কুতুপালং-বালুখালী বস্তি

মানবেতর জীবনযাপন করছে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা

আক্রান্ত হচ্ছে ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া ও টেকনাফ
উখিয়ার বালুখালী নতুন বস্তিতে আশ্রিত একটি রোহিঙ্গা পরিবার-সুপ্রভাত
উখিয়ার বালুখালী নতুন বস্তিতে আশ্রিত একটি রোহিঙ্গা পরিবার-সুপ্রভাত

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস’ার প্রতিনিধিদের সফর সামনে রেখে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা তাণ্ডব আগের তুলনায় কমেছে। যে কারণে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে এখন ভাটা। তবে কুতুপালং ও বালুখালীর বনভূমিতে বসবাসরত প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা খাদ্য, বাসস’ান, শীতবস্ত্র ও ওষুধের অভাবে মানবেতর দিনযাপন করছে। বিশেষ করে ঠাণ্ডাজনিত রোগে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা আক্রান্ত হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না বলে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার সকালে উখিয়া সীমান্তের জিরো পয়েন্টের ১ কিলোমিটার পশ্চিমে ১০৫ হেক্টর বনভূমিতে ঘুরে এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গার দৈনন্দিন জীবনযাপন দেখে এসব তথ্য জানা যায়।
এসময় বালুখালী বস্তির ১ নম্বর ব্লকের মাঝি আব্দুল করিম জানান, তার ব্লকে প্রায় দেড় হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে। যাদের অধিকাংশই হতদরিদ্র, বয়োবৃদ্ধ, শিশু ও স্বজনহারা নারী। পরিবারে পুরুষ না থাকায় ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেকেই এখনো পর্যন্ত ঝুপড়ি নির্মাণ করতে পারেনি। আত্মীয়তার সুবাদে কারো না কারো ঝুপড়িতে কোনোরকম রাতযাপন করছে।
মায়ানমারের নাইচ্ছংপাড়া থেকে দুই শিশু নিয়ে আসা রহিমা আক্তার (২৩) বলেন, ‘আমার স্বামী আব্দুল্লাহ (২৭) নিখোঁজ হয়ে গেছেন প্রায় দেড় মাস হলো। বর্মী সেনাদের জুলুম থেকে রক্ষা পেতে পাড়ালিয়াদের সাথে বালুখালী বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছি। কিন’ এখনো ঝুপড়ি তৈরি করতে পারিনি। ছোট ছেলে জাহেদের (২) গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারিনি।’ পাশে তার মামা রকিবুল্লাহর ঝুপড়িতে রাতযাপন করেন বলে জানান তিনি।
পার্শ্ববর্তী আরেক বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী, দুই সন্তান মিলে চারজনের একটি পরিবার কোনোরকম পলিথিনের নিচে রাত কাটাচ্ছে। জানতে চাওয়া হলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, রাতে পলিথিন থেকে বৃষ্টির মতো পানি পড়ে। কাপড়-চোপড় যা আছে, তাও ভিজে যায়। ঠাণ্ডায় তাদের একটি ছেলে নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
পাশের ঝুপড়িতে দেখা গেল, ৭০ বৎসরের বয়োবৃদ্ধ আশরাফ আলী জ্বরে কাতরাচ্ছে। তার মেয়ে সামিরা (১৮) জানায়, ‘টাকার অভাবে বাবার চিকিৎসা করাতে পারিনি। এমএসএফ হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছু ওষুধ দিয়েছে, তাও জ্বর কমেনি।’
স’ানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আবছার জানান, তার এলাকায় গড়ে ওঠা বস্তিতে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেকেই অসচ্ছল পরিবার। এসব পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনেক অনুদান দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স’ানীয়রা যে যার সাধ্যমত শীতবস্ত্র, চাল প্রভৃতি বিতরণ করছে। তার পরও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বেশ কিছু বয়োবৃদ্ধ ও শিশু আক্রান্ত হয়েছে।’
স’ানীয় চিকিৎসক ডা. আনোয়ার ফয়সাল জানান, ‘প্রচণ্ড কুয়াশায় পলিথিন থেকে বৃষ্টির মতো পানি নির্গত হওয়ার কারণে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা ঠাণ্ডা জনিতে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকেই টাকার অভাবে সুচিকিৎসা নিতে পারছে না।’
আইওএম’র ফিল্ড কোর্ডিনেটর সৈকত বিশ্বাস জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজারেও বেশি রোহিঙ্গাকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
স’ানীয় ইউপি সদস্য বখতিয়ার মেম্বার জানান, প্রথম দিকে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিভিন্ন ব্যক্তিকে এসব রোহিঙ্গাদের নগদ টাকা ও শীতবস্ত্র বিতরণ করতে দেখা গেলাও ইদানিং তাও কমে গেছে। যে কারণে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে আলাপ করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাঈন উদ্দিনের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গা বহনকারী নৌকা ফেরত পাঠাল বিজিবি
টেকনাফ নাফনদী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অনুপ্রবেশকালে ২০ জন রোহিঙ্গাসহ একটি নৌকা ফেরত পাঠিয়েছে ২ বিজিবি সদস্যরা।
গতকাল বুধবার ভোরে টেকনাফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ঝিমংখালী পয়েন্ট দিয়ে নাফনদীর পাড়ি দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় তাদের আটক করে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
টেকনাফ ২ বিজিবি উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মিয়ানমারে সহিংসতার পর থেকে প্রতিনিয়ত নাফ নদী পাড়ি দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল ভোরে নাফনদীর ২টি পয়েন্ট দিয়ে ২০ জন রোহিঙ্গাসহ একটি নৌকায় ফেরত ফেরত পাঠানো হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন