মিরার রংবাক্স

আব্দুস সালাম
Untitled-1

মিরার আব্বু আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন। তার আম্মু খাওয়ার টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখেন। আব্বু ফ্রেস হয়ে সবাইকে নিয়ে খেতে বসলেন। মিরা খেতে খেতে আব্বুর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করছে। সারাদিন সে কী কী করেছে তা আব্বুকে একে একে শোনাচ্ছে। বাবা স্কুলের পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সে বলে,
জানো আব্বু আমাদের ড্রয়িং স্যার না খুব কড়া? আজ আমাদের বলেছেন, আগামী ক্লাসে ড্রয়িং পরীক্ষা নেব। যে ঠিকমতো ছবি আঁকতে পারবে না তার খবর আছে! তার পিঠে দুমা দুম বেত পড়বে। আমার না খুব ভয় হচ্ছে! ‘সেকি! তুমি ভয় পাচ্ছো কেন?
আমি তো ভালো ছবি আঁকতে পারি না, তাই। তাছাড়া আমার তো রংপেন্সিলগুলো খুব ছোট হয়ে গেছে। ওগুলো দিয়ে ঠিকমতো রং করা যায় না। বাবা হাসতে হাসে বলেন,
ও নিয়ে ভেবো না। আগামীকাল তোমার জন্য নতুন একটা রংবাক্স কিনে দেব।
বাবার কথা শুনে মিরা খুশি হয়। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সে দাঁতব্রাস করতে যায়। তারপর স্কুলের পড়া তৈরি করে ঘুমাতে যায়। পরেরদিন বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিউমার্কেট থেকে মিরার জন্য একটা সুন্দর রংবাক্স কিনে আনেন। বাক্সে ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন রঙের রংপেন্সিল রয়েছে। রংবাক্স পেয়ে মিরার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং খাতা বের করে ছবি আঁকতে বসে যায়। সে পাখির ছবি, দেশের ছবি ও গ্রামের দৃশ্য আঁকতে থাকে। আর তাতে সুন্দর সুন্দর রং করে। দু’দিন পরে তার ড্রয়িং পরীক্ষা হবে। তাই সে ভালোভাবে অনুশীলন করতে থাকে।
ড্রয়িং পরীক্ষার দিন স্কুলে যাওয়ার সময় মিরা রংবাক্সটি অতিযত্নে তার স্কুলব্যাগের মধ্যে রেখে দেয়। তৃতীয় ক্লাসে তার ড্রয়িং পরীক্ষা হবে। যথাসময়ে ড্রয়িং স্যার ক্লাসে এলেন। তিনি ক্লাসে এসে ছাত্র-ছাত্রীদের একটা গ্রামের দৃশ্য আঁকতে বললেন। মিরা গ্রামের দৃশ্য আঁকার কথা শুনে খুশি হয়। কারণ সে ভালো একটি গ্রামের দৃশ্য আঁকতে পারে। সকলে ড্রয়িং খাতায় রংপেন্সিল দিয়ে দৃশ্য আঁকতে শুরু করে। আর মিরা ব্যাগের মধ্যে হতে ড্রয়িং খাতা বের করল ঠিকই কিন্তু রংবাক্সটি খুঁজে পেল না। সে নিশ্চিত যে কোন দুষ্টু সহপাঠী তার রংবাক্সটি চুরি করেছে। সে জানে না কে এই কাজটি করেছে। বক্সটি কোথাও খুঁজে না পেয়ে সে মনের দুঃখে কাঁদতে থাকে। ড্রয়িং স্যার মিরার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সে সব ঘটনা খুলে বলে। এসব শুনে স্যার ভীষণ রেগে যান। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
মিরার রংবক্সটি কে নিয়েছে? যে নিয়েছ সে শীঘ্রই ওকে ফেরত দিয়ে দাও।
কিন্তু স্যারের কথায় কেউ গুরুত্বই দিল না। আবার রংবক্স চুরি করার কথাও কেউ স্বীকার করল না। সবাই চুপ করে বসে থাকল। কিছুক্ষণ পর স্যার আবার বলল,
এখনও সময় আছে রংবক্সটি বের করে দাও বলছি। ধরা পড়লে কিন্তু পিটুনি খেতে হবে।
কোন কথায় কাজ হলো না দেখে স্যার বললেন,
এখন সবার ব্যাগ চেক করা হবে। যার ব্যাগ থেকে রংবক্সটি পাওয়া যাবে তাকে এই কঞ্চির বেত দিয়ে পেটানো হবে। এখন সবাই চোখ বন্ধ করে হেডডাউন করে বসে থাকো।
স্যার লক্ষ করলেন, সায়েম পিছনের বেঞ্চে মন খারাপ করে বসে আছে। স্যার বুঝতে পারলো দুষ্টু সায়েমই ওই রংবক্সটি লুকিয়ে রেখেছে। এর আগেও সে অন্যের ব্যাগ থেকে কলম, খাতা ও রাবার লুকিয়ে রেখে পরে ধরা পড়েছে। স্যার কাছে গিয়ে দেখে ওর কপোল বেয়ে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি ওর ব্যাগের চেইন খুলে দেখে দুটি রংবাক্স। নতুন রংবাক্সটি হাতে নিয়ে তিনি সোজা ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু স্যার ওকে কিছু বললেন না। ছাত্র-ছাত্রীরা স্যারের কথামতো তখনও হেডডাউন করে বসে ছিল। স্যার সকলকে চোখ খুলে মাথা তুলতে বলেন। তারা চোখ খুলে দেখে স্যারের হাতে একটা রংবাক্স। কিন্তু কেউ জানে না এটি কার ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সায়েমের বুকটা তখনও ভয়ে কাঁপছিল। সে ভাবছিল, স্যার হয়তো এবার তাকে বেত দিয়ে পেটাবেন।
স্যার মিরাকে রংবাক্সটি দেখিয়ে বলল, দেখ তো মিরা এ বক্সটি তোমার কিনা?
হ্যাঁ স্যার, ওটিই আমার বক্স।
মিরা উত্তর দেয়। তিনি রংবক্সটি সামনে ধরে বলেন, নাও।
তারপর স্যার বলেন, যে অপরাধ করেছে এবার তার শাস্তি দেওয়ার পালা। তবে তাকে শাস্তি দেওয়ার আগে একটা সুযোগ দিতে চাই। সে যদি মিরার কাছে অপরাধ স্বীকার করে সরি বলে আর ভবিষ্যতে যদি এরকম কাজ না করে তাহলে সে মাফ পেয়ে যাবে। তবে তাকে আগামী ড্রয়িং ক্লাসের আগে মিরাকে সরি বলতে হবে। নইলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি পেতে হবে।
এ কথা শুনে একজন স্যারকে জিজ্ঞাসা করল, স্যার, মিরার রংবাক্সটি কে চুরি করেছে?
না। তার নামটা এখন বলা যাবে না। সে সরি না বললে তখন বলব। তোমরা এখন মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকো।
পরেরদিন সায়েম দেখে মিরা একা একা বসে আছে। এই সুযোগে সে মিরাকে বলে, সরি মিরা। সেদিন তোমার রংবাক্সটি আমিই নিয়েছিলাম। তুমি কিছু মনে করো না। আমি আর কোনদিন দুষ্টুমি করব না। স্যার যদি কিছু জিজ্ঞাসা করে তাহলে বলবে, আমি সরি বলেছি। ঠিক আছে বলব। মিরা উত্তর দেয়।
সায়েম সরি বলাতে মিরা তার প্রতি খুশি হয়। তার মনে আর রাগ থাকে না। এসব কথা স্যার জানার পর তিনিও সায়েমের প্রতি খুশি হন। ওই ঘটনার পর থেকে সায়েম আর কখনও ক্লাসে দুষ্টুমি করত না।