মায়ের জন্য

উৎপলকান্তি বড়ুয়া
Untitled-1

-এমন করে কে কাঁদছে? মুমু না? সে না মেলায় গেছে বাবার সাথে? এমন করে কাঁদছে কেন? -দাদুর গলায় উৎকণ্ঠার সুর।
-বুঝতে পেরেছি। সেই তখনই বলেছিলাম, ‘মা’ ছাড়া সে মেলায় গেলে কান্না করবেই। আমার কথা তো কেউ শুনলে না। দাদুর মাথায় হাত দেয়ার অবস্থা। মুমুর কান্না শুনলেই দাদুর মন ভালো থাকে না। মনটা কেমন করে ওঠে। বলতে গেলে মুমু দাদুর প্রাণ, বুকের কলিজা। প্রাণের টুকরো।
মুমু তো সেই সকাল থেকেই মেলায় যাওয়ার জন্যে বায়না ধরে বসে আছে। বাবা বললো- তোমার তো মায়ের গায়ে জ্বর মুমু। মেলায় তোমার সাথে যেতে পারবে না। তুমি তো আবার তোমার মা ছাড়া কোথাও যাও না। মা ছাড়া তুমি কি মেলায় যাবে? মুমু বাবার এক কথায় মেলায় যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে যায়।
একরোখা মেয়ে। মেলায় যাবে যখন বলেছে-যাবেই। না হয় আবার সেটা নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর কান্না শুরু করে দেবেই।
যাওয়ার আগে দাদু বার বার করে বলেছিলেন- না না, ঠিকই সে কান্‌্না করবেই। মা ছাড়া কি সে থাকে? কোথাও যায়? কিম্বা থেকেছে কোথাও? কান্না ঠিকই সে করবে।
বাবা আদর করে মুমুকে কাছে টেনে নিয়ে বলেন- আমার মা মণি তো ক্লাস টুতে পড়ে। অনেক বড় হয়েছে না! কোথাও গেলে মা’র জন্যে কান্না করে না। তাই না মা মণি? মুমু বাবার কথায় আলতো মাথা কাত করে।
মেলায় গিয়ে একটু পরেই হঠাৎ কান্না শুরু। ‘মা মা মা মা’ শব্দ জুড়ে দিয়ে সেই যে কান্না শুরু করলো, থামবার আর জো নেই। বাবা, নানা রকমের খেলনা, বাঁশি, ঢোল, বেলুন, মাটির পুতুল ইত্যাদি কিনে হাতে দেন মুমুর। না, তাতে তার কোনো পরিবর্তন নেই। মুমুর সেই ‘মা মা মা’ শব্দের একটানা কান্না বাবার কানকে এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ করে তোলে। মুমুটা ওরকমই। মা ছাড়া কিচ্ছুই বোঝে না যেনো। যেখানেই যাক, মাকে তার সঙ্গে থাকতেই হবে। মা ছাড়া যেনো কিচ্ছু বোঝেই না। অথচ বাবার জন্যে ঠিক ওরকম নয়। বাবা না থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। শুধু মার জন্যেই মুমুর যতো কান্না।
মুমুকে অনেক চেষ্টা করেও তার কান্না থামাতে ব্যর্থ হয় বাবা। বাবার সব ধরনের চেষ্টা বিফল হয়। কি আর করা! যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব, বাসায় ফেরা ছাড়া গতি নেই। বাবার কোল থেকে দাদু হাত বাড়িয়ে মুমুকে নিজের কোলে তুলে নেন। না, তখনও মুমুর কান্নার গতির কোনো পরিবর্তন নেই। গায়ে জ্বর নিয়ে মা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তাড়াতাড়ি।
-বলেছি না, ও আমাকে ছাড়া থাকবে না! কান্না করবেই। এসো মা মণি। এইতো আমি। এসো আমার কোলে। বলতেই দাদুর কোল থেকে মা’র কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুমু। মা’র কোলে যেতেই অমনি মুমুর কান্না থামে। ঠিক এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে মুমুর কিচ্ছুই হয়নি। একেবারে শান্ত!
-দেখোতো মেয়ের অবস্থা। এখন তো মনে হচ্ছে ওর কিছুই হয়নি। একেবারে ঠাণ্ডা! ও মা! মা’র জন্য এ ভাবে কাঁদতে হয়? বাবা সাথে থাকলে কি এমন করে কাঁদে কেউ? মায়ের মতো বাবার সাথেও তো থাকতে হয়। বাবার কথার কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে মুমু বাবাকেই জিজ্ঞেস করে- বাবা, আমার খেলনাগুলো কই? আমার বাঁশি, বেলুন, ঢোল ,পুতুল কই বাবা?
দাদু সোফায় রাখা মুমুর খেলনাগুলো তাড়াতাড়ি মুমুর হাতে দিয়ে বলে- এইতো দাদুমণি তোমার খেলনা-নাও। নতুন খেলনাগুলো হাতে নিয়ে মায়ের কোলে পরম আনন্দে খেলা করে মুমু।