মিলিটারি

বিপুল বড়ুয়া

সন্ধ্যা নেমেছে সেই কবে। বাইরে হিমেল হাওয়া। শীত কুয়াশা বেশ জেঁকে বসেছে চারপাশে।
বাবা এখনো শহর হতে ফেরেনি। মার চোখে মুখে ভারি উৎকণ্ঠা। কোনো বিপদ হলো না তো অভির বাবার।
গাঁয়ে কারো মনে দু’দণ্ড সুখ নেই। যুদ্ধ তো লেগেই গেছে-স্বাধীনতার যুদ্ধ। এ বাড়ি সে বাড়ি বেশ শুনছে যুদ্ধের কথা অভির মা। অভির বাবারও একই কথা।
দিন কাল ভালো ঠেকছে না অভির মা।
মুক্তিবাহিনীও ঠিক ঠিক মাঠে নেমে গেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বেশ টের পাচ্ছে মুক্তিবাহিনীও যে ছেড়ে কথা বলছে না। ‘দেখো- অভির মা বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই সহসা। দেখো, পাকিস্তানি মিলিটারিরা ঠিকই লেজ গুটিয়ে পালাবে….।’
‘কিন’ শুনি যে পাকিস্তানি মিলিটারিরা বেশ নামডাকের। ওদের কেমন করে রুখবে মুক্তিবাহিনীর ছোট ছোট ছেলেপিলেরা। তাদের হাতে অস্ত্র নেই- যুদ্ধের ট্রেনিং নেই। তারা কী করে পাল্লা দেবে হায়েনা মিলিটারির সাথে?’
‘ দেখবে- অভির মা সব দেখবে। ঠিকই জিতবে আমাদের সোনার ছেলেরা। ওরা তো দেশের মান বাঁচাতে- বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষা করতে যুদ্ধে নেমেছে- ন্যায়ের যুদ্ধে। ওদের জয় হবেই।’
‘কিন’ পাকিস্তানি মিলিটারিরা- ওরাও কি ছেড়ে দেবে মাঠ? ওরা মরণ কামড় দেবে না?’
এবার এতো দুঃসময়েও হা হা করে হাসে অভির বাবা। অভি এবার আস্তে আস্তে বাবার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। বাবার খোলামেলা হাসিতে বেশ খুশি হয় অভি তার চোখ মুখ ঝলমলে হয়ে ওঠে।
বাবা কী এমন খবর এনেছে যে হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানি মিলিটারিদের। কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না তাদের। তাদের নিয়ে কি সবাই শুধু শুধু গপপো করে? তারা এমন-তেমন। তারা সেরা সৈন্য। তাদের সাথে কেউ পেরে উঠে না। তারা ভয়ংকর- ভয়ানক। হার না মানা যোদ্ধা।
‘শুনো শুনো পাকিস্তানি মিলিটারিরা বুদ্দু ভুতুম। বোকা-হাঁদারাম। নয়ও বোঝে না- ছয়ও বোঝে না।’
অভি হা হা করে উঠে। ‘তা কেমন বাবা।’
‘শোনো অভি- ওরা এক্কেবারে হাবাগোবা। বুঝলে শহরে অফিস ফেরতা লোকজনকে বলে- ডান্ডি কার্ড হ্যায়- ডান্ডি কার্ড। নেকলাও নেকলাও, জলদি জলদি…।’
‘ডান্ডি কার্ড কি বাবা। এ ধরনের কোনো কার্ডের নাম তো শুনিনি।’
‘শুনবে কোত্থেকে অভি। এ নামের কার্ড থাকলেই তো শুনবে। ওরা জানতে চায় অফিসের আইডেন্টিটি কার্ড, সঙ্গে আছে কিনা। আর চেয়ে বসে ডান্ডি কার্ড আছে কিনা।
অভি বাবাকে কী বলবে- না হাসবে। তাইতো, বেটারা তো হদ্দ বোকা- কোথায় চাইবে আইডেন্টিটি কার্ড- তা বলে- ডান্ডি কার্ড। যতো সব উল্টোপাল্টা কাণ্ড। বোকা আর কাকে বলে।
অভি বাবার এসব কথা শুনে বেশ মজা পায়। তা বাপুরা এতো নাম ধাম জাহির করো তো- ভেতরে ভেতরে সব ফুলটুস- ভিতুর ডিম।
অভির বাবা এবার বেশ জাকিয়ে গপ্পো করে পাকিস্তানি মিলিটারিদের।
‘জানো ওরা কতো ভিতু। ওরা এখানে ওখানে ক্যাম্প করেছে- এদিক সেদিক টহল দিছে- চোখ মুখ কালো করে জিপে বসে। কিন’ মজার ব্যাপার জানো- সন্ধ্যা হলেই সে যে, সুড়-ৎ করে ক্যাম্পে ঢুকে পড়ে- সারা রাত আর বেরই হয় না।’
‘কোথাও একটা পটকার আওয়াজ শুনলেই দুদ্দার করে অসি’র হয়ে গুলি ছোড়ে- ভয়ে আধমরা হয়ে যায়।’
‘ভারি তো মজার ব্যাপার বাবা। কোথায় তারা জবর মিলিটারি- রাস্তায় বেরোবে এটা সেটা শুনলে তা না করে ক্যাম্পে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকবে- আর বেহুদা গুলি ছুড়ে বোঝাবে আমরা এক নম্বর মিলিটারি। এরা আমাদের সাহসী মুক্তিবাহিনীর সাথে কী যুদ্ধ করবে বাবা…।’
‘তা বাবা, ওরা এদিক সেদিক কেমন করে যায়? ওরা তো পথ ঘাট চিনে না।’
‘তা বলছো ঠিক ওরা পথ ঘাট চেনে না। কিন’ ব্যাপার হলো- আমাদের কিছু লোক রাজাকার-আলবদর বাহিনীতে যোগ দিয়ে শান্তি কমিটির সদস্য হয়ে মিলিটারিদের এদিক সেদিক নিয়ে যায়- উসকে দিয়ে যতো সব ঝুট ঝামেলা বাধায়।’
‘আহারে পাকিস্তানি মিলিটারি- ওদের কী সাহসের বহর-বুদ্ধির বহর। একা বেরোয় না- রাতে বেরোয় না। অভি বলে। ‘ওরা কেমন ভয়কাতুরে জানিস অভি।’ অভি ঘাপটি মেরে বসে। ওরা পানিকে যা ভয় পায়। ওরা পারতপক্ষে নৌকায় কোথাও যেতে চায় না। ওরা নাকি সাঁতারও জানে না। এই যে যুদ্ধ চলছে- কোথাও কোথাও নৌকায় যেতে নৌকা ডুবে অনেক মোছুয়া পাকিস্তানি সৈন্য ডুবে মারাও গেছে। বোঝো ব্যাপারটা- ওরা কী বীর মিলিটারি।’
‘আর কী যুদ্ধ করা ওদের। এ গ্রাম সে গ্রামে সাত পাহারা নিয়ে গেলো। তা কি করে? লোকজনের ঘর-দোর জ্বালিয়ে দেয়- গরু ছাগল- হাঁস মুরগি ধরে ক্যাম্পে নিয়ে এসে রান্না করে খায়- এ হলো কি না পাকিস্তানি মিলিটারি…।
অভি চুপচাপ শুনে যায়- পাকিস্তানি মিলিটারিদের বোকামি ভিমড়ি খেয়ে চলাফেরার কথা সঙ্গে বাঙালিদের প্রতি অত্যাচার-নির্যাতনের কথা। অভি ঘাটকূলের কলঘরে হাটের বসু ডাক্তারের খোলা বারান্দায় অনেক অনেক শুনেছে পাকিস্তানি মিলিটারির নানা অপকর্ম নৃশংসতার কথা। ওরা কী অন্যায়ভাবে বাঙালিদের নির্যাতন-নিপীড়ন করে চলেছে- বাংলাদেশের মাটির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। জবরদখলের খেলায় মেতেছে।
মিলিটারির অতসব মজাদার কথা ভাবতে ভাবতে ঝিম মেরে বসে থাকে অভি। মা বারান্দায় চুপচাপ পায়চারি করছে। অভি ভাবছে বাবা এখনো এলো না। মার মুখ থমথমে আঁধার।
হঠাৎ বাবার অভিকে ডাকার শব্দ শুনে খুশিতে মন ভরে যায় অভির। বাবা ফিরেছে ভালোয় ভালোয়। অভি ছুটে যায় বাইরে-মাও উঠোনে নেমে আসে। বুকের ওপর হতে যেনো পাথর চাপা সরে যায় মার। অভির বাবা ঠিকঠাক মতো বাড়ি ফিরেছে।
রাতে খেয়ে দেয়ে জমিয়ে গল্প হয় তিনজনের।
বাবা-মা-অভি। টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় অভি শোনে বাবার শহরের গল্প। মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিবাহিনীর কথা-কাহিনি।
বাবা অনুচ্চ কণ্ঠে বলে- ‘শহরে চারদিকে চাপা আতঙ্ক। লোকজন নানা শঙ্কা উৎকণ্ঠা নিয়ে রাস্তায় চলাচল করছে- কাজ সারছে অফিস যাচ্ছে। সবাই আছে দৌড়ের মধ্যে। ছুটছে আর ছুটছে।’
কোথায় কোথায় যেনো ককটেল ফুটছে। সব্বার সে কি দৌড়। পর পর এসে পড়ছে জিপভর্তি মিলিটারি। একে ধরছে-জিপে তুলে নিচ্ছে। ওকে লাঠিপেটা করছে। গেরিলা মুক্তিরা ততক্ষণে পগার পার। এ অবস’া শহরের।
মিলিটারিদের অবস’া লেজেগোবরে। হালে পানি কোত্থেকে পায় বেটারা- বাবা বেশ রসিয়ে রসিয়ে গল্প করে মিলিটারিদের।
‘ছুচোঁমুখো মিলিটারি। মাথায় লোহার টুপি। দেখো না দাড়ি গোঁফের কী বিতিকিচ্ছি বাহার। বুকে-পিঠে কতো বাকস-বুকস। কাঁধে ঝোলানো ভারী অস্ত্র। মাথায় সূচালো বেয়োনেট বসানো। বাব্বা- কী সাজ সজ্জা বেটাদের। দেখলে রাগে পিত্তি জ্বলে যায়। মাথায় আগুন ধরে যায়।
‘ইচ্ছে হয় ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিন্নভিন্ন করে দিই হায়েনা পাকিস্তানি মিলিটারিদের। বাংলার দুশমনদের।’
মিলিটারিদের নিয়ে বাবার রাগ ক্ষোভের অতসব শুনতে শুনতে- অভিও যেনো আর ছোট্ট অভি থাকে না। তার ইচ্ছের চারপাশে যেনো হাজারো ডালপালা-শাখা মেলতে থাকে। যেনো এক ভীষণ রকম দায়বোধ কাঁধে চেপে বসে অভির। সরল সিধে অভিকে যেনো এক দুর্দান্ত ইস্পাত কঠোর অভিতে পরিণত করে।
তখন অস্ত্র-সঙ্গীন হাতে ভয়ংকর অথচ বোকাসোকা পাকিস্তানি মিলিটারিরা যেনো অভির হাতের পুতুল হয়ে যায়। অভির মতো আরো অনেক অনেক অভির কাছে নস্যি হয়ে যায় মিলিটারিদের তর্জন-গর্জন। অভিরা যেনো ভারী মোছওয়ালা পাকিস্তানি মিলিটারিদের নিয়ে দারুণ ছেলেখেলা করে, নাকানি-চুবানি খাওয়ায় গ্রামবাংলার পুকুর-জলে-খালে, জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে খালি হাতে তাড়িয়ে ফেরে সোনার বাংলা হতে। সে কোন সিন্ধু পাড়ে।
বাবা-মা দেখে সে আর এক অভিকে। যে অভির বুকের ভেতর স্বাধীনতার মধুর স্বপ্নের আলপনা আর পাকিস্তানি হায়েনা বোকাসোকা মিলিটারিদের প্রতি নিদারুণ ঘৃণা।