আলোকপাত

‘মানসম্মত শিক্ষা শেখ হাসিনার দীক্ষা’

লিটন দাশ গুপ্ত

‘মানসম্মত শিক্ষা শেখ হাসিনার দীক্ষা’-এই শ্লোগানটি হচ্ছে এবারের শিক্ষা সপ্তাহের প্রতিপাদ্য বিষয়। এখানে মানসম্মত শিক্ষা কথাটি আসাতে একটি কথা না বললে নয়, প্রাথমিক শিক্ষার যে লোগো আছে, সেটাতে আগে লেখা ছিল ‘সবার জন্য শিক্ষা’। এখন তা পরিবর্তন করে ‘সবার জন্যে মানসম্মত শিক্ষা’ করা হয়েছে।
বেশ কয় বছর থেকে মানসম্মত শিক্ষা শব্দটি যেন বেশি বেশি শুনতে পাচ্ছি। অথচ আমরা শিক্ষার তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, সাক্ষরতা হার ৭০% এর ঊর্ধ্বে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশু ৯৮% এর ঊর্ধ্বে ঝরে পড়ার হার খুব কম সময়ে ২০% এর নিচে নামিয়ে আনা হল। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল অতি উত্তম যা ঈর্ষণীয়ও বটে। আর এই সকল সূচক উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে, বর্তমান সরকার প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও অতি আন্তরিকতায়। তিনি প্রত্যাশিত শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্যে শিক্ষার সার্বিক ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। যেমন- বছরের প্রথম দিন শতভাগ শিক্ষার্থীকে শতভাগ নতুন বই প্রদান, সকল শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান, বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ ও বেতনভাতা বৃদ্ধি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবস’া, বিদ্যালয়ে ভৌতঅবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন, শিক্ষকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ, প্রত্যেক বিদ্যালয়ে বিভিন্নখাতে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ইত্যাদি সহ আরো কত কি! কিন’ এতসব পরেও বিশ্বব্যাংকের শিক্ষা সম্পর্কিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫ম শ্রেণির শিক্ষাক্রম সম্পন্ন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ বাংলা পড়তে পারে, ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী মোটামুটি গণিত করতে বা কষতে পারে। কিংবা ৮ম শ্রেণির শিক্ষাক্রম শেষ করা শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ শতাংশ বাংলা ও ৩৫ শতাংশ গণিতের জ্ঞান রয়েছে। এই থেকে বুঝা যায়, শিক্ষার পরিমাণগত মান বাড়লেও গুণগত মানের অভাব রয়েছে।
শিক্ষা হচ্ছে সমাজ উন্নয়নের হাতিয়ার এবং শিক্ষা ব্যবস’া একটি সামাজিক প্রক্রিয়াও বটে, যার মাধ্যমে সমাজ ধাপে ধাপে বিকশিত হতে থাকে। আমরা জানি, শিক্ষার মাধ্যমে কুসংস্কার, গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস, মানসিক সংকীর্ণতা, এমন কি জাতি-ধর্ম, বর্ণ, দল-মত, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ ইত্যাদি বৈষম্য দূর হয়। অর্থাৎ শিক্ষার সাহায্যে কিছু বিষয় সম্পূর্ণ নির্মূল করা না গেলেও সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব। তাছাড়া শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন মানুষ দায়িত্বশীল সদস্য হিসাবে সমাজে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কিন’ সেই শিক্ষাই যদি মানসম্মত না হয়, তবে সমগ্র দেশে এর বিপরীত প্রভাব পড়বে। কারণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমাজের সমষ্টি হচ্ছে পুরো দেশ। আর এর প্রভাব শুধু বর্তমান সময়ের জন্যে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা সমাজের পরবর্তী হাতিয়ার হিসাবে বেড়ে উঠবে তাদের জন্যেও প্রযোজ্য। তাই এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মানস্মত শিক্ষা যাতে একটি মডেল হিসাবে কাজ করে, সেই দিকেই সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য রাখতে হবে।
সুষ্ঠু সমাজ গঠন ও সামাজিক দায়দায়িত্ব রক্ষার জন্যেই মানসম্মত শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, মানসম্মত শিক্ষা সু্ষ্ঠু সমাজ ব্যবস’া প্রবর্তনের মাধ্যমে, সমগ্র দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে প্রথম ও প্রধান সোপান। কারণ আগেই বলেছি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমাজের সমষ্টি হচ্ছে একটি দেশ।
এখনকার সময়ের বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর বুকে এই দেশ উঠতি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অতি দ্রুত বলা যায়। আমরা জানি বর্তমান সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে স্বল্প উন্নত দেশের স্বীকৃতিও পেয়েছে। যা শিক্ষা ব্যবস’া উন্নত না করলে কখনো সম্ভব হত না। কিন’ এই শিক্ষা ব্যবস’া কেবল উন্নত হলে হবে না, উন্নত হতে হবে এর মান। কারণ অর্থবহ সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নাই।
তাই দেশের সকল শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষা ও মানসম্মত শিক্ষার আওতায় এনে জীবন-জীবিকার জন্যে যে ন্যূনতম জ্ঞান দক্ষতা দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের প্রয়োজন তার ব্যবস’া গ্রহণ করতে হবে। এই মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে জনসম্পদে রূপান্তর করা সমভব। কারণ মানহীন শিক্ষার মাধ্যমে কেবল সার্টিফিকেট অর্জন করা যায় কিন’ সুন্দর সমাজ ব্যবস’া বিনির্মাণ সহ কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ কখনো সম্ভব নয়।
তাই পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের সকলকে বিশেষ করে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে, মানসম্মত শিক্ষা বিষয়ে ভাবতে হবে। একই সাথে মনে রাখতে হবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা চেতনা, দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সুউচ্চ ও প্রখর। তাই তাঁর নেতৃত্বে, তাঁর সিদ্ধান্ত মোতাবেক বা তাঁর থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে, মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্যে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

লেখক : ছড়াকার, প্রাবন্ধিক