মুক্তিযুদ্ধ ও মুকুলের গল্প

মোনোয়ার হোসেন

দেশের অবস’া ভালো না। থমথমে। পাকিসত্মানি মিলিটারিরা দেশে ঢুকে পড়েছে। মানুষজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে । ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করছে। তাদের আহাজরিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। মুকুল উদাস দৃষ্টিতে আখানগর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে তিল চিটচিটে হাফহাতা লাল শার্ট ও লুঙ্গি। পায়ে চটি। তেলাক্ত মুখ।  তেল চিটচিটে মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে স্টেশনের চারদিকে চোখ বুলালো সে । তিনি ছাড়া স্টেশনে আর কোনো বাঙালি যাত্রী নেই । মিলিটারিদের ভয়ে কেউ শহরে যাচ্ছে না । সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে । অন্যদিকে শহর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক গ্রামে আসছেন । আশ্রয় নিচ্ছেন । তাদের চোখেমুখে আতংক , ভয় । উৎকণ্ঠা । স্টেশনে কয়েকজন ভুঁড়িওয়ালা বিহারি যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরনে কাবলিওয়ালা পাঞ্জবি, পায়জামা। মাথায় পাগড়ি। হাসিখুশি মুখ।  তারা শহরে যাবে। মুকুলও যাবে শহরে। তার মা অসুস’ । অসুস’ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে সে । মুকুল স্টেশনে চোখ বুলাতে বুলাতে দেখলো পস্নাটফর্মের পুবদিক থেকে আমিনুল মাস্টার হেঁটে আসছেন । মুকুলকে দেখেই এগিয়ে এলেন তিনি । জিজ্ঞেস করলেন, কী রে মুকুল, এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?

শহরে যাবো স্যার।

এ্যাঁ! আমিনুল মাস্টারের চোখেমুখে ভয় আর আতংকের ছাপ ফুটে উঠলো। কেন? তুমি শহরে যাবে কেন?

মা অসুস’। মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবো।

এতড়্গণে আমিনুল মাস্টার লড়্গ্য করলেন মুকুলের পিছনে তার মা জবুথবু হয়ে বসে আছে। ভেঙে পড়া গাল, মুখ কুঁচকানো। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

চাচীর কী হয়েছে মুকুল?

কাল রাত থেকে প্রচ- পেটব্যথা ।

ওষুধ খেয়েছে?

জি।

পেট ব্যথা কমেনি?

নাহ, কমছে না। আনছারম্নল ডাক্তার দ্রম্নত শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললো।

কিন’ শহরে যাবে কীভাবে? শহরের অবস’া তো ভালো না। মিলিটারিরা শহরে ঢুকে পড়েছে। তারা লোকজনকে গুলি করে মারছে।

মরণকে ভয় পাইনা স্যার। তাছাড়া মাকে যদি বাঁচাতে না পারি, আমার বেঁচে থেকে কী হবে!

তারা গল্প করতে করতে পস্নাটফর্মে ট্রেন চলে এলো। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করে ট্রেনে উঠতে লাগল।

মুকুল তার মাকে নিয়ে ট্রেনে উঠলো। পিছন থেকে আমিনুল মাস্টার চিৎকার করে বললেন, দাঁড়াও মুকুল। দেশের এই অবস’ায় আমি তোমাকে একা শহরে যেতে দিতে পারি না। আমিও যাবো তোমার সাথে। চলো।

তারা ট্রেনে উঠল । দেখলো ট্রেনের প্রতিটি সিটে বিহারীরা পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। খোস গল্প করছে। ঠা ঠা করে হাসছে। হাসিতে তাদের শরীর কেঁপে উঠছে। বড় বড় ভুড়ি দুলে উঠছে।

আমিনুল মাস্টার একজন বিহারীর কাছে গেলেন। বিনয়ের সাথে বললেন, ভাই, পাদুটো একটু নামিয়ে বসুন , পিস্নজ। অসুস’ রোগী একটু বসুক।

বিহারী মুখ হা করে এমনভাবে আমিনুল মাস্টারের দিকে তাকালো, যেন আমিনুল মাস্টার ভিনগ্রহ থেকে নেমে আসা কোনো আজব প্রাণী। কয়েক সেকে- তাকিয়ে থেকে অবাক ভঙ্গিমায় বলল, এই বাঙাল, কি বললি?

আমিনুল মাস্টার সেই বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, পাদুটো যদি একটু সোজা করে বসতেন, তাহলে আমার এই রোগীটা একটু বসতে পারতো। খুব অসুস’। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

বিহারী আরো অবাক ভঙ্গিমায় বলল, আমার পাশে বসাবো এই নিচু জাতের বাঙালিকে!  এ্যাই বেটা , তোর বাড়ি কোথায়? আমার মুখে মুখে কথা বলার সাহস পাও কীভাবে ?

এটা আমার নাগরিক অধিকার। আপনি একজন নাগরিক হিসেবে দেশের যেসব সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন, আমিও পাওয়ার অধিকার রাখি।

একজন বিহারী ওপাশ থেকে বলল, বেটার মুখে বুলি ফুটেছে। নিশ্চয় শেখ মুজিবরের অনুসারী।  প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বেটাকে পাকড়াও করো। শহরে নিয়ে ক্যাম্পে তুলে দিতে হবে। কীভাবে তার এই বুলি বন্ধ করতে হয়, আমাদের মিলিটারিরা জানে।

তারা আমিনুল মাস্টারকে বেঁধে ফেললো। বেঁধে পায়ের কাছে ফেলে রাখলো। কেউ শরীরে থু থু দিতে লাগল। কেউ পানের পিক। কেউ বুট দিয়ে লাথি মারতে লাগল। আমিনুল মাস্টারকে এত অপমান করতে দেখে  সহ্য করতে পারলেন না মুকুলের মা। তিনি মাথা চক্কর দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন । মুকুল ট্রেন থেকে নেমে মাকে নিয়ে সদর হাসপাতালে গেল। ডাক্তার বললেন, সরি, এই রোগী আর বেঁচে নেই। প্রচ- শক পেয়ে স্ট্রোক করেছেন ।

মুকুল চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে উঠলো। মায়ের হাত ছুঁয়ে বলল,  তুমি চিনত্মা করো না মা, যারা আমিনুল স্যারকে অপমান করেছে, আমি তাদেরকে ছাড়বো না। তাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাসিত্ম দেব। তোমার এই সোনার বাংলা দেশকে স্বাধীন করবো । পাক হায়েনা  মুক্ত করবো । মুকুল ত্যাগী হয়ে উঠলো। গ্রামে ফিরে যোগ দিল মুক্তিযুদ্ধে । ভারতে গেল। ট্রেনিং নিলো। হাতে অস্ত্র নিলো। দেশে ফিরে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে। তার বুকে ধিকিধিকি জ্বলে ওঠা আগুন ফুলকি হয়ে বেরম্নলো তার বন্দুকের নলা দিয়ে। দাউ দাউ করে পুড়িয়ে  মারতে লাগল একের পর এক পাকসেনাদের। তার মতো ত্যাগী বীরদের সামনে দাঁড়াতেই পারলো না পাকসেনারা। তারা পিছু হটলো । আত্মসমর্পণ করল। মাত্র নয়মাসে আমাদের সাহসী মহান মুক্তিযোদ্ধারা আমাদেরকে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিল। আমরা পেলাম লাল-সবুজ পতাকা।