মিঠু তুমি স্বাধীনতা আটাশ.

রমজান আলী মামুন

ফিরতে পথে মিঠুকে জিজ্ঞেস করছি পান ও তামাক কার জন্যে নিলিরে? মিঠু বললো, কার জন্যে আবার ঘরের ঐ ফোকলা বুড়িটির জন্যে। দাদিমাকে নিয়ে কেউ বুঝি এমন কথা বলে? মিঠু বলে: বলবো না। তুই হলে আরো বেশি বলতি। জ্বালায় তো শুধু আমাকেই। মানুুষ যুদ্ধের জ্বালায় বাঁচে না আর উনি খাবেন পান-তামাক। সে জন্যেই তো পায়ে হেঁটে এতটুকু পথ আসতে হলো। ভাগ্যিস তোকে পেলাম। তা না হলে একা একা বিরক্ত লাগতো। বাজার পেরিয়ে কাঁচা সুরকির রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে যেতেই একটি পলেস্তরা খসে পড়া পুরনো মন্দির চোখে পড়লো। মন্দিরের পাশের বাসায় দেখি কান্নার রোল উঠেছে। আমরা এগিয়ে গেলাম ওদিকে। মেয়েরা জড়াজড়ি করে কাঁদছে। পুরুষ বৃদ্ধটি কপালে হাত রেখে নির্বাক হয়ে গেছে। মিঠু বললো, হারান কাকা কী হয়েছে? বৃদ্ধটি কিছুই না বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। মিঠু আবার বললো, কী হয়েছে হারান কাকা? না বললে জানবো কেমন করে? এবার হারান কাকা কান্না থামিয়ে বললো: ওরা আমার নিরপরাধ ছেলে দেবাননকে মুক্তির লোক বলে কাল রাতে ধরে নিয়ে গেছে। আর মিলিটারি ক্যাম্পে তুলে দিয়েছে। মিঠু জানতে চায়, ওরা মানে কারা? বুড়ো বলে, সে কথাতো বলতে নেই বাবু। এবার মিঠু যেনো একটু চটে গেলো, বললো তোমার ছেলেকে ওরা ধরে নিয়ে গেলো, অথচ তুমি তাদের নাম বলছো না। হারান কাকার মেয়ে দিপালীদি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। বললো আমি শুনেছি ওরা শান্তি কমিটির লোক। কথাটি শুনে মিঠু যেনো আকাশ থেকে পড়লো। তারপর বললো, তোমরা চিন্তা করো না দেখি আমি কি করতে পারি।
উনত্রিশ.
খালপার বরাবর আসতেই সাজুর সাথে দেখা হয় আমাদের। মিঠু বলে: শুনেছিস হারান কাকার ছেলে দেবাননকে নাকি তুলে নিয়ে গেছে। সাজু বললো, শুধু এটা শুনেছিস? মিঠু বললো, মানে? মানে কিছুই না। কাল রাতে কিন’ অনেককেই ধরে নিয়ে গেছে। যেমন আক্কাস ভাই, রতনদা, আমাদের বন্ধু বিল্টুর বড় ভাই, বাবলুদা। মিঠু বললো, কী বলছিস এসব? ঘটনা এতটুকু গড়িয়েছে! সাজু বলে আরো শুনেছি উর্দুভাষী পাকিস্তানি আর্মিরা নাকি কাল রাতেই দু’জনকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। রফিক মেম্বার একজনকে ছেড়ে দেয়ার সুপারিশ করেছিল বলে, তাকে নাকি ওরা গালে থাপ্পড় মেরেছে। আর উর্দু ভাষায় গাল দিয়ে বলেছে, তুমি শান্তি কমিটির লোক হয়ে মুক্তিকে বাঁচাতে চাও কেনো?
মিঠু নিজের কানকে যেনো কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এসব কী শুনছে সে? পাক আর্মিরা শান্তি কমিটির লোকের কথাও মানছে না। তাহলে দেবানন আর বাবলু ভাইকে বাঁচাতে ও যাবেটা কার কাছে? সাজুকে ফেলে একটু এগুতেই দেখি আমাদের সামনে হনহনিয়ে ত্রস্তপায়ে এসে দাঁড়ালো মেজ কাকা।
চড়া গলায় বললো, মিঠু তোমরা এভাবে আর ঘুরাফেরা করবে না। এক্ষুণি ঘরে ফিরে যাও। মিঠু বললো, বাবা তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে। মেজ কাকা বললেন, ঘরে আসলে বলো। মিঠু বললো, কিন’ বাবা কথাটা যে আমাকে এক্ষুণি বলতে হবে। তা না হলে একটি পরিবারের খুব ক্ষতি হয়ে যাবে।
কাকা বললেন, কী বলতে চাও তাড়াতাড়ি বলো। আমার হাতে একদম সময় নেই। চেয়ারম্যান ডেকে পাঠিয়েছেন। মিঠু নীচু স্বরে বললো, বাবা কাল শান্তি কমিটির লোকেরা মুক্তির লোক অভিযোগে অনেক জনকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন’ ওরা সবাই মুক্তির লোক নয়। কাকা একটু রাগতস্বরে বললেন, তুই ছোট মানুষ ওসব ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছিস কেনো? মিঠু একটু বড় গলায় বললো, আমাদের ক্লাসমেট বিল্টুর বড় ভাই বাবলুদা আর হারান কাকার ছেলে দেবানন, ওরা কিন’ নিরপরাধ।
তুমি তাদের ছাড়িয়ে আনবে। মেজ কাকা নরম গলায় বললেন, আমি চেষ্টা করবো। তুমি এখন বাড়ি যাও। মিঠু কাকার কথায় কি বুঝলো জানি না। একটু সামনে গিয়ে আবার পিছন ফিরে এলো। কাকাকে বললো, শুনো বাবা তুমি যদি ওদের ছাড়িয়ে আনতে না পারো তবে আমি কিন’ মুক্তির দলে যোগ দেবো। মেজ কাকা মিঠুর কথায় হঠাৎ রেগে যান। তেড়ে এসে বললো, কী বললি হারামজাদা! তারপর মিঠুর গালে কষে একটা চড় লাগিয়ে দেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দিপু ওকে বাড়িতে নিয়ে যাও। এরপর তিনি হনহন করে চলে গেলেন।
ত্রিশ.
আমি মিঠুর হাত ধরে বলি চল ভাই। বাবার প্রতি রাগ করিস না। মিঠু বলে, মগের মুল্লুক নাকি? ওরা যা ইচ্ছে তাই করবে আর আমরা চোখ বুজে তা মেনে নেবো? আমি মিঠুর কথার কোন জবাব না দিয়ে মনে মনে মিঠুকে ধন্যবাদ দেই। আসলে এ ক’টা দিন আমি তাকে ভুল বুঝেছিলাম। কিন’ তার আজকের আচরণে সে ধারণা আমার ভুল প্রমাণিত হলো।
সূর্যটা তেতে উঠেছে। সেই তাতানো সূর্য মাথায় নিয়ে আমরা বাড়িতে এলাম। চৌকাঠে দাদিমা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
মিঠু তাঁর হাতে পান সুপারি আর তামাকের পোটলাটা গুঁজে দিয়ে কলতলায় চলে যায়। দাদিমা আমার দিকে চেয়ে বলে তুইও হাত মুখ ধুয়ে খেতে আয় ভাই। রান্নাঘরে খাবারের টেবিলে দেখি মিঠু নেই। আমি তার রুমে ঢুঁ মারলাম। দেখি সে গোঁ ধরে বসে দাঁত দিয়ে নখ কুটছে। আমি মৌনতা ভেঙে বলি, মিঠু খাবি চল। মিঠু বলে, না ভাই আমার ক্ষিধে নেই। তুই খেয়ে আয়। আমি দাদিমাকে বলে কয়ে পাঠালাম। দাদিমা বলে আসুক বাঁদরটা আজ। আমার নাতির গায়ে হাত তুলে। দাদিমাকে মিঠু আর ফেরাতে পারে না। শেষে তাকে খেতে আসতে হলো। দুই এক লোকমা মুখে দিয়েই মিঠু ভাতে পানি ঢেলে দিলো। দাদিমা বললেন সেকি দাদু ভাই, পাতে ভাত রেখে উঠে গেলে গুনাহ হবে যে। মিঠু বললো, আমার ক্ষিধে নেই যে দাদিমা।
একত্রিশ.
মিঠুর কথায় ঠিকই কাজ হলো। বোর্ড অফিসে গিয়ে মেজ কাকা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দেবানন ভাই ও বাবলুদাকে আর্মি ক্যাম্প থেকে ছাড়িয়ে আনলেন। দুপুরে ঘরে এসে সাজু আমাদের সে খবর জানালো। এবং তার সাথে সে আরেকটি দুঃসংবাদ দিলো। হারান কাকারা নাকি আজ রাতেই ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে যাবে। মিঠু বলে, কেনো? কেনো? সাজু বলে, গ্রামে মিলিটারি নামলে নাকি হিন্দুদের ওপর বেশি অত্যাচার শুরু হবে। একথা ভেবে হারান কাকা আর জীবনের ঝুঁকি নিতে চায় না।
আমার একটু ভাত ঘুম পেয়েছিলো। মিঠু বললো: চল, ওদের একটু দেখে আসি।
আমি আর না করলাম না। গেইটের বাইরে এসে দেখি মেজ কাকা আসছেন। পড়বি তো পর মালির ঘাড়ে। কাকা বললেন, কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আমি আমতা আমতা করে সত্যি কথাটিই বলে দিলাম। আংকেল একটু হারান কাকাদের দেখবো। মেজ কাকা দাঁত কড়মড় করে বললেন: তার আর প্রয়োজন নেই। আমি তো মিঠুর কথা মতো ওদের ছাড়িয়ে এনেছি। এখন তোমরা যদি ওখানে যাও তাহলে তোমাদের বিপদ হবে। আমরা আর কথা না বাড়িয়ে মুখ কালো করে ফিরে এলাম।