উর্বরতা হারাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকার জমি

মিরসরাইয়ে টপ সয়েলে তৈরি হচ্ছে ইট

রাজু কুমার দে, মিরসরাই

গত ২৮ জানুয়ারি আইন শৃঙ্খলা বৈঠকে স’ানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসনের কঠোর নির্দেশ উপেক্ষা করে মিরসরাইয়ে ফসলি জমির টপসয়েল যাচ্ছে ইট ভাটায়। এতে করে ফসল উৎপাদন চরম ভাবে ব্যাহত হতে পারে। এক জমি থেকে মাটি নিতে ক্ষতি হচ্ছে আশপাশে আরো একাধিক জমি। উপজেলার ইটভাটাগুলোতে বনের গাছ, পাহাড়ের মাটির পর এবার যাচ্ছে কৃষি জমির মাটিসহ টপসয়েল (জমির উপরিভাগের মাটি)। এর আগে পাহাড়ি মাটি দিয়ে ইট তৈরির কাজ চলতো। এ মৌসুমে প্রায় চার কোটি ইট তৈরিতে ব্যবহৃত মাটির চাহিদা মেটাতে আবাদি জমিতে হাত দিয়েছে ইটভাটা কর্তৃপক্ষ। তবে মিরসরাইয়ের প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর আবাদি জমির কি পরিমাণ টপসয়েল ইটভাটায় যাচ্ছে এর কোন হিসেব নেই কৃষি অফিসে।
ইটভাটার প্রয়োজনে টপসয়েল বিকিকিনি প্রসঙ্গে কৃষি বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মদ জানান, গত ২৮ জানুয়ারি আইন শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে এবিষয়ে স’ানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের উপসি’তিতে আলোচনা হয়েছে। তিনি কঠোরভাবে জমির টপসয়েলসহ আবাদি অনাবাদি জমির মাটি বিক্রি রোধে ব্যবস’া নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। সরেজমিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তারাকাটিয়া এলাকার গিয়ে দেখা যায়, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই বিল থেকে প্রতিদিন ২৫-৩০টি পিক আপ দিনরাত মাটি নিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে একই ইউনিয়নের গড়িইয়াশ এলাকার প্রিয়া অটো ব্রিক ফিল্ডে। ওই মাটি ইটভাটায় নিতে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে কৃষকের জমি, সুফিয়া সড়ক ও গড়িয়াইশ সড়ক।
স’ানীয় ওয়াজিউল্যা, কামাল উদ্দিন জানান, মাসুমের বিল থেকে পিকআপ দিয়ে মাটি নিয়ে গিয়ে প্রায় তিন’শ একর ফসলি জমি নষ্ট করে ফেলছে। পিকআপের চাকায় জমির মাটি দেবে যাওয়ার কারণে ওই সব জমিতে আর ভালো ফসল হবে না। যারা মাটি নিচ্ছে তাদের বাধা দিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। তারা শুধু রাস্তার জন্য ফসলি জমি নষ্ট করছে না সরকারি সড়কের পাশ কেটেও নষ্ট করছে। মাসুমের বিল থেকে গড়িয়াইশ এলাকায় প্রিয়া অটো ব্রিক্স যেতে দেখা গেছে, গড়িয়াইশ সড়কটির (ব্রিক ফিল্ড সড়ক) প্রায় দুই কিলোমিটার শুধু বালুর রাজ্য। মাটির ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মিরসরাই সদর ইউনিয়ন ছাড়াও করেরহাট, দূর্গাপুর, জোরারগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, সামান্য অর্থের লোভে একরের পর একর জমির উপরি ভাগের মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন জমির মালিকরা। মিরসরাইয়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, বর্তমানে উপজেলার সর্বত্র আবাদি জমিগুলো থেকে টপসয়েল কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে পরবর্তী মৌসুমে টপসয়েলবিহীন জমিতে ফসল উৎপাদনে চরম বিপাকে পড়বে কৃষকরা। আবাদি জমির মাটি বিক্রি বন্ধ করতে কঠোর আইন করে ব্যবস’া নেয়া না হলে এটি রোধ করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। মিরসরাই ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম খোকা জানান, উপজেলার ১৪ টি ইটভাটায় প্রতি মৌসুমে গড়ে চার কোটি ইট উৎপাদন হয়। প্রতি ২৫ ঘন ফুট মাটি দিয়ে তৈরি হয় একটি ইট। বর্তমান সময়ে মিরসরাইয়ের ইটভাটাগুলোতে কৃষি জমিতে পুকুর কেটে মাটির জোগান দেয়া হচ্ছে। জমির টপসয়েল খুব বেশি যাচ্ছে না বলে দাবি করেন। মিরসরাইয়ের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বুলবুল আহম্মদ জানান, দরিদ্র কৃষকদের অসচেতনতা আর দরিদ্রতাকে পুঁজি করে টপসয়েল কিনে নেয় ইটভাটা মালিক ও মাটি বিক্রির সাথে জড়িত সিন্ডিকেটরা। তিনি আরো জানান, টপসয়েলের ৯ ইঞ্চি থেকে এক ফুট পর্যন্ত খাদ্যকণা থাকে। টপসয়েল কেটে ফেলার কারণে ফসল তার খাদ্য খুঁজে পায় না। সে কারণে ওই সব জমিতে ভালো ফলন হয় না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, স’ানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসনের কঠোর নির্দেশ কোন কৃষি জমি কাটা যাবে না। জমির টপসয়েল কাটার অপরাধে সম্প্রতি একজনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমরা অভিযান অব্যাহত রাখব। এব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।