চাল বিক্রিতে অনিয়ম রুখতে হবে

মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

এ বছরের সাত সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উত্তর বাংলার কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে ঐতিহাসিক একটি জনবান্ধব কর্মসূচির সূচনা করেন। এ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা হলো ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ টাকা কেজি দামে প্রতিমাসে ৩০ কেজি চাল বিতরণ। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল এ পাঁচ মাস অব্যাহত রাখা হবে এ কর্মসূচি।
এসডিজি এর অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে অভিযান এটি। দেশে প্রান্তিক দারিদ্র্য হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তবে নির্মূল হয়নি। দরিদ্রাবস’াকে যাদুঘরে পাঠিয়েই অন্যান্য অগ্রযাত্রা আমাদের জয় করতে হবে। বিশ্বের মানুষের জন্য ‘কমন’ এ শত্রুকে নির্মূল করেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ দৃঢ় ও মসৃণ করতে হবে। এ প্রত্যয়েই এমন যাত্রা। এ যাত্রাকে সাধুবাদ জানিয়েছে দেশের মানুষ। উচ্ছ্বসিত হয়েছি আমরা।
এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্য পরাজিত করা আমাদের অন্যতম মিশন। আমাদের মনে আছে, ১৯৭৪ সালের এমন দিনে মাত্র ২২-২৫ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্যের হাহাকার সৃষ্টি হয়েছিল। মানবতা বিপর্যস্ত হয়েছিল। বহুমানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। ভু-প্রাকৃতিক এবং আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী এবং সম্প্রসারণবাদী তথাকথিত নীতি-রীতির কারণে বাংলদেশের মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল।
প্রেক্ষাপটকে রাজনীতির কারণে যে ভাবেই প্রচারে আনা হোকনা কেন এর মূলে যে বাসন্তিকে জাল পরানোই উদ্দেশ্য ছিল না, তা বিশ্লেষণ করা যায়। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে ভারত থেকে যুদ্ধ-শরণার্থীর বিশাল বহর প্রত্যাবর্তন করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে। গৃহহীন, সম্বলহীন, আশ্রয়হীন এ বিশাল জনবহরকে সামলে নিতে সদ্যস্বাধীন দেশ প্রস’ত ছিল না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। আন্তর্জাতিক মেরুকরণ এ সংকটে বৈপরিত্যের হাওয়া লাগিয়ে দেয়। আজকের অনেক বন্ধু বা বন্ধুপ্রতিম, শুভাকাঙ্ক্ষী দেশ ও জনপদ আমাদের বিকাশ ও জন্মকে মেনে নিতে পারেনি ভূ-রাজনীতির মেরুকরণের জন্য।
স্বাধীনতার সুখ সংকটে রূপান্তরিত হয় অল্পদিনেই। চারিদিকে বিচ্ছিন্ন সহযোগিতা থাকলেও অসহযোগিতা ছিল দৃশ্যমান। রিলিফ বিতরণে অনিয়ম, প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা, অপ্রতুল রিলিফ সামগ্রী, বিতরণে অব্যবস’াপনা। অসততার অপকর্ম দেশে বিদেশে সদ্যস্বাধীন দেশের ভাবমূর্তিকে খাটো করে ফেলে। সততার এ সংকটাপন্নবস’ার মাঝেই ১৯৭৩ এ স’ানীয় সরকার নির্বাচন হয়।
নির্বাচনে জনরায়ে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি সাবেক মুসলিম লীগের, জামাতে ইসলামি, নেজামে ইসলামিরা স’ানীয় সরকারে ইউপি মেম্বার, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। সারা দেশের গ্রামেগঞ্জে এ চিত্র দৃশ্যমান হয়। পাকিস্তানপনি’ আমলারা প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে এদের সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে।
ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রতিটি প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা এলাকার নির্বাচিত হয় পাকিস্তানি ধারার তেইশ বছরের পাকিস্তানি সেবক মেম্বার, চেয়ারম্যানরা। একই সময়ে মুক্তিযোদ্ধার একটি অংশ, বিভিন্নভাবে যুদ্ধে সহায়তাদানকারী একটি অংশের নিয়ম না মানা সংস্কৃতি চরম আকার ধারণ করে। যে ভাবে এবং যে পরিমানে অস্ত্র জমা পড়ার কথা, তা অপূর্ণ থাকে। তারুণ্যের টগবগ তাড়না নিয়ে, অনেকটা অনিশ্চিত লক্ষ্য নিয়ে জন্ম নেয় জাসদ নামের ক্ষণজন্মা রাজনৈতিক দর্শন, এদের ব্যাংক – থানা লুঠপাট, সর্বহারা শ্রেণি নামে প্রয়াত সিরাজ শিকদারের বাহিনীর অপতৎপরতায় দেশে প্রশাসনিক রাজনৈতিক অবস’া বড় ধাক্কা খায়।
বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। ১৯৭৪ এর মধ্যেই ঘটে যায় এক ভয়ংকর বন্যা। ফসলের হানি হয়। মন্দায়-খরায় অনিশ্চিত হয়ে যায় প্রান্তিক মানুষের জীবন। পিএল ৪৮০ এর কেনা খাদ্য এ সময় ভূরাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ অপূর্ণতায় ভরে যায়। ন্যায্যমূল্যের প্রয়োজনীয় সামগ্রির বিতরণ ধারণার সুফল মানুষকে বঞ্চিত করে।
খরাপীড়িত অঞ্চলে ভয়াবহ অবস’ার সৃষ্টি হয়। চালের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। আটা খাওয়ায় মানুষ কম অভ্যস্ত থাকলেও আটার দামও ক্রয়ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়।
তখন চালের দাম ছিল দশ টাকা। মানুষ ছিল সাড়ে সাত কোটি। গ্রামে-মহল্লায়, ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দেন একজন লোকও যেন না খেয়ে মারা না যায়।
তাদের খাবার তৈরি করে খাওয়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়। প্রতিটি লঙ্গরখানা থেকে রুটি, খিচুড়ি তৈরি করে মানুষকে খাওয়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
কিন’ দুর্ভাগ্য অন্যপথে বিচরণ করতে থাকে। সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণ থাকার পরও শুধু বণ্টনের আন্তরিকতা ও অব্যবস’াপনা এবং অনিয়মের জন্য হাহাকার পড়ে যায় চারিদিকে। প্রতিজন ইউপি মেম্বার চেয়ারম্যান ফেঁপে ফুলে উঠতে থাকে। চাল, আটা, রুটি নিয়ে বিতরণের অনিয়ম চরম আকার ধারণ করে।
পাকিস্তানপনি’ এসব মেম্বার, চেয়ারম্যানদের প্রায়শই বলতে শোনা যায়-ভাতে মারবো, পানিতে মারবো-বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক উক্তি। তারা প্রহসন করে তা বলতে থাকে।
গ্রামে গঞ্জে চাল, আটা, রুটি খিচুড়ি দিয়ে মেয়েদের সম্ভ্রম কেনাবেচা হতে থাকে। এসবের ক্রেতা ছিল সে সব পাকিস্তানি দর্শনের প্রতিনিধিরা। ’৭৩ এর রিলিফ বিতরণে অনিয়ম করা সরকারি দলের লোকজন তাদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়।
খাদ্যদ্রব্যের যথেষ্ট সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অনিয়মই সব ব্যবস’াকে ভণ্ডুল করে দেয়। মানুষ দিশেহারা হয়ে অখাদ্য-কুখাদ্য খেতে থাকে। মহামারী, কলেরায় মানুষ মৃত্যুকে বরণ করে। প্রশাসন যে আমলারা চালাতো, তারা নির্লিপ্ত-নিষ্ক্রিয়তার নীতি মেনে চলে। মাত্র ২২-২৫ দিনকে পার করতে এতোটাই হিমসিম খেতে হয় যে, তা আজ ইতিহাসের করুণ একটি অধ্যায় হয়ে আছে। অব্যবস’াপনার পরীক্ষায় তখন আমরা পাস করিনি। চরম মূল্য আমরা দিয়েছি। ’৭৪ এর পর প্রায় বিয়াল্লিশ বছরে দেশের সক্ষমতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মিত্রের সংখ্যা বেড়েছে। দারিদ্র্য চ্যালেঞ্জ করে দেশ এগুচ্ছে। ৫০ লাখ লোককে মাত্র ১০ টাকা দরে চাল বিতরণের মহৎ ও টেকসই ব্যবস’া নিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মীবাহিনীকে তা বুঝতে হবে। যে সব অনিয়ম সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছরে প্রশ্নবিদ্ধ করছে তার জন্য কর্মীবাহিনীকে আরও সচেতন ও সজাগ হওয়া দরকার। ’৭৪ সাল বঙ্গবন্ধুর জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছিল। আন্তর্জাতিক শত্রুরা খুশি হয়েছিল।
আজ সে পরিবেশ নেই। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে আশাতীতভাবে। শত্রুরা এখন মিত্র হয়ে পাশে অবস’ান নিচ্ছে। অনেকে ভাল ভনিতা ছেড়ে দিয়েছে। আজকের চীন ১৯৭৫ এর বঙ্গবন্ধু হত্যার দশ দিন পর আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছিলো। আজকের বন্ধু সৌদি আরব স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল দশটার দিকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পরে।
কর্মীদের সততার ওপর দল দাঁড়িয়ে থাকে। এগিয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের সততার পরীক্ষায় বার বার পাস করতে হবে।
চাল বিতরণে যে সব অভিযোগ পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যমগুলোতে আসছে, তার যথার্থতা থাকলে তা নির্মূলে কর্মী বাহিনীকে ’৭৪ এর বিপর্যয় মাথায় রেখে কাজ করতে হবে।
দেশের অগ্রগতির যে সুখ, এটি কর্মীদের চেয়ে আর বেশি অন্যদের জানার কথা নয়। ওজনে কম দেয়া,ধনী-সচ্ছলদের মধ্যে চাল দেয়া, স্বজনপ্রীতি বর্তমান সরকারের এগিয়ে চলার প্রত্যয়কে বাধাগ্রস্ত করবে।
২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গতিশীলতাকে বেগবান করতে হবে। একজন্য কর্মীর নির্ভরযোগ্যতা হবে সবচেয়ে বেশি।
এ প্রত্যয় প্রতিটি সংশ্লিষ্টকে লালন ও ধারণ করতে হবে।
আমাদের বিশ্বাস, চাল বিতরণ ব্যবস’ার উন্নতি হবে। অনিয়ম দূর করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাই দেশের অগ্রগতিতে অংশ নিয়ে সংহতি ও সুস’ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবে। দেশের মানুষকে পিছিয়ে রেখে যে উন্নয়ন বা রাজনীতি তা কল্যাণকর নয়। আমরা তা প্রত্যাখ্যান করে সংহতি ও সহযোগিতার সংস্কৃতি চালু রাখবো। এই হোক প্রত্যয়।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক

আপনার মন্তব্য লিখুন