মিঠু তুমি স্বাধীনতা

রমজান আলী মামুন

পরদিন মাকে মুক্ত মঞ্চে কাকার বক্তৃতা দেয়ার কথা বলতেই মা বললেন : জানো না তোমার কাকা একজন বড় লিডার। তখন লিডারের বাংলা অর্থ আমার অজানা। তাই মায়ের কথায় আমি একবারে চুপসে যাই। মিজান কাকা তাহলে লিডার! শুধু একথাটি ভাবতেই গর্বে আমার বুকটা ফুলে উঠতো। সেই মিজান কাকা বলতে গেলে বাসায় আসা একেবারে ছেড়ে দিয়েছেন।
তিন.
কাকার কাছে শুনেছি আমরা পূর্ব পাকিস্তানিরা ধনে সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা নানা অজুহাতে আমাদেরকে দাবিয়ে রাখছে। পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত সম্পদ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ভোগ করতে না দিয়ে তারা তা দুই হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছে। একবার তো তারা উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে পূর্ব পাকিস্তানের চার কোটি জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকায় দেয়া এই ঘোষণার সাথে সাথেই বাঙালিরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে সারা বাংলায় আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠলো। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়েছিল। সেই মিছিলে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক পাকিস্তানি শোষকদের লেলিয়ে দেয়া পুলিশের গুলিতে হাসতে হাসতে প্রাণ দিয়েছিল। আন্দোলনের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে বাধ্য করেছিল।
চার.
আমরা তখন থাকি ঢাকার আজিমপুরে। আমাদের বাসায় বুয়ার কাজ করতেন কুসুমের মা। আমি তাকে ডাকতাম বুবানি বলে। বাসায় মাকে রান্না-বান্নার কাজে সাহায্য করতো বুবানি। মাঝে মধ্যে কাছের বাজার থেকে টুকটাক সওদাপাতিও এনে দিতেন। বুবানি থাকলেই মা যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। যেদিন বুবানি অনুপস্থিত থাকতেন সেদিন মায়ের কি যে কষ্ট হতো। একা একা তার কাজ যেনো এগুতো না। আফসোস করে বলতেন আহা আমার যদি একটি মেয়ে থাকতো। তাহলে সে-ই আমাকে সাহায্য করতে পারতো। মায়ের দীর্ঘশ্বাস আমাকে নিদারুণ মনকষ্ট দিতো। ভাবতাম আহারে আমার একটি ফুটফুটে বোন হলো না কেনো। যে মাকে সাহায্য করতে পারতো আবার আমার খেলার সাথীও হতো। আমি আগ বাড়িয়ে মাকে সাহায্য করতে চাইলে মা মৃদু হেসে ধমক লাগিয়ে বলতেন: তুমি যাও, এগুলো মেয়েদের কাজ। কাজে আবার ভাগ আছে নাকি! এই বৈষম্য আমাকে পীড়া দিতো। একদিন বাজার থেকে ফিরেই কুসুমের মা কাঁপতে কাঁপতে চোখ কপালে তুলে বললেন: বুবু, আমি আর বাজারে যেতে পারবো না। মা চিন্তিত হয়ে বললেন: সে কি কথা, তুমি বাজারে যাবে না কেনো কুসুমের মা? কুসুমের মা ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন: বাজারে মিলিটারি বুবু। বড় রাস্তায়ও দেখলাম মিলিটারির গাড়ি ঘোরাঘুরি করতেছে। আমার জন্মেও এতো মিলিটারি দেখিনি বুবু। ভয়ে মানুষজন যেদিকে পারে ছুটে যাচ্ছে। বাজারের এক দোকানি বললো, আমাদের দেশে নাকি যুদ্ধ বেধে যাবে। বুবু আমার যা না ভয় লাগতেছে। আপনি দিপু আর দিপুর আব্বাকে বাইরে যেতে দেবেন না। বুবানির কথায় মাকে একটু চিন্তিত মনে হলো। তিনি কুসুমের মাকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে টেলিফোনের কাছে গেলেন।
পাঁচ.
মা, বাবার অফিসে বার কয়েক ডায়েল করেও বাবাকে পেলেন না। তার দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেলো। সন্ধ্যার দিকে বাবা বাসায় ফিরেন। তাঁর চোখে মুখে যেনো দুর্ভাবনার কালো ছায়া। তিনি কাপড় চোপড় না খুলেই বারান্দায় ইজি চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লেন। মা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে গেলেন। নীচু স্বরে বললেন: তোমার কী হয়েছে? হাত মুখ ধুয়ে বসো, আমি চা বানিয়ে দেই।
বাবা তেমনি চুপচাপ বসে আছেন। মা আবার বলেন-
:তোমাকে অফিসে ফোন করে পাইনি যে। বাবা নিরাসক্ত উত্তর দেন: ফোনের লাইন ঠিক থাকলেই তো পাবে। ওরা বাঙালিদের সন্দেহ করতে শুরু করেছে। তাই ফোনের লাইনটি কেটে দিয়েছে।
বাবা একটি প্রাইভেট ফার্মে উচ্চ পদে আছেন। মালিক অবাঙালি হলেও বাবাকে খুব পছন্দ করেন। বাবা ধরা গলায় বলেন: জানো দিপুর মা ওরা বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসনভার তুলে দেবে না। বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিয়েছেন তিনি ছয় দফার কথা বলে জনগণের ভোট পেয়েছেন অতএব ছয় দফার ভিত্তিতেই দেশ শাসিত হবে।
তিন মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা। কিন্তু ওরা রেডিওতে ঘোষণা দিয়ে এ অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। এ খবরে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, দোকান-পাট সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নেমে এসেছে। পুরো ঢাকা শহর মিছিলের নগরী হয়ে গেছে। মানুষের মুখে শুধু একটি কথা, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’
মা বলেন: এতো সাংঘাতিক কথা। এখন ঢাকা শহরে থাকা তো নিরাপদ নয় দিপুর বাবা। বাবা বলেন, তাইতো ভাবছি। কি যে করবো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। শেখ সাহেব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সেই সাথে সারা দেশে পাঁচ দিনের হরতাল। তিনি পাকিস্তান সরকারকে কোনভাবে সাহায্য না করার জন্যে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মুখের একটি কথায় সারা পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে গেলো। অবস্থা বেগতিক দেখে কারফিউ দেয়া হলো। মিজান কাকারা সেই কারফিউ ভেঙে পথে নেমে এলেন। চারদিকে মিছিল, শ্লোগান আর বিক্ষোভ। সেনাবাহিনীর গুলিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। তারপরেও কেউ পথ থেকে এক বিন্দুও সরে দাঁড়ালো না।

ছয়.
ঢাকা শহরের অবস্থা থমথমে। পরদিন কারফিউ একটু শিথিল হতেই ভোরে দরজায় ঠক ঠক কড়া নাড়ার শব্দ হলো। বাবা দরজা খুলতেই বুবানি বাবার পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো এবং অঝোর ধারায় কেঁদে কেটে বললো: আমার স্বামীকে একটু খুঁজে দিন। কাল রিক্সা নিয়ে বেরিয়েছিলো, আজ পর্যন্ত ঘরমুখো হয়নি সে। কুসুম তার বাবার জন্যে একটি দানা পানিও মুখে দেয়নি। বাবা বললেন: তুমি একটু ধৈর্য্য ধরো, আমি দেখছি।
বাবা ইকবাল হলে ফোন লাগালেন মিজান কাকার উদ্দেশ্যে। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করছে না। বাবা তার বন্ধু ইকরামকে ফোন করলেন। ইকরাম আংকেল জানালেন গতকাল নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়ও আক্রমণ হয়েছে। মিলিটারির গুলিতে অনেক নিরহ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। বাবার কপালে চিন্তার বলিরেখা-হোস্টেল ছেড়ে মিজান এখন গেলো কই?
মিজান কাকাকে বাবা অত্যধিক স্নেহ করেন-ভালবাসেন। কিন্তু সেই ভালবাসা বাবা খুব একটা প্রকাশ করেন না। শুধু মাকে বকেন এই বলে, মা নাকি লাই দিয়ে দিয়ে কাকাকে মাথায় তুলেছেন। দাদা মারা যাবার পর এত্তোটুকুন মিজান কাকাকে দাদিমা মা ও বাবার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, তোরা আমার মিজানকে সন্তানের মতো দেখবি। সেই থেকে বাবা-মা মিজান কাকাকে পরম মমতায় আগলে আছেন। গ্রামের স্কুলে ম্যাট্রিক পাশ করার সাথে সাথেই মিজান কাকাকে ঢাকায় এনে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন বাবা। সেই মিজান কাকা এখন টগবগে যুবক। দাদিমা থাকেন মেজ কাকার সাথেই। মেজ কাকা গ্রামে কৃষি কাজ করেন। তাঁর আছে অঢেল কৃষি জমি। মেজ কাকার এক ছেলে এক মেয়ে। নাম মিঠু ও ফুলি। ছুটি-ছাটায়, ঈদ-পার্বনে গ্রামের বাড়ি গেলেই যেনো মহা উৎসব শুরু হয়ে যায়। দাদিমা ভালোমন্দ পিঠাপুলি খাইয়ে পারলে আমাকে বুকে গুঁজে রাখেন।
বাবার পাতে রুই মাছের মাথা তুলে দিয়ে বলেন, আমাদের পুকুরের মাছ। খোকা তুই খা, আমি একটু দেখি। অনেক দিন তোকে খেতে দেখি না। দাদির কাণ্ড দেখে মা মুখ টিপে টিপে হাসেন। গতবার গ্রীষ্মের বন্ধেও দাদা বাড়ি গিয়েছিলাম। দুপুরের দিকে ফুলি আমার হাতে গাছের পেয়ারা তুলে দিয়ে দেয় হেচকা টান। বলে, দাদিমার আদরের নাতি চলেন একটু ঘুরে আসি।
মিঠু আমার সমবয়সী হলেও ফুলি আমার এক বছরের ছোট। তাই খোঁচা দিয়ে কথা বলায় আমার একটু রাগ হলো। আমি গো ধরে বসে আছি। দাদিমা বললেন, তোর ছোট বোন না যা না একটু ঘুরে আয়। অনিচ্ছা সত্বেও ফুলির সাথে আমি বাইরে আসলাম। গ্রামের আলপথ ধরে হেঁটে একটু এগুতেই মিঠুর সাথে দেখা। ঝাঁঝালো রোদ মাথায় নিয়ে দু’একজন বন্ধুর সাথে মার্বেল খেলছে মিঠু। আমাকে দেখেই কাছে আসলো। ফুলিকে জিজ্ঞেস করলো দিপুকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস।
ফুলি বললো আমাদের বাগান বাড়িতে। মিঠু একটু হাসলো তারপর আমাকে বললো, একটু সাবধানে থাকিস। আমি বললাম: কেনো কেনো। মিঠু মুখটা আমার কানের কাছে এনে বললো, ফুলি কিন্তু বজ্জাতের হাড্ডি। শুনে আমার মুখটা আমসত্ব হয়ে গেলো। ফুলির সাথে হাঁটায় পা আর এগুতে চায় না। কিন্তু পাশে আমার প্রেষ্টিজ পাংসার হয় সে কারণে মুখ খুলে কিছু বলি না।
সাত.
ফুলির সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে দু’একবার হোছট খেলাম আমি। তা দেখে মুখে কিছু না বলে মুখ টিপে হাসলো ফুলি। কিছুদূর গিয়েই নাদুস নুদুস এই আমি হাফিয়ে উঠলাম। কপাল থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। পা’টা আর চলছে না বলে দুম করে ধান ক্ষেতের উপর বসে ফুলিকে বললাম, আর কতদূর যেতে হবে? ফুলি তার উত্তর না দিয়ে বাঁকা করে বললো: দিপু-ভাইয়া হাঁটার অভ্যাস নেই বুঝি!
এই পিচ্চিটা বলে কী। আমি বুঝি একদম হাঁটি না। আমার মেজাজ চড়ে যায়। তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আমি আবার হাঁটা শুরু করি। পেছন থেকে ফুলি বার কয়েক ডাক দেয়।
বলে, দিপু ভাইয়া বাগান বাড়ি ফেলে যাচ্ছো তো! আমি আবার ঘুরে এসে ফুলির পিছু পিছু বাগানে ঢুকে পড়ি। ভেতরে ঢুকেই আমারতো আক্কেল গুড়ুম। শহরের বাগানের সাথে গ্রামের বাগানের দেখি আকাশ-পাতাল ব্যবধান। শহরের বাগানগুলো হয় সাধারণত ফুল গাছ দিয়ে সাজানো। বাগানের পরিসরও হয় খুব ছোট। আর গ্রামের এই বাগানটা দেখছি গাছ গাছালিতে ঠাসা। যেদিকে দু’চোখ যায় বিশাল এলাকা জুড়ে শুধু গাছ আর গাছ। ঝরে পড়া মচমচে পাতাগুলোয় শব্দ তুলে একটু সামনে এগুলেই শান বাঁধানো পুকুরঘাট চোখে পড়ে। আমরা ঘাটলায় এসে চোখে মুখে পানি দেই। আমাদের দেখে বাগানের কেয়ারটেকার আবুল মিয়া দৌঁড়ে আসে। বলে ফুলি মা এই রোদে এলে কেনো, বিকেলে আসলেই তো পারতে। ফুলি বলে আবুল আংকেল, দিপু ভাইয়া রোদে ঘুরতে চেয়েছে যে। তাইতো দাদি মা আমার সাথে পাঠালেন। ফুলির ডাহা মিথ্যা কথায় আমার চোখ কপালে উঠে গেলো। আবুল আংকেল বললেন, ঠিক আছে তোমরা ঘাটলায় বসো, আমি তোমাদের জন্যে ডাব নিয়ে আসি। আমি মনে মনে পণ করলাম এই মিথ্যাবাদীর সাথে আর কোন কথা নয়।
আবুল আংকেল দ্রুত ফিরে মুখ কাটা দুটি কচি ডাব আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন দেখি, তোমার চাচী রান্নার কী করছে। ফুলি মা-আজ কিন্তু তোমরা খেয়ে যাবে। পানির বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছিলো আমার। ডাব পাওয়া মাত্র নিমিষেই তা সাবাড় করে দিয়েছি। ফুলির দিকে চোখ পড়তেই দেখি ঘাটলায় হোচট খেয়ে পুকুরে পড়ে ভাইয়া বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। কিন্তু আমি কেমন করে তাকে বাঁচাবো! আমি যে সাঁতার জানি না। ঘাটলার একেবারে শেষ ধাপে গিয়ে আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। অমনি ফুলি খিল খিল করে হেসে আমার হাত ধরে দেয় হেচকা টান। পানিতে পড়ে গিয়ে সাঁতার না জানা আমার অবস্থা একেবারে কাহিল।
ফুলি তখন আমাকে অভয় দিয়ে বললো, দিপু ভাইয়া পানিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি, দেখছো না। আসলে ফুলির কথাই ঠিক। পুকুরটা তেমন গভীর নয়। ঘাট থেকে পুকুরে নেমে মাটি ছোঁয়া যায়। অথচ তা না জেনে কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম। আবারো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম এই বিচ্ছুর সাথে আর কখনো বাইরে যাবো না।