মুমুর বন্ধু প্রজাপতি

উৎপলকান্তি বড়ুয়া
cczcc1

দু’দিনেই মুমুর সাথে প্রজাপতির বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সে কী বন্ধুত্ব! দু’বেলা সময়মতো দেখা করা রুটিনেই পরিণত হয়ে গেছে যেনো। সকালে-বিকালে দু’জনে বাগানে গল্প করে প্রতিদিন। মুমু স্কুলে যায়। দুপুরে স্কুল থেকে এসে খেয়ে-দেয়ে মায়ের সাথে খানিকটা সময় ঘুমোয়। আজও ভোরে এবং বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বাগানে মুমু আর প্রজাপতি গল্প জুড়ে গত দু’দিনের মতো। অনেক গল্প, অনেক কথা, নানান কথা।
একসপ্তাহ আগে মুমুরা এই বাগান বাড়িতে এসেছে। মুমুর বাবা বদলি হয়ে এসেছে। এই এক বছরেই দ্বিতীয় শ্রেণির মুমুকে এই নিয়ে তিনবার স্কুল বদলাতে হলো। এসেই বাগানবাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় বাবা মুমুকে। তৃতীয়বারের মতো স্কুলে মুমু ভর্তি হলো গত দিনদিন আগে। বাবার অফিসের জিপগাড়ি করে স্কুলে যায়-আসে মুমু মা’র সাথে।

বিকেলে ঘুম থেকে উঠেই মুমু বাগানে চলে আসে। বাগান বাড়ি। সামনে পশ্চিম পাশে বিশাল এলাকা জুড়ে লোহার কাঁটা তারে ঘেরা। তাতে নানান ফুলের গাছে ভরা ফুলের বাগান। বাগানে হরেক রকমের প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। আশেপাশে নানান সবুজ গাছের ঘন সমারোহ। মুমুর বন্ধুপ্রজাপতিটা লাল-হলুদ-নীল মিশালো রঙের প্রজাপতি। দেখতে চমৎকার। অনেক প্রজাপতির ভিড়ে আলাদা করে চেনা যায়।
প্রজাপতিটা আগে থেকেই মুমুর জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে।
-দুপুরে এতো ঘুমোতে হয় বুঝি?
-কই, নাতো! প্রতিদিনের মতোই তো ঘুমালাম শুধু। বাম হাতের উল্টো পিঠে বাম চোখ মুছতে মুছতে বললো মুমু।
-আমি সেই কবে থেকে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।
-আমি তো গত দু’দিনের মতো একই সময়েই এলাম।
– তা তুমি এসেছো। তবে এতক্ষণ তোমার জন্যে অপেক্ষা করলে আমার যে দেরি হয়ে যায়।
-ওমা! তোমার আবার দেরি কিসের?
-আমার খেলার সাথী প্রজাপতিরা সবাই খেলছে। আমি শুধু তোমার জন্যে এলাম। তোমার সাথে দেখা না করে, কথা না বলে কী আমি খেলতে যেতে পারি?
-সবাই খেলছে খেলুক। আমরা কথা বলি।
-না মুমু। আমারও যে খেলতে হবে। কেনো মুুমু, তুমি কি খেলাধুলা করো না?
-না, তেমন খেলাধুলা আর কোথায় করতে পারি। আমি তো একা। একা একা পুতুল নিয়ে খেলি। পুতুল বিয়ে দিই। নিজে নিজে রান্নাবাটি খেলি। মা’তো ঘরের কাজ নিয়ে থাকে সারাদিন। প্রজাপতি, তুমিও কি সত্যি সত্যি খেলাধুলা করো? তোমরা প্রজাপতিরা সবাই কি খেলাধুলা করো?
-হ্যাঁ, আমরা সবাই খেলাধুলা করি তো! ওমা, খেলাধুলা ছাড়া শরীর, মন, স্বাস্থ্য কোনোটাই ভালো থাকে বুঝি!
-কিছুদিন আগে, আগের বাসার উঠোনে খেলতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আমার যে সে কী জ্বর!
-নিয়ম মেনে ভিজলে জ্বর হতো না। আমরা তো নিয়ম মেনে প্রতিদিন খেলাধুলা করে থাকি। নিয়ম ছাড়া আমরা কিছুই করি না। নিয়ম মেনে খেলাধুলা লেখাপড়া, চলা ফেরা ইত্যাদি করো, দেখবে কোনোই অসুবিধা হবে না কখনো।
-তোমরাও নিয়ম মেনে খেলাধুলা, চলা ফেরা,সব কিছু করো?
-হ্যাঁ, আমাদের সবকিছু নিয়মের মধ্যেই ।
-প্রজাপতি, তোমরা কি লেখাপড়া করো?
-হ্যাঁ,করি তো।
-তোমাদেরও কি স্কুল আছে?
-আছে তো। আমরাও যাই স্কুলে।
-কই, তোমাদের স্কুলতো কোনোদিন দেখিনি তো!
-আমাদের স্কুল সবাই, মানে মানুষেরা দেখতে পায় না।
-আমিও তোমাদের স্কুল দেখতে পাবো না?
-না। তুমিও দেখতে পাবে না। কারণ তুমিও তো মানুষ। আমাদের স্কুল শুধু আমরাই দেখতে পাই। আমি যতটুকু জানি, মানুষেরা আমাদের মতো সব কিছু দেখতে পায় না।
-মানুষেরা দেখতে পায় না কেনো?
-তোমরা মানুষেরা ততো ভালো নও। ঝগড়া করো। নিজেদের মধ্যে মারামারি করো। মানুষেরা একে অপরকে হিংসা করো বলে হয়তো, তোমরা সব কিছু দেখতে পাও না। তোমরা মানুষেরা হিংসা ভুলে, বিবাদ ভুলে, ঝগড়া ভুলে সুন্দর হলে, আমাদের মতো পবিত্র হতে পারো হয়তো। তখন আমরা প্রজাপতিদের মতো তোমাদের মানুষেরাও সব কিছু দেখতে পাবে। আমরা নিজেদের মধ্যে কোনোদিন ঝগড়া বা মারামারি হয়না। আমাদের মধ্যে কোনোই বিবাদ নেই। তাই সবাই, আমরা প্রজাপতিদেরকে অপূর্ব সুন্দর জাতি বলে গণ্য করে। আমরা সব সময় খুব সুন্দর, খুব পবিত্র।
মুমু আর কোনো কথা বলে না। তাকিয়ে থাকে প্রজাপতির দিকে। প্রজাপতির কথাগুলো অত্যন্ত মনযোগ সহকারে শোনে। প্রজাপতির সুন্দর ঝলমলে রঙিন ডানা, শিল্পীর হাতে গড়া যেনো প্রজাপতির শরীরের কারুকাজ। চোখ ফেরাতে পারে না মুুমু।
-আমি তাহলে এখন যাই। প্রজাপতির কথায় প্রজাপতির প্রতি মুমুর মুগ্ধতায় হঠাৎ ছেদ পড়ে।
-আচ্ছা প্রজাপতি, আমি কি তোমাদের মতো সুন্দর হতে পারি না?
-অবশ্যই পারো। একশ’বার পারো। হাজার বার পারো। তবে তোমাকে সুন্দর মনের হতে হবে। তোমাকে নিয়ম করে, খেলাধুলা, পড়ালেখা, চলা ফেরা, খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছু করতে হবে। দেখবে, তুমিও আমাদের প্রজাপতিদের মতো সুন্দর হবে।
-সত্যি বলছো প্রজাপতি?
-হ্যাঁ সত্যি ! আমরা তো মিথ্যাকথা বলি না। ঠিক আছে মুমু, আজ যাই। আমার যে বেশ দেরি হয়ে গেলো। কাল সকালে আবার কথা হবে-বলেই প্রজাপতি তার রঙিন দুই ডানা মেলে উড়াল দেয়। মুমু লাল-হলুদ-নীল মিশালো রঙের চমৎকার তার বন্ধুপ্রজাপতির উড়ে যাওয়া দিকে তাকিয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে।