মিঠু তুমি স্বাধীনতা

রমজান আলী মামুন

এক.
বাবা অফিস থেকে এসেই সাফারীর বোতাম খুলতে খুলতে বললেন-
: দিপু আর স্কুলে যাবে না। মা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন-
: সেকি, দিপু স্কুলে যাবে না কেনো? বাবা তেমনিভাবে উত্তর দিলেন
: দেশের অবস্থা ভালো নয়। যে কোন দিন পাক আর্মিরা নিরস্ত্র বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় দিপুকে একা স্কুলে যেতে দেই কি করে? মা নীচু স্বরে বললেন-
: মিজানেরা কেনো যে এতো আন্দোলন-সংগ্রাম করছে ছাইপাশ কিছুই বুঝি না বাপু। কুমিরের সাথে বাস করে কি লড়াই করা যায়? বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন-
: এখন তো দেখছি তাই-ই হবে।
আব্বু-আম্মুর কথার খেই আমি ধরতে পারি না। আমি মায়ের কাছে গিয়ে বললাম-
: আম্মু, আমি স্কুলে যাবো, তুমি বুবানিকে রিক্সা আনতে বলো।
মা বললেন-
: না-তুমি স্কুলে যাবে না।
আমি মরিয়া হয়ে বললাম-
:আমি যে রেডি হয়ে গেছি মা।
মা হঠাৎ রেগে যান-
: আহা-মুখের উপর তর্ক করে না।
আম্মু হঠাৎ রেগে গেলেই মুশকিল। তখন তাঁর সাথে আর কথা বলা যাবে না। সে মুহূর্তে বেছে বেছে শুধু কঠিন শব্দগুলো আওড়াবেন। সেবার টিভিতে একটা ভালো প্রোগ্রাম ছিলো। আমাদের বাসায় তখন টিভি নেই। ছিলো টিভির একটা বাচ্চা অর্থাৎ রেডিও। যেটিতে বাবা কান লাগিয়ে খুব ভোরে অথবা রাতে খবর শুনতেন। আমাদের উপর তলায় অপুরা থাকে। অপু আমার ক্লাসফ্রেন্ড। সন্ধ্যায় চৌকাঠ ডিঙিয়ে যেই না সিঁড়িতে পা রাখবো অমনি পেছন থেকে চড়া গলায় মা ডাক দেন
: দিপু, অপুদের বাসায় মেহমান, তুমি আজ টিভি দেখতে যাবে না। আমার বুকটা খস খস করে ওঠে। আজকের অনুষ্ঠানটা মিস করবো! হঠাৎ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে
: আম্মু আজকে টিভিতে না একটা সুন্দর…। মা আমার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন
: আহা ডেঁপোমি করে না।
তো আমি সেদিন মাকে ফাঁকি দিয়েই টিভি দেখতে চলে যাই। অনুষ্ঠান দেখে বাসায় আসতেই মায়ের গলা শুনতে পাই। মা বাবাকে বলছেন
: ও রকম ডেঁপো ছেলে নিয়ে আর পারি না বাপু। তুমি ওকে হোস্টেলে রেখে পড়ার ব্যবস্থা করো।
আম্মুর নির্মম আদেশ শুনে আমার বুকটা তড়াক করে ওঠে। আমি বাবার দিকে করুণ চোখে চেয়ে থাকি। বাবা আমাকে ইশারায় ডাক দেন। আমি সুবোধ ছেলের মতো বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। বাবা নরম গলায় বললেন
: তোমার আম্মুর অবাধ্য হলে আমাকে কিন্তু তাই করতে হবে।
দুই.
পরদিন থেকে আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। হোমটাস্কের ঝামেলা নেই। গৃহ শিক্ষকের চোখ রাঙানি নেই। শুধু বসে বসে খাই আর ধুমসে ঘুমাই। মাঝে মধ্যে ছড়া-কবিতার বই আর রূপকথার ডালি নিয়ে বসি। কিন্তু তবুও চার দেয়ালে আটকা পড়ে কাহাতক এসব আর ভালো লাগে। আগে প্রায়ই মিজান কাকা আসতেন। সদা প্রাণবন্ত মিজান কাকা এলেই আমার কি যে ভালো লাগতো। হৈ-হুল্লোড়, লুডু, কেরাম খেলে ছুটির দিনটা যে কোন দিকে গড়িয়ে যেতো টেরই পেতাম না। মিজান কাকা ভার্সিটিতে লেখাপড়া করেন। থাকেন হোস্টেলেই। কি একটা রাজনৈতিক দল করেন। মিজান কাকা যেদিন বাসায় আসতেন, সেদিন সারাটা বাসা মাথায় তুলে ছাড়তেন। মিজান কাকা খানিক বক্তৃতা, খানিক আবৃত্তি, যুক্তি-তর্ক দিয়ে এমন ফাইট দিতেন যে আব্বু-আম্মু হাঁপিয়ে ওঠতেন। মা বলতেন, তোকে নিয়ে আর পারি না বাপু। কেমন করে যে এতো বক বক করতে পারিস।
মিজান কাকাকে আমার কিন্তু খুব ভালোই লাগে। কতো বার যে আমাকে ভার্সিটিতে নিয়ে গিয়ে টিএসসির সড়ক দ্বীপ, আর্টস ফ্যাকাল্টি, লাইব্রেরি, মধুর কেন্টিনে ঘুরিয়েছে তার কোন হিসেব নেই। একবার মিজান কাকারা ক্যাম্পাস থেকে মিছিল করে ছুটছে। সেই মিছিলের অগ্রভাগে দেখি মেয়েরাও। ঝাঁঝালো রোদ মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সবাই একটা সুন্দর খোলা মাঠে এসে জমায়েত হলো। কিছুক্ষণ পর মিজান কাকা চুপি চুপি আমার কাছে এসে বললেন-
: এই মাঠটার নাম কি জানিস? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম: জানি না। মিজান কাকা তখন কানের কছে মুখ এনে বললেন: রমনার বটমূল। পত্রিকায় পড়িস নি? তারপর দেখি মিজান কাকা, মিজান কাকার বন্ধু আবেদ কাকা, অজয় কাকা ও সাহানা আন্টিদের সে কি জ্বালাময়ী বক্তৃতা। মিজান কাকা যখন বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন তখন মুহু মুহু করতালিতে সারাটা মাঠ যেনো মুখর হয়ে উঠলো। আমি তন্ময় হয়ে শুনলাম পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বঞ্চনার ইতিহাস। এদেশের জনগণের ন্যায্য দাবিকে কিভাবে পাশ কাটিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীরা ফায়দা লুটছে তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণও টেনে আনলেন মিজান কাকা। সভা শেষ হতে না হতেই কোত্থেকে এক দঙ্গল পুলিশ এসে লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়ে সভাটিকে পণ্ড করে দেয়। অতর্কিত এই হামলায় আমি খুব ঘাবড়ে যাই। চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরছে। কে যে আমাকে কাঁধে করে বাসায় নিয়ে এসেছে আমি তা জানি না। গভীর রাতে একটু স্বাভাবিক হলে মা বলেন, মিজানের বন্ধু বিজু তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। আমার আহত হওয়ার ঘটনায় বাবা মায়ের উপর খুব রাগ করলেন। যার নিজের জীবনের প্রতি কোনো মায়া নেই সেই মিজান কাকার সাথে আমাকে কেনো যেতে দেয়া হলো। আসলে মায়ের কোন দোষ নেই। আমি নিজেই কাকার পিছু নিয়েছিলাম। মা সত্য কথাটি চেপে যান। বাবা অজানা আশঙ্কায় সে রাত নির্ঘুম কাটালেন।