মুমুর বোশেখ মেলা

উৎপলকান্তি বড়ুয়া
mela-BG20160422183016

‘টমটম, ঢোল, রঙিন ফিতা, গয়না-পুঁতির মালা
মাটির হাঁড়ি, বাঁশের বাঁশি, খেলনা কুলা-ডালা।
বোশেখ মেলায় কেঁচোর মেচোর রঙিন নাগরদোলা
পেলাস্‌টিকের মজার মজার ঝুন্‌ ঝুনা ঝুন্‌ লোলা—-’
একবার। দুইবার। তিনবার। চারবার। -একসময় মুখস্থ হয়ে যায় মুমুর। বৈশাখের অনুষ্ঠান মঞ্চে মুমুর আবৃত্তির পরিবেশনা আছে আগামীকাল।
মুমু হঠাৎ বাবাকে প্রশ্ন করে, -আচ্ছা বাবা ‘টমটম’ কি?
-ওমা! টমটম চিনো না? পরক্ষণে মুমুকে কাছে টেনে নিয়ে বললো-টমটম? বাবা যেনো সত্যি মুমুর এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতই ছিল না। মুমুর প্রতি একপলক একদৃষ্টে চেয়ে থেকে বাবা বলে,-টমটম! তোমরা কিম্বা তোমাদের মতো অনেকেরই না চেনার কথা। তোমাদের এ যুগের ছোট ছেলেমেয়েরা অনেকেই হয়তো টমটম চেনে না, এ কথা সত্যি।
টমটম হলো এক ধরনের ছোটদের খেলনা গাড়ি। মাটির তৈরি দু’টো চাকা এবং মাটির তৈরি একটা চেপ্টা খোলের উপর চামড়া লাগানো থাকে। যাতে দু’টো পাতলা বাঁশের কাঠি চাকার সাথে থাকা ছোট্ট দণ্ডের ফাঁকে জুড়ে দেয়া হয়।
বাঁশের দু’টো মোটা ফালার উপরেই টমটম গাড়ির মূল ভিত্তি। সে দুটো বাঁশের ফালা পেছন থেকে সামনের দিকে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে শেষ হয়। সেই সরুর শেষ প্রান্তেই ছোট্ট রশি বেঁধে, সেই রশি ধরে টানলেই চলে টমটম গাড়ি। চলার সময় চাকার দণ্ডটি ঘুরলেই পাতলা বাঁশের কাঠি মাটির চেপ্টা খোলের উপর চামড়ায় আঘাত করে। সেই আঘাতের শব্দটাই কিন্তু শুনতে খুব মজা। যতক্ষণ চলবে টমটম, ততক্ষণ মজার শব্দ হবে এই টমটমের।
-খুব মজাতো! বাবা, টমটম কি মেলায় পাওয়া যায়?
আগের দিনে মেলায় পাওয়া যেতো। এখন পাওয়া যায় কিনা সেটা ঠিক বলতে পারছি না। কালে-ভদ্‌্ের কোনো কোনো মেলায় পাওয়া যেতেও পারে হয়তো।
মুমু বাবার কোলে মজে বসে আরো।
-আচ্ছা বাবা, খেলনা কুলা কি সত্যি পাওয়া যায়? আর খেলনা ডালা, সেটা কি আবার, বাবা? দ্বিতীয় শ্রেণি বয়সের মুমুর মুখে ঝরঝরে প্রশ্ন।
-কুলা তো তুমি চেনোই। হ্যাঁ, খেলনা কুলাও আছে। তোমাদের মতো ছোট্টমণিদের জন্য খেলনা কুলাও কিনতে পাওয়া যায়। আর ডালা? সেটাও কুলার মতো। কুলা হলো লম্বাটে।
আর ডালা দেখতে গোলাকার-গোল। দু’টোই কিন্তু মূলত বাঁশের তৈরি। ইদানিং অবশ্য অনেক রকমের কুলা-ডালা পাওয়া যায় বাজারে। যেমন পেলাস্‌টিকের তৈরি। মোটা কাগজের তৈরি। নাইলনের তৈরি ইত্যাদি। আর এগুলো দিয়ে তোমরা খেলা করো বলেই খেলনা কুলা বা খেলনা ডালা বলা হয়।
মুমু আবারও বাবাকে প্রশ্ন করে,
-আচ্ছা বাবা ‘লোলা’ কি?
-লোলা? সুন্দর প্রশ্ন করেছো মামণি। ঝুমঝুমি তো চেনো, তাই না? তোমাকে না তোমার মামা গতবার লালদীঘি মেলা থেকে লাল সবুজ রঙের ঝুমঝুমি কিনে দিয়েছে। এই ঝুমঝুমিটারই আরেক নাম লোলা। ঝুমঝুমিকে লোলাও বলা হয়। এটা অবশ্য আঞ্চলিক শব্দ। ছোটমণিদের আদর করার সময় ঝুমঝুমির পরিবর্তে এখনও অনেকেই ‘লোলা’ শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। আচ্ছা মামণি, তুমি নাগরদোলা চেনো? -মুমুর প্রতি এবার বাবার পাল্টা প্রশ্ন।
-বাবা যে কী বলো! তুমি দেখছি সব ভুলে যাও। মামাদের ‘কাপকো’র ফ্যামেলি ডে অনুষ্ঠানে নাগরদোলায় চড়েছি, বলেছি না? তুমি ভুলে গেলে? মামাইতো নাগরদোলায় চড়িয়েছে আমাকে। নাগরদোলায় চড়ার সময় আমার খুব ভয় করেছে বাবা। তবে নাগরদোলায় চড়তে খুব মজাও লেগেছে।
-ও, সে কথা তো আমার মনেই ছিল না। বাহ্‌। মা মণি নাগরদোলা তো তা হলে তুমি চেনো। নাগরদোলাতে চড়েছোও। ভেরি গুড মা মণি।
-বাবা মেলা থেকে এবার আমি টমটম গাড়ি কিনবো। -মুমু বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করে।
-ঠিক আছে মা মণি, তাই হবে। এবার বৈশাখী মেলায় আয়োজকরা দেশীয় ঐতিহ্য সম্ভারকে প্রাধান্য দিয়ে মেলা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন। আশা করছি, এখানে তোমার টমটমও পাওয়া যাবে। অবশ্যই সেখান থেকে তুমি কিনে নিও।
মুমু তেমনি বাবার গলা জড়িয়ে ধরেই খুশিতে সুরেলা কন্ঠে বলে ওঠে-
টমটম, ঢোল, রঙিন বাঁশি, গয়না-পুঁতির মালা,
মাটির হাঁড়ি, বাঁশের বাঁশি, খেলনা কুলা-ডালা—।