মেজবানে জনস্রোত

মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ইহজগত ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও মা-মাটি ও মানুষের প্রিয় সন্তান এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
মৃত্যুর তিনদিন পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে নগরীর সর্বস্তরের মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় জিয়াফত ও বিশেষ মেজবান। জীবদ্দশায় সকল মানুষের কাছে প্রিয় ও অতিথিপরায়ণ এ মানুষটির নামের মেজবানিতে হাজির হয় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ। এতে পুরো চট্টগ্রাম নগরী যেন একদিনের জন্য মেজবানের নগরী হয়ে ওঠে।
এ উপলক্ষে গরিব উল্লাহ শাহ মাজার সম্মুখস্থ কে স্কয়ার, চকবাজারের কিশলয় কমিউনিটি সেন্টার, পাঁচলাইশের দি কিং অব চিটাগাং সেন্টার, লাভলেইন স্মরণিকা ক্লাব, মুরাদপুর এন. মো. কনভেনশন সেন্টার, কালামিয়া বাজারের কে বি কনভেনশন হল, কাজির দেউড়ির ভিআই ব্যাংকুইটে, আগ্রাবাদ এক্সেস রোডস্থ গোল্ডেন টাচ, বড়পোলের কিংস পার্ক, পোর্ট কানেকটিং রোডস্থ সাগরিকা কমিউনিটি সেন্টার, স্টিল মিলের মুনভিউ কমিউনিটি সেন্টার, বহদ্দারহাট মৌলভী পুকুর পাড়ের চান্দগাঁও কমিউনিটি সেন্টারে জিয়াফত উপলক্ষে বড় পরিসরে মেজবানের আয়োজন করা হয়।
এছাড়া আসকার দিঘীর পাড়স্থ রীমা কমিউনিটি সেন্টারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য এবং মরহুমের চশমা হিল বাসভবনে মহিলাদের জন্য বিশেষ মেজবানের ব্যবস্থা ছিল।
মেজবানের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি করা হয় দি কিং অব চিটাগাং কমিউনিটি সেন্টারে। কমিউনিটি সেন্টারটিকে বিশেষ সজ্জায় সাজানো হয়। প্রবেশমুখে কালো কাপড় দিয়ে নির্মাণ করা হয় বিশাল তোরণ। বেলা এগারটার দিকে দি কিং অব চিটাগাংয়ে গিয়ে দেখা যায়, অনুষ্ঠানস্থলের মাঠ জুড়ে শত শত মানুষ গিজগিজ করছে। সেখানে যেমন কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর আছে তেমনি আছে সরকারি পদস্থ কর্মকর্তারাও। এ যেন এক মহামিলন মেলা। যেখানে সবাই একত্রিত হয়েছে একসাথে বসে একবেলা খাবে বলে। মাঠের পাশে কেউ কেউ যেমন প্রাইভেটকার পার্ক করে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন, তেমনি অপেক্ষা করছেন রিকশাওয়ালা পাশেই তাঁর রিকশাটি রেখে।
দি কিং অব চিটাগাংয়ে মূল হল রুমটির পশ্চিম পাশে তাঁবু টানিয়ে বানানো হয় অস্থায়ী আরেক হলরুম। বেলা বারোটার আগে থেকে সেখানে আসতে থাকেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন সংসদ সদস্য, বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীবৃন্দ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, দেশি-বিদোশ কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, মহিউদ্দিন চৌধুরীর দুই পুত্র ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও বোরহানুল হাসান চৌধুরী সম্রাট এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু।
মেজবানের মুল আনুষ্ঠানিকতা ভোজপর্ব শুরুর আগে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ মরহুমের স্মৃতিচারণা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারানো মানে শুধু চট্টগ্রামের একজন অভিভাবককে হারানো নয়, বাংলাদেশের একজন জাতীয় নেতাকে হারানো।’ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘মহিউদ্দিন ছিলেন একজন চমৎকার মনের মানুষ। চট্টগ্রামের মানুষ তাঁকে আজীবন মনে রাখবে।’
এগারটা থেকে মেজবান শুরুর কথা থাকলেও দি কিং অব চিটাগাংয়ে মেজবান শুরু হয় বেলা একটায়। এতে অনেক লোককে ধৈর্যহারা হয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়। তবে চকবাজারের কিশলয় কমিউনিটি সেন্টার, মুরাদপুরের এন. মো. কনভেনশন সেন্টার এবং হালিশহরস্থ গোল্ডেন টাচে বারোটার আগে থেকে ভোজপর্ব শুরু করা হয়। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে দুপুর একটা থেকে ২টা পর্যন্ত সময়ে। এ সময় অভ্যাগত জনস্রোতকে সামাল দিতে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক আওয়ামী দলীয় নেতাকর্মীদের গলদঘর্ম হতে দেখা গেছে।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে আসকর দিঘীর পাড়ের রিমা কমিউনিটি সেন্টারে এমনই এক বাঁধহীন জনস্রোতে পদদলিত হয়ে মারা পড়ে ১০ হতভাগ্য। আয়োজক এবং অভ্যাগত উভয়ই একটু সচেতন হলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত বলে প্রত্যক্ষদর্শী সবার অভিমত।
এক রিমা কমিউনিটি সেন্টার ছাড়া বাকি কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে ছোটখাট কিছু ধাক্কাধাক্কি ছাড়া মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে ভোজপর্ব সম্পন্ন হয়েছে বলে জানালেন কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে নিয়োজিত তত্ত্বাবধায়কগণ।
এন. মো. কনভেনশন সেন্টারের তত্ত্বাবধানে থাকা মহানগর যুবলীগ আহবায়ক কমিটির সদস্য নুরুল আনোয়ার, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আলী রেজা পিন্টু এবং হালিশহরস্থ গোল্ডেন টাচে তত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক রনি মির্জা সুপ্রভাতকে বলেন, ছোটখাট কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে সবাইকে ভরপেটে খাইয়ে বিদায় করতে পেরেছি।
বিভিন্ন কনভেনশেন সেন্টারে ভোজপর্বের পাশাপাশি দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়। এছাড়া খোলা হয় বিশেষ শোকবই। মেজবানে আগত সর্বসাধারণকে ভিড় জমিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর ও মন্তব্য লিখতে দেখা গেছে। এছাড়া প্রত্যেক কমিউনিটি সেন্টারে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের করা তথ্যবহুল বিশেষ ক্রোড়পত্র বিনে পয়সায় বিলি করা হয়।