মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানুষজন

মোহাম্মদ আজম

কথাসাহিত্যিক মানিক এমন সব কালোত্তর টেক্সট সমকাল এবং পরবর্তীকালের জন্য রেখে গেছেন যে তাঁকে এড়ানো একেবারেই অসম্ভব। কথাসাহিত্যিক মানিক এক চরিত্রবান স্রষ্টা হয়ে আমাদের সামনে কৌতূহলী- রাগী-বুদ্ধিদীপ্ত অস্তিত্ব নিয়ে জানান তিনি আছেন – সম্ভবত আরো অনেকদিন থাকবেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন – এবং আরো অনেকেও – যে, মধ্যবিত্তের জন্য এত পীড়াদায়ক লেখক আর হয় না। ভেতরের ঘুণ-ধরা রক্তমাংস বাহারি লেবাসের আড়ালে দিব্যি ঢেকেঢুকে রেখে যে জীবন যাপন করছি আমরা – মধ্যবিত্তরা – তাকে এমন ন্যাংটো করে, এমন অসহায় করে আর কেউ উপস্থিত করেননি। মানিক পড়তে গিয়ে মধ্যবিত্ত নিজের সেই চেপে রাখা ভুলে যাওয়া চেহারার মুখোমুখি হয়। তবুও আমরা মানিক পড়ি। এড়াতে পারি না বলেই পড়ি।
মানিক পড়তে গিয়ে দেখি মানুষের মেলা। মানুষের একটা বিস্তৃত-বহুল উপস্থাপনা তাঁর রচনায় আছে। মানুষের তো একটা সাধারণত্ব আছে – কমনরূপ – যে সে মানুষ। কিন্তু সাধারণ সংজ্ঞার মধ্যে কি আর মানুষকে পাওয়া যায়? তার শ্রেণী আছে, বর্ণ আছে, পেশা-স্থান-কাল প্রভৃতি আছে। এসব চিহ্নের বিশিষ্টতাই তো মানুষকে – অন্তত সাহিত্যের চরিত্রকে – আমাদের সামনে বিশিষ্ট করে দ্যায়। হ্যাঁ, মানিকের ক্ষেত্রেও আর দশজনের মতো শ্রেণীর একটা সীমাবদ্ধতা ছিলই। পিতা-প্রপিতামহক্রমে মানিক ঔপনিবেশিক আমলের মধ্যবিত্ত এবং এই পরিসরটার মধ্যেই তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। কিন্তু মানিকের মধ্যে এই সংকীর্ণ বেড়াকে অতিক্রম করে যাওয়ার এক নিরন্তর সাধনা দেখতে পাই এবং সেক্ষেত্রে একটা সাফল্য দেখতে পাই। তাই অনেক মানুষকে তিনি চিনতে পেরেছেন, তুলে আনতে পেরেছেন কলমের ডগায়। কুবের, শশী, রাজকুমার, ভিখু, পাঁচী – এদের কোনো একজনের সঙ্গে আরেক জনকে তো একাকার করে দেখতে পারি না। একেক জন নতুন মানুষ। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। তাঁর উপন্যাসে দেখি, তাঁর গল্পে দেখি – স্বামী কাপড় দিতে পারছে না বলে স্বামীর পাশে শুবে না বলে বউ গিয়ে শুয়ে থাকে পুকুরের পানির নিচে মাটির সমতলে। দেখি তাঁতি পেশাগত অভ্যস্ততাকে আমলে এনে সুতা ছাড়াই গভীর রাতে সশব্দে তাঁত চালিয়েছে। দেখি হারানের নাতজামাইয়ের মতো চরিত্র, যেখানে পুলিশি তাণ্ডবের বিরুদ্ধে জনতার একাকার সংগ্রাম একটা বিশেষ নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে রূপায়িত হচ্ছে। দিবারাত্রির কাব্যের ক্ষেত্রে, মানিক নিজেই ভূমিকাতে বলে দিয়েছেন, মানুষের প্রজেকশন তৈরি করাই ছিল সেখানে তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু এরপর তাঁর সমস্ত রচনায় বিচিত্র মানুষের সমাহার তাঁর অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি আর প্রতিভার নিপুণতাকেই আমাদের সামনে পষ্ট করে দেয়। এক তারাশঙ্কর ছাড়া বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত আর কোনো কথাসাহিত্যিক পাওয়া যাবে না, যাঁর রচনায় চরিত্রের এরকম ব্যাপকতা আছে, গভীরতা আছে; এত বৈচিত্র্য এবং বিভিন্নতা আছে। পদ্মানদীর মাঝির শীতলকে দেখি, সিধুকে দেখি; সেই চরিত্রগুলিকে খেয়াল করি যেগুলো অত্যন্ত গৌণ চরিত্র, কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী বিপুল আয়োজন, কত তেল-জলের আয়োজনে এই ছোট্ট চরিত্রগুলো রূপায়ণ করেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্পী হিসাবে নিরাসক্ত। নির্বিকার তিনি, আবেগহীন। ফলে চরিত্র তৈরি করেন, কিন্তু সেই চরিত্রের প্রেমে তিনি পড়েন না। চরিত্রকে টেনে ফুলিয়ে- ফাঁপিয়ে লম্বা আখ্যান তৈরি করেন না। আমরা ভিখুকে দেখি। কী আশ্চর্য গতি ! খুব দ্রুত যেন একটা গল্প বলে তিনি শেষ করতে চান। কারণ কী? মূল কারণ হল, মানিকের বলবার কথা ছিল। মানিক বলতে চেয়েছেন। বিলাসী গল্প-লেখকের মতো গল্পের জন্য গল্প ফাঁদেননি। শুধু শেষ পর্বে নয়, একেবারে প্রথম থেকেই। তাঁর গল্প বলার দ্রুততা, তাঁর গল্পের অল্প আয়তনের এটাই সম্ভবত প্রধান কারণ।
দেবেশ রায় এক চমৎকার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন – যিনি ব্যক্তি-চরিত্র আঁকতে এতটা পারঙ্গম, তাঁর লেখা শেষ দিকের গল্পগুলোতে ব্যক্তি ঠিক সুস্পষ্ট অবয়ব পাচ্ছে না। সেখানে ব্যক্তি আছে, চমৎকারভাবেই আছে; কিন্তু কাহিনী উপস্থাপনের যে তাড়া, বক্তব্য প্রকাশের এবং চারপাশটাকে উপস্থাপন করার যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে গৌণ করে দ্যায়। বলা বাহুল্য, মানিক তাঁর শিল্পিজীবনের বড় অংশটাতে ঠিক তথাকথিত ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদের চর্চা করেন নাই। এই যে চরিত্র – বিপুল চরিত্র – তার মধ্যে অন্তত প্রথমাংশের মানিকের চরিত্রগুলোকে আমরা দেখব এক ধরনের নিয়তির আবেষ্টনের মধ্যে কাজ করছে, প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, নির্মিত হচ্ছে এবং প্রকাশিত হচ্ছে । কিন্তু খুব সচেতন থাকা দরকার, মানিক মোটেই নিয়তিবাদী লেখক নন। কারণ মানিকের চরিত্র মোটেই উপর থেকে নাযিল হয় না, আসমান থেকে নাযিল হয় না – এই মাটিতেই পয়দা হয়। একদিকে হয় চরিত্রের অন্তরে – মনোজগতে। আরেক দিকে হয় সামাজিক সংস্থানের মধ্যে। যেখানে সে জন্মেছে এবং বড় হয়েছে। নিয়তিকে তিনি যেভাবে ব্যবহার করেছেন – অন্তত প্রথম দিকে, তাঁর গল্প যেখানে নিয়তি-আক্রান্ত – সেখানেও নিয়তিকে যেভাবে তৈরি করেন, তাতে পাই মানিকের সাহিত্যের প্রধান দুই বৈশিষ্ট্য। একদিকে প্রবৃত্তির শাসন এবং প্রবৃত্তি-চালিত মানুষের মনস্তত্ত্ব। অন্যদিকে পারিপার্শ্বিকের যেসব বিস্তৃত ব্যাকরণ দ্বারা মানুষ নিয়ন্ত্রিত তার সমীক্ষা। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও মানিকের পুরো সাহিত্যকর্মকে এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করি।
এখানে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার যে, মানিকের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের যে সব দিক আমরা উল্লেখ করলাম – সেই বৈশিষ্ট্যগুলো কিন্তু হুট করে আসেনি। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসের মধ্যে যদি আমরা নজর দিই তাহলে দেখব, এর অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের চর্চা কিন্তু সেখানে হচ্ছিল। কাছাকাছি সময়ে হচ্ছিল। কয়েকটা উদাহরণ দিই। মনস্তাত্ত্বিক চর্চার শিল্পী হিসাবে মানিকের খ্যাতি আছে। আমরা দেখব চর্চাটা রবীন্দ্রনাথ করেছেন ব্যাপকভাবে, করেছেন শরৎচন্দ্র এবং কল্লোলের লেখকেরাও। যদি আমরা নিম্নশ্রেণীর মানুষের চরিত্র চিত্রণের কথা বলি, জীবন-চিত্রায়ণের কথা বলি, তাহলে দেখব যে এটা শরৎচন্দ্রের লেখার মধ্যে ছিল, প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখায় ছিল, শৈলজানন্দের লেখায়, বিশেষভাবে বলতে হয়, তারাশঙ্করের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছিল। যদি আমরা প্রবৃত্তির কথা তুলি – মানিকের চরিত্র তো নিঃসন্দেহে প্রবৃত্তি-তাড়িত – তাহলেও দেখব, প্রবৃত্তির আলোছায়ায় চরিত্র উপস্থাপনের চেষ্টা কল্লোলে প্রবলভাবে হাজির। তারা এমনকি যৌনতাকে একটা কেন্দ্রীয় মাহাত্ম্যও দিয়েছিল। এছাড়া আমরা প্রকৃতিবাদের কথা বলি, বাস্তববাদের কথা বলি। সাধারণ অর্থে বাস্তববাদ এবং মার্কসবাদী বাস্তববাদ – দুই অর্থেই। এবং সেটাও আমরা দেখব নজরুল থেকে শুরু করে বিষ্ণু দে হয়ে চল্লিশের দশকের কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং পরিচয় পত্রিকার আবেষ্টনের মধ্যে এ ব্যাপারগুলোর চর্চা হচ্ছিল। কিন্তু মানিকের ক্ষেত্রে পার্থক্যের ব্যাপারটা আমাদের নজরে রাখতে হবে। ইলিয়াসসহ আরো অনেক সমালোচক ঠিকই সনাক্ত করেছেন যে ঐ অনেকের কাছে বিশেষত কল্লোলীয়দের কাছে যেখানে পুরো ব্যাপারটা ছিল কেবল শিল্পকৌশল, সেখানে মানিক পুরো ব্যাপারটাকে নিয়েছেন জীবনদৃষ্টি হিসাবে, আর শিল্পদৃষ্টি হিসাবেও। এবং ব্যাপারগুলো এমন একটা গোছগাছের মধ্যে, এমন একটা সিদ্ধান্তের মধ্যে, এমন একটা নিশ্চয়তার মধ্যে তিনি তুলে আনতে পেরেছেন যে বাংলা কথাসাহিত্যের নতুন অভিজ্ঞতা হিসাবেই আমাদের মানিককে পাঠ করতে হয়। আবার মনে করিয়ে দিই : মানিক শিল্পের জন্য শিল্প চর্চা করতে চাননি; আগেও নয়, পরেও নয়।