মানসিক রোগ চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়াতে হবে

সম্পাদকীয়

বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া ও জাতীয় মানসিক স্বাস’্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১৬ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮ শতাংশ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া শিশু কিশোরদের মধ্যে প্রতি হাজারে আটজন অটিজমে আক্রান্ত। দেশে সিজোফ্রেনিয়া রোগীর সংখ্যা দুই কোটি ৬০ লাখ।
বাংলাদেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসার জন্য সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা রয়েছে মাত্র ৮১৩টি। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৃথক কোনো সেবাকেন্দ্র নেই। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর এ রোগের চিকিৎসা নির্ভরশীল। বিশাল পরিমাণ মানসিক রোগীর চিকিৎসার জন্য দেশে মাত্র ১৯৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। এদের অধিকাংশই বাস করেন রাজধানী ঢাকায়। জেলা ও উপজেলা স্বাস’্যকেন্দ্রগুলোয় কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। সরকারি পর্যায়ে জাতীয় মানসিক স্বাস’্য ইনস্টিটিউট, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মানসিক রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের কয়েকটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
সে সূত্রে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) মানসিক রোগ বিভাগ একটি আছে। তার শয্যাসংখ্যা ২৩ হলেও বর্তমানে সেখানে রোগী ভর্তি আছেন ৭০ জন। নানা সমস্যায় জর্জরিত এই ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও জনবল নেই। এই ওয়ার্ডে চিকিৎসক আছেন তিনজন। তার মধ্যে আউটডোরে রোগী দেখতেন একজন। সম্প্রতি তিনিও চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কাগজে-কলমে ৮জন নার্স থাকলেও দুজন প্রেষণে অন্যত্র চলে যাওয়ায় ৬জন পালাক্রমে কাজ করেন। কখনো একজন নার্সকেই পুরো ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হয়। মানসিক রোগীদের ওয়ার্ডে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকলেও এই ওয়ার্ডে কোনো দারোয়ান নেই। কয়েক বছর আগে এক রোগীর শ্লীলতাহানীর ঘটনাও ঘটেছিল। দুপুরের পর এই ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসক আসে না। ওয়ার্ডে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা চারজন। এরা সকালের শিফটেই কাজ করে শুধু। ফলে রাতের শিফটে ওয়ার্ডে কোনো সরকারি কর্মচারীও থাকে না। মানসিক রোগের এই ওয়ার্ডে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনবলের অভাবে প্রায় সময় নোংরা অবস’াতেই থাকে ওয়ার্ডটি। মোট কথা চমেক হাসপাতালের এই ওয়ার্ডটির সমস্যার কথা লিখেও শেষ করা যাবে না।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল তার ধারণ ক্ষমতার বহুগুণ বেশি রোগীর সেবা দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। ৫০০ শয্যার জনবল নিয়ে চালু হওয়া এই হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বেড়েছে। তার ওপর শয্যা অনুপাতে বহুগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে কিন’ স্বাস’্য মন্ত্রণালয় এই হাসপাতালের সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধির তেমন কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করেনি। এই নগরে প্রতিদিন লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে রোগব্যাধিও। কিন’ সে অনুপাতে বাড়ছে না চিকিৎসাসুবিধা। শতকরা ১৬জন যেখানে মানসিক রোগে ভুগছে সেখানে এই বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে না নগরে।
এখনো দেশে মানসিক রোগীদের আধুনিক চিকিৎসা দিতে অনীহা আছে। সাধারণ মানুষের অনেকেই এই রোগকে ‘জ্বীনে ধরেছে’ ‘ভূতে ধরেছে’ বলে বিশ্বাস করে এবং গ্রাম্য বৈদ্য-ফকির ধরনের ভুয়া চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন। এই প্রবণতা রোধ করতে হলে, দেশের মানসিক রোগীদের সুচিকিৎসা দিতে হলে সরকারকে এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রয়োজন মাফিক চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। নতুবা সবার জন্য স্বাস’্য, ঘরে ঘরে স্বাস’্যসেবা ইত্যাদি শুধু স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।