাছ ধরার ট্রলারে কাজ করেন। দুই ছেলেকে নূরানি মাদ্রাসায় দিয়েছি। তিল তিল করে সংসার গড়েছি। সর্বনাশা আগুন কেড়ে নিল সবকিছু’ বলেন রুনা বেগম।
৬ বছর ধরে ভেড়া মার্কেট বস্তিতে থাকছেন অটো রিকশাচালক আবুল কালাম। তার তিন সন্তান। আগুন লাগার পর সন্তানদের নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন তিনি। ঘরে লক্ষাধিক টাকার মালামাল ছিল। চোখের সামনেই পুড়ে গেল সবকিছু। নতুন রিকশা কিনতে এনজিও থেকে লাখ খানেক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল। ৬ বছর আগে চকরিয়ার বাসিন্দা বেলালকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন ফরিদা। তাদের সংসারে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আগামী ২০-২২ তারিখ রিকশা কেনার কথা ছিল। নতুন রিকশায় আয় বাড়বে। এ নিয়ে স্বপ্নও কম ছিল না তার। ‘আগুন এক নিমিষেই সব চুরমার করে দিয়েছে’ বলেন ফরিদা।