মুক্তিযুদ্ধকে জানি, বিজয়ের সাথে থাকি, পথ হারাবে না বাংলাদেশ

ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।
বাংলাদেশের পঞ্চকবি খ্যাত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কবিতার দুটি চরণ দিয়ে শুরু করলাম। রূপে অপরূপ ষড় ঋতুর এদেশ। প্রকৃতি, গান ও কবিতায় জননী জন্মভূমি সকল দেশের সেরা। তখনো জাতীয় স্বাধীনতার বিষয়টি বাঙালির কাছে প্রতিভাত হয়নি। এমনকি পরাধীন ভারতে রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ হয় ১৯৪১ সালে এবং নজরুল বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালে। কিন্তু বিশ্বকবি ও বিদ্রোহী কবির অজস্র গান, কবিতা ও লেখনিতে স্বাধীনতার কথা উঠে এসেছে। শত সহস্র বছরের সোনার দেশ, গানের দেশ, রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় কবির যোগ্যতম উত্তরাধিকার রাজনীতির কবি, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জন করে বাঙালি তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় লাল সবুজের পতাকার দেশ বাংলাদেশ।
বাঙালির ইতিহাসে স্বাধীনতার দিনটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর বহু জাতি গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য দিক থাকে, আছে গৌরব অহংকারের বিষয়, থাকে স্মরণীয় দিন। এ ক্ষেত্রে বাঙালির গৌরব ও অহংকারের পাল্লা ভারী। বাঙালির আছে একাধারে স্বাধীনতা দিবস (২৬ মার্চ), বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর), আছে ২১ ফেব্রুয়ারি (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস)। স্বাধীনতা বাঙালির অস্তিত্ব ও ঠিকানা, স্বাধীনতা আবেগ ও শ্লাঘার নাম। বাঙালির স্বাধীনতা ইতিহাসের এক মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের মহানায়কের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান।
আমাদের স্বাধীনতার আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। স্বাধীনতার মহাকাব্যিক ইতিহাসের চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন তিতুমীর, শরীয়ত উল্লাহ, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন, প্রীতিলতা প্রমূখ বিপ্লবী ও সংগ্রামী নেতারা। শত বছরের জাতীয় সংগ্রামে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, একে ফজলুল হক, নেতাজি সুভাষ বসু, সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী এবং ভাষা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখ। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ও রাজনৈতিক কবি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান।
ইতিহাসের মহাকাব্যে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কিছু নায়ক, অভিনেতা কিন্তুু চূড়ান্তভাবে আবির্ভূত হয়েছেন ইতিহাসের মহানায়ক হিমালয়সম শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বলেছেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু মানুষের হিমালয়কে দেখলাম।’
বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন সে কাঙ্ক্ষিত বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। এই দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিল এবং দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটেছিল। মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম ও শুভ বুদ্ধির কাছে পরাভূত হয় দানব। আরও একবার বিশ্ব দেখলো সঠিক নেতৃত্ব কিভাবে গণমানুষের হৃদয়ের কথা বুঝতে পেরে একটি জাতি, একটি দেশকে স্বাধীনতার বন্দরে নিয়ে যেতে পারে।
যে দেশে বঙ্গবন্ধুর মত নেতা থাকে, যে দেশের জন্য ত্রিশ লক্ষ শহীদ অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিতে পারে কিংবা দুই লক্ষের অধিক কন্যা, জায়া, জননী সম্ভ্রম হারাতে পারে সে দেশ পথ হারাতে পারে না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির কপালে কালিমা লেপন করা হয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালির প্রাণের মানুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর দেশ যাত্রা করে উল্টো পথে। কিছু মানুষের আত্মত্যাগ আবার জাতির সামনে আশার আলো জাগায়। এর ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেন, ডা. মিলন জীবন উৎসর্গ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বাংলাদেশের যে উল্টো যাত্রা শুরু হয়, তার ফলে দেশ এক অন্ধকারের দিকে যাত্রা করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরে দেশ পুনরায় বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে পথচলা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু তনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাঙালির অর্জনও কম নয়। বিশ্বে বাঙালি জাতি আজ মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগী, নির্যাতিত উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। যোগ্যতা ও সততায় বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরীর হাত ধরে যে দেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সে দেশ কখনো পথ হারাবে না।

লেখক: ডিন কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ