মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস : স্মৃতি ও চেতনা

আহমেদ মাওলা

মুক্তিযুদ্ধ, নিছক কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধের নেপথ্যে আছে আরো অনেক অনুষঙ্গ। তেইশ বছরের শোষণ, নির্যাতন, একযুগব্যাপী সামরিক শাসন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসকে তাই কেবল স্বাধীনতা প্রাপ্তির উল্লাস হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। উপনিবেশের বিরোধিতা,বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ও পোস্টকলোনিয়াল দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। উপন্যাস লিখতে বসে আমাদের ঔপন্যাসিকরা ওইসব বিষয়গুলোর কথা ভেবেছেন বলে মনে হয় না। এখানে সবাই প্রলম্বিত ঘটনাকে উপন্যাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যদিও আধুনিক উপন্যাস কেবল ঘটনা প্রধান নয়, এমন কি চরিত্র নির্ভরও নয় কেবল। উপন্যাস আসলে বহুস্তরীভূত এক শিল্পকলা। যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনকে স্পর্শ করা, জীবনকে অনুসন্ধান করা। অর্থহীন মানব জীবনকে তাৎপর্যময় করে তোলাই উপন্যাসের প্রধান উদ্দেশ্য। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রচনা করতে বসে আমাদের ঔপন্যাসিকরা তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। ১. ইতিহাস, ২. বাস্তবতা ৩. বাঙালির সংগ্রামী গৌরব ও হানাদার বাহিনীর নির্মমতা। ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে রচিত উপন্যাসগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, নবীন প্রবীণ সব ঔপন্যাসিকরাই ঘটনা ও কাহিনি নির্মাণে বাস্তবতাকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। অনেকেই এমনও করেছেন যে সত্য ঘটনা নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। কেউবা ইতিহাসের সত্য অবিকল রাখতে গিয়ে উপন্যাসের মহৎ সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছেন। অথচ কে না জানেন, সত্য ঘটনাকে অনুসরণ করতে গেলে উপন্যাসকে সধর্মচ্যুত হতে হয়। উপন্যাসের কাহিনি সত্য ও বাস্তব হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ঔপন্যাসিক কল্পনা দিয়ে, ভাষা ও বর্ণনার মাধ্যমে এমনভাবে কাহিনি নির্মাণ ও ঘটনা বিন্যাস করবেন, যা পড়ে, পাঠকের মনে হবে সত্যের অধিক সত্য, বাস্তবের চেয়ে বেশি বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে পাঠকের কাছে। ঔপন্যাসিকের প্রতিভা ও মৌলিকত্বের পরিচয় পাওয়া যায় কাহিনি ও চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা নির্মাণের মধ্যেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের মধ্যে সেই প্রতিভার খোঁজ পাওয়া দুষ্কর। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭১) রচনা করেন শহীদ আনোয়ার পাশা। প্রায় একই সময়ে (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়) শওকত ওসমান রচনা করেন ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ (১৯৭১)।
শওকত আলীর ‘যাত্রা’ (১৯৭৬)-এ তিন উপন্যাসের কাহিনি ও চরিত্রের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদীপ্ত শাহীন অনেকটা আনোয়ার পাশারই প্রতিমূর্তি। শওকত ওসমানের ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসের প্রৌঢ় শিক্ষক গাজী রহমান শওকত ওসমানের যেন আরেকটি প্রতিচ্ছবি। শওকত আলীর ‘যাত্রা’ উপন্যাসের অধ্যাপক রায়হান যেন তাঁরই আত্মচরিত্রের প্রক্ষিপ্ত রূপ। তিনজন ঔপন্যাসিকই ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এই তিনটি উপন্যাসের কাহিনিতে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের বাস্তবতা, হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, অত্যাচার, নির্যাতনের বর্ণনা ও বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। শত্রুকবলিত স্বদেশ ছেড়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র নিরাপদ অঞ্চলের দিকে চলে যাচ্ছে। যাওয়ার পথে নানা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। দগ্ধ গ্রাম, লুণ্ঠন, হত্যা, আহত মুক্তিযোদ্ধা দেখে এমনকি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার আহ্বান এলেও মধ্যবিত্তসুলভ আত্মরক্ষার মানসিকতার কারণে তারা প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেয় না। যদিও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের রয়েছে অসীম পক্ষপাত এবং মনে প্রাণে স্বাধীনতাকামী হলেও কেউ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। এটাই হয়তো তৎকালীন বাস্তবতা ছিলো কিন্তু আমাদের ঔপন্যাসিকরা কেন সেই বাস্তবতার মধ্যে আবদ্ধ থাকবেন? তাদের কল্পনা এতো সীমাবদ্ধ হবে আমরা বিশ্বাস করি না। ঔপন্যাসিক নিজেই বর্ণনা ও বিবরণ দিয়ে একটা অধিবাস্তবতা তৈরি করবেন। সেই বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা, যা ঘটে-তা নয়। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’, ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ এবং ‘যাত্রা’ উপন্যাসের মধ্যে সেই শৈল্পিক বাস্তবতার অভাব রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে ‘শওকত ওসমানের দুই সৈনিক (১৯৭৩) নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩) জলাংগী (১৯৭৪) সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন (১৯৮১) নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮২) সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) যুদ্ধ (২০০৫) রশীদ হায়দারের অন্ধ কথামালা (১৯৮৬) খাঁচায় (১৯৭৫) আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় (১৯৮৬) মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ (১৯৭৬) নিরাপদ তন্দ্রা (১৯৮২) রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য্য (১৯৭৬) মেঘের পরে মেঘ। হানিফের ঘোড়া (১৯৮৬) হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (১৯৭৮) নির্বাসন (১৯৮২) ১৯৭১ (১৯৮৬) সূর্যের দিন (১৯৮৭) আগুনের পরশমণি (১৯৮৮) অনিল বাগচীর একদিন (১৯৮৬) জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৫) ইমদাদুল হক মিলনের ‘মহাযুদ্ধ’ (১৯৭৭) নিরাপত্তা হই (১৯৭৮) ঘেরাও (১৯৮৬) বালকের অভিমান (১৯৮৪) কালো ঘোড়া (১৯৯২) দ্বিতীয় পর্বের শুরু (১৯৮৮) রাজাকার তন্ত্র (১৯৯৩) সাড়ে তিন হাত ভূমি (২০১৪) মঈনুল আহসান সাবেরের ‘পাথর সময়’ (১৯৮৬) সতের বছর পর (১৯৮৯) কবেজ লেঠেল (১৯৯২) শহীদুল জাইরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮) আনিসুল হকের ‘মা’ (২০০২) শাহীন আক্তারের ‘তালাশ’ (২০০৫) তাহমিনা আনামের এ গোল্ডেন এজ (২০০৭) হরিপদ দত্তের ‘ঈষাণে অগ্নিদাহ’ (১৯৮৬) অন্ধকূপে জন্মোৎসব (২০০৭) আল মাহমুদের ‘উপমহাদেশ’ (১৯৯৩) ইত্যাদি।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উল্লিখিত উপন্যাসগুলো মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে বুঝতে পারি, আমাদের ঔপন্যাসিকরা যেন মুক্তিযুদ্ধের মৌল প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেননি। রাইফেল রোটি আওরাত এবং জাহান্নাম হইতে বিদায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লেখা। অন্য উপন্যাসগুলো স্বাধীনতা পরবর্তীতে লেখা। ফলত সবটাই যেন পেছন ফিরে দেখা। এসব উপন্যাসে হানাদার বাহিনীর অত্যচার, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, নির্যাতনের দৃশ্য অংকন করতে আমাদের ঔপন্যাসিকরা যেন অধিক তৎপর। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ বাঙালির যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, দেশমাতৃকাকে বাঁচাতে আবালবৃদ্ধ বনিতার আত্মবিসর্জন, তাদের সংগ্রাম ও সাহসিকতার গৌরবময় দৃশ্য মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে ব্যাপকভাবে রূপায়িত হতে দেখা যায়নি। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসে পাকিস্তানি মেজর কর্তৃক ধরে আনা এক হিন্দু তরুণীকে ধর্ষণের একটি চিত্র –
হিন্দু মেয়েদের গায়ে নাকি কটু গন্ধ?
তাদের জায়গাটা পরিষ্কার?
নীরবতা।
শুনেছি মাদি কুকুরের মতো,সত্যি?
নীরবতা।
শুনেছি হয়ে যাবার পর সহজে বের করে নেয়া যায় না?
নীরবতা।
আমাকে কতক্ষণ ধরে রাখতে পারবে?
বিলকিস প্রদীপের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মেজরের দিকে তাকায়।
কতটা লিবিডো তাড়িত ছিলেন লেখক, তা এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়। পাকিস্তানি মেজর ধর্ষণ করেছিলেন বাস্তবে, ঔপন্যাসিক কলম দিয়ে সে কাজটি করেছেন কল্পনায়। ঔপন্যাসিক হয়ত হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের দৃশ্যকে অবতারণা করেছেন। কিন্তু এ ধরনের বিবরণ পড়ে পাঠকের মনে হানাদার বাহিনী প্রতি কোনো ঘৃণা জন্মে না বরং ঔপন্যাসিকের প্রতি করুণা উদ্রেক করে। মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাসে ধারণ করে আছে স্বাধীনতাপূর্ব যন্ত্রণা ও মধ্যবিত্ত মানসের মেরুদণ্ডহীন সুবিধাবাদের কথা, মাহমুদুল হকের শাণিত সংলাপের মধ্যে সুবিধাবাদের মুখোশ উন্মোচিত হয় এভাবে খোকা ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে, অর্থনৈতিক মুক্তি টুক্তি ওসব হাফসোল দেওয়া কথা, বার্ণিশ করা কথা, যে যার স্বার্থের কথা ভেবে পাগল হয়ে উঠেছে। সবাই ভাবছে স্বাধীন হলে যারযার নিজের হাতে চাঁদ পাবে।
দেশ স্বাধীন হয় কিন্তু স্বার্থের বেড়াজাল থেকে আমাদের রাজনীতি মুক্তি পায় না। ফলে স্বাধীনতা – উত্তরকালে স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও হতাশা, ক্ষোভের জন্ম নেয়। ইমদাদুল হক মিলনের ‘কালো ঘোড়া’ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন এক নির্মম বাস্তবতা। বাজারে চা দোকানে কাজ করে নয়ন। চেয়ারম্যান সাব বাজখাঁই গলায় বলেন, নামোর পো, খোকারা কই ক?
কোন খোকা?
এ্যাই খানকির পোলা, তুমি জাননা, না?
হাচা কইতাছি, আমি কিছু জানিনা। এবার কথা বলে বারিক্কা, দফদারের পোলা খোকা। লগে মন্না, কাদের আর আলমরা আছে। হেরা মুক্তিবাহিনীতে গেছিল। ফিরা আইছে। বাজারের মাইনসে কয়, হেরা তর লগে থাকে।
মিচা কথা। আমি হেগো কোনদিন দেহি নাই। চেয়ারম্যান সাব খুব রেগে যান, ঐ আফাইজ্জা পিডা হালারে … চেয়ারম্যান সাব আবার বলেন, লাশটা আমার চৌকির নিচে হান্দাইয়া থো। রাইতে দুজনে গিয়া বিলের বাড়ির ডেঙ্গায় হালাইয়া দিবি।
বস্তুত এই হচ্ছে একাত্তরের গ্রামবাংলার অহরহ দৃশ্যাবলি। এই আত্মত্যাগ আমাদের দেশকে দ্রুত স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়। ‘১৯৭১’ উপন্যাসের হুমায়ূন আহমেদ তুলে ধরেছেন বাঙালির সাহস আর বীরত্বের কথা। নীলগঞ্জ গ্রামে ঢুকে হানাদার বাহিনী মসজিদের ইমাম ও স্কুলের হেড মাস্টার আজিজ মাস্টারকে ধরে নিয়ে নির্মম অত্যাচার চালায়। গ্রামের রফিক মিলিটারিদের পক্ষেই কাজ করছিল। মেজর এজাজ একসময় বুঝতে পারলো রফিক আসলে মুক্তিযোদ্ধা রফিককে বুক পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলির নির্দেশ দিচ্ছে। পাড়ে বসে থাকা মেজর সাহেব বললেন, কার সঙ্গে কথা বলছ রফিক?
নিজের সঙ্গে
কি বলছ নিজেকে?
সাহস দিচ্ছি। আমি মানুষটা ভীতু।
এখানে হুমায়ূন আহমেদ দেখাতে চেয়েছেন, স্বাধীনতার জন্য বাঙালি কিভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিভাবে সাহস সঞ্চয় করেছে। আত্মত্যাগের চরম মুহূর্তে স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে হুমায়ূন আহমেদ উদ্ভাসিত করেছেন কয়েকটি সংলাপে-
ছোট খাট অসহায় একটা মানুষ। বুক পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। মেজর সাহেব বললেন, রফিক তুমি কি বেঁচে থাকতে চাও? রফিক শান্তস্বরে বলে, চাই মেজর সাহেব। সবাই বেঁচে থাকতে চায়। আপনিও চান। চান না?
মেজর সাহেব চুপ করে রইলেন। রফিক তীক্ষ্ণস্বরে বলল, মেজর সাহেব আমার কিন্তু মনে হয় না, আপনি জীবিত দেশে ফিরে যেতে পারবেন। কৈবর্তপাড়ায় আগুনের দিকে তাকিয়ে মেজর সাহেব আমার কিন্তু মনে হয় না, আপনি জীবিত দেশে ফিরে যেতে পারবেন। কৈবর্তপাড়ায় আগুনের দিকে তাকিয়ে মেজর পশতুভাষায় কি যেন বললেন, গুলির নির্দেশ হয়ত। রফিক বুঝতে পারল না।
হ্যাঁ, গুলির নির্দেশই হবে। সৈন্য দুটি বন্দুক তুলছে। রফিক অপেক্ষা করতে লাগল। বুক পর্যন্ত পানিতে গা ডুবিয়ে লালচে আগুনের আঁচে যে রফিক দাঁড়িয়ে আছে, মেজর এজাজ তাকে চিনতে পারল না। এ অন্য রফিক।
সরল ভাষা ও গল্প বলার অসাধারণ কুশলতার কারণে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে ভিন্নমাত্রা যোগ করতে পেরেছেন।
মঞ্জু সরকারের প্রতিমা উপাখ্যান (১৯৯০) উপন্যাসের কাহিনি স্বাধীনতা উত্তর সময়ের। সংখ্যালঘু, ধর্ম, রাজনীতির মনস্তত্ত্ব উঠে আসে এ উপন্যাসে। উপন্যাসের পরিণতিতে দেখা যায় রণজিত ভিটেমাটি ছেড়ে দেশ থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়। তবু রণজিতের জিজ্ঞাসা থেকে যায় –
দেশটা কেবল মুসলমান হাজীর বাপের সম্পত্তি?
হামরা যুদ্ধ করি স্বাধীন করি নাই দেশ?
সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের সময় শুধু নয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পরও বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে অনেক হিন্দুকে নির্যাতিত হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে যেতে হয়েছে। সমাজ ও রাজনীতির এ বাস্তবতাকে সার্থক শিল্পরূপ দিয়েছেন মঞ্জু সরকার তাঁর প্রতিমা উপাখ্যান উপন্যাসে। শহিদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮) স্বাধীনতা উত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির উত্থান ও রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। রাজাকার আলবদরের নারকীয় হত্যাকাণ্ড, বদু মাওলানাদের পৈশাচিক কর্মের কথা কি ভোলা যায়? এ উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই আব্দুল মজিদের কাছে সমকালীন সমাজের বাস্তবতা অসহ্য হয়ে ওঠে। আব্দুল মজিদ কিছুতেই বদু মাওলানার ছেলে আবুল খায়েরের রাজনীতিতে ফিরে আসা মেনে নিতে পারে না। আব্দুল মজিদ তাই মহল্লা ত্যাগ করে। মঈনুল আহসান সাবেরের ‘পাথর সময়’ (১৯৮৬) সেই বাস্তবতা আরো গভীর ভাবে ফুটে ওঠে ইফতি চরিত্রের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসের এই বাস্তবতা পাঠককে মুহূর্তে নিয়ে যায় একাত্তরের দিনগুলোতে।

আপনার মন্তব্য লিখুন