মুক্তির মন্দির সোপানতলে জাগ্রত-৭১

আ.ফ.ম.মোদাচ্ছের আলী

১৯৭১ সালের ভয়াল ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমন করেছিলো। সেদিন বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সেই একই নির্দেশে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তদানিনত্মন পূর্ব পাকিসত্মানের বাঙালি পুলিশ বাহিনী। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনের বীর পুলিশেরা প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
‘৭০ এর নির্বাচনপূর্ব সময়ে মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্ত্রাসী বাহিনী চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে লুটপাট, অত্যাচার শুরম্ন
করলে চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার এস এ মাহমুদ ফজলুল কাদের চৌধুরীর পড়্গাবলম্বন করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন। তখন বঙ্গবন্ধু এসপি এম. শামসুল হককে মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট থেকে চট্টগ্রামে পদায়নের ব্যবস’া করেন। চট্টগ্রামের দায়িত্বভার গ্রহণ করার দুই দিন পরেই ১৯৭০ সালের ৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় অর্জনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৭১ সালের মার্চের শুরম্নতে সমগ্র বাংলাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও উত্তাল অসহযোগ আন্দোলন শুরম্ন হলে চট্টগ্রামে এসপি এম. শামসুল হক লালদীঘি পাড়ে নিজ দপ্তরে কন্ট্রোল রম্নম স’াপন করে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে শত্রম্ন বাহিনীর বিরম্নদ্ধে অবস’ান নিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে তখন অবাঙালি এবং বিহারীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরম্ন হয়। এই ঘটনায় শতাধিক বাঙালি নিহত এবং দু’শতাধিক লোক আহত অবস’ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। বিহারীদের সাথে ছদ্মবেশধারী সশস্ত্র ২০ বেলুচ রেজিমেন্টের সদস্যরা সাধারণ নাগরিকের পোশাকে অংশগ্রহণ করে বলে শোনা যায়। এসপি সামশুল হক ড়্গিপ্ত হয়ে সার্কিট হাউজে গিয়ে বাঙালি সামরিক প্রশাসক এসআর মজুমদারের সাথে আলোচনা করে ঘটনার সাথে জড়িত ১৪৫ জন অবাঙালিকে গ্রেফতার করেন।
২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে দ্রম্নত বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাবার্তা চট্টগ্রাম পৌঁছে। এসপি এম. শামসুল হক ওয়্যারলেসযোগে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারম্নজ্জামান চৌধুরীকে এবং টেলিফোনে রায়নগর থানার ওসি আব্দুল মান্নানকে মেসেজটি পাঠান। এসপি’র নির্দেশে ওসি মেসেজটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাবরম্নম থানার ওসি মি. মুখার্জীর হাতে বুঝিয়ে দেন এবং বাংলাদেশের সার্বিক পরিসি’তি বিবেচনায় মেসেজটি ত্রিপুরা, কোলকাতা হয়ে দিলস্নীতে পৌঁছানোর অনুরোধ জানান। ২৭ মার্চ পুলিশ সুপার ও অন্যান্য অফিসারদের সম্মিলিত আলোচনায় বাঙালি পুলিশ ফোর্সকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ইপিআর বাহিনীর সাথে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ এলাকায় প্রেরণের সিদ্ধানত্ম হয়। ২৮ মার্চ পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম দামপাড়া জেলা পুলিশ লাইন আক্রমণ করে। বীর পুলিশ সদস্যরা আধুনিক অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত পাকিসত্মানি হানাদার বাহিনীর সাথে মরণপন যুদ্ধ করে দেশের জন্য অকাতরে জীবন উৎসর্গ করেন। ৮১ জন পুলিশ সদস্য শহিদ হন। এ সময় ১ জন মেজরসহ ৭ জন পাকিসত্মানি সৈন্য নিহত হয়। ৭ এপ্রিল পাকবাহিনী তৎকালীন বিভাগীয় দুর্নীতি দমন অফিসার (পুলিশ সুপার) নজমুল হক পিপিএমকে হত্যা করে। ১৫ এপ্রিল হানাদার বাহিনী এসপি সামশুল হককে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সার্কিট হাউজে নিয়ে যান। ১৭ এপ্রিল পাকিসত্মানি সেনারা ইন্টারোগেশন সেলে ইলেট্রিক চেয়ারে বসিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে।
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়নত্মীর কাছাকাছি এসে সেই ৮১ জন শহিদ পুলিশ সদস্যের স্মৃতিকে চির অমস্নান করে রাখার জন্য চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা স্মৃতিস্মারক নির্মাণের পদড়্গেপ নেন অবশেষে। হালিশহর পুলিশ ব্যারাকের ডাব, পুকুরের মাছ বিক্রি করে, যা তাদের ভাষায় ‘বাগান তহবিল’ থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ৮১ জন বীর শহিদের নামে নির্মিত নান্দনিক ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ স্মৃতিস্মারক ‘জাগ্রত ৭১’ আজ দৃশ্যমান। নুরেআলম মিনার স্বীয় মন ও মনন থেকে উৎসারিত ধারণায় এ স্মৃতি স্মারক নির্মিত হয়েছে। সহায়তা নিয়েছেন স’পতি রম্নহেল আজিজের কাছ থেকে। ‘জাগ্রত ৭১’ ঘিরে টাইলস ম্যুরাল দিয়ে চিত্রিত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা ও স্বায়ত্তশাসন, শহিদ এসপি এম শামসুল হকের জীবনী, ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের দলিল। এই স্মৃতিস্মারকে দামপাড়া পুলিশ লাইনে ১৯৭১ সালে সম্মুখ যুদ্ধে শহিদ ৮১ জন পুলিশ সদস্যের নাম লেখা রয়েছে। যার নিচে লেখা ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’। নির্মাণ করা হয়েছে প্রশসত্ম বেদী। হালিশহর পুলিশ লাইনে যত ব্যারাক আছে সেই ব্যারাক এবং পুলিশ লাইনের অভ্যনত্মরে রাসত্মাগুলোর নামও এই ৮১ জন শহীদের নামে নামকরণ করা হবে বলে পুলিশ সুপার জানান। ১৬ ডিসেম্বর এই স্মৃতি স্মারক উদ্বোধন হবে।