মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান কিছু কথা

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী

দেশে ভয়াবহভাবে মাদকাসক্তদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আর্থসামাজিক অবস’া, বেকারত্বের অভিশাপ, প্রেমে প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক বিরোধ, উগ্র আকাশ সংস্কৃতি তথা অপসংস্কৃতি বা বিজাতীয় সংস্কৃতির উত্থান-বিকাশ আর প্রসারের কারণে সমাজে বাড়ছে অনৈতিক নানা সংস্কৃতি সামাজিক রীতি নীতি উপেক্ষা করা বা ধর্মীয় রীতিনীতিকে তোয়াক্কা না করা, মাদক বা নেশাদ্রব্যের সহজলভ্যতা এবং কমমূল্যে প্রাপ্তি এসব বহুমাত্রিক কারণে দেশের যুবক যুবতী, এমন কি শিশুরা পর্যন্ত নেশার প্রতি আকৃষ্ট বা নেশার সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
নেশার জগতে সবচেয়ে বেশি কদর ইয়াবার যা খুব লাভজনক এবং অল্প সময়ে ধনী হওয়া যায়। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলার বাহিনীর সদস্য থেকে সমাজের প্রায় প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষ এই ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ইয়াবা ছোট ছোট বড়ির মতো যা সহজে বহন করা যায়, লুকিয়ে রাখা যায়, অন্যান্য নেশা দ্রব্যের চেয়ে এর চাহিদা আর লাভ অনেক বেশি। তাই মাদক ব্যবসায়ীদেরও পছন্দের ব্যবসা হল ইয়াবা।
এক সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ১৯৯৭ সালে বার্মা থেকে ইয়াবা আসা শুরু হয়। রাসায়নিক পদার্থ মেথাফেটামাইন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণের মাধ্যমে তৈরি হয় ইয়াবা। সৈনিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লান্তি না আসা, নিদ্রাহীনভাবে মনকে উৎফুল্ল আর চাঙ্গা রেখে উদ্দীপনার সাথে যুদ্ধ করতে পারে সেজন্যে ইয়াবার প্রচলন শুরু হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। এটি আবার অনেক দেশে ওজন কমানো এবং সর্দি ও নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হতো। পরে শিক্ষার্থী, দীর্ঘ যাত্রার গাড়ির চালক দৌড়বিদরা এটির ব্যবহার শুরু করেন। সেবনের পর ইয়াবার আনন্দ আর উত্তেজনা সাময়িকভাবে জীবনের সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্নের ভুবনে। পরবর্তীকালে এর কুফল বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া উদঘাটিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এর ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া হয়। আসলে এটিকে ক্রেজি মেডিসিনও বলা হয়ে থাকে যা নেশা জাতীয় ঔষধের নামান্তর। এটি ভয়াবহ এবং ভয়ংকর মাদক যা মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, যকৃৎ, কিডনিসহ শরীরের যে কোন অঙ্গকেই আক্রান্ত এবং ধীরে ধীরে বিকল করে দিতে পারে। মানুষের সুন্দর দেহ মন মানসিকতা ধ্বংস করে দেয়। এমনকি মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃতি পর্যন্ত ঘটিয়ে থাকে। তাছাড়া এ মাদকসেবীদের অনেকে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়, অনেকের আবার দৃষ্টিশক্তি কমে যায় আবার অনেকের ঘটে স্মৃতিভ্রম। এরা নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। তথাপি ইয়াবাসেবী মাদকাসক্তরা তা সহজে ছাড়তে পারে না যা দেশ ও জাতির জন্য এবং আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য ভয়ংকর হুমকি আর অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই ভয়াবহ মাদকের বিরুদ্ধে এলিট ফোর্স র্যাবের অভিযান শুরু হয় গত ১৫ মে’১৮ থেকে। বলা চলে হঠাৎ টেকনাফের একরাম হত্যার পর অনেকটা থমকে পড়লেও ঢিমেতালে চলছে এই অভিযান। তথাপি ধরপাকড় এবং বন্দুক যুদ্ধে অনেকে নিহত হলেও মাদকের ব্যবসা বন্ধ করা যায়নি বরং অবাধে, বিভিন্ন উপায়ে চলছে ইয়াবা ব্যবসা। চাঞ্চল্যকর তথ্য হচ্ছে, গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগরীতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো একটি মাইক্রোবাসে তল্লাশি চালিয়ে ৮টি অস্ত্র এবং ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র্যাব-৭। র্যাব জানায়, অস্ত্র এবং ইয়াবা টেকনাফ থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এতে বুঝা যায় মাদক ব্যবসায়ীদের কত দুঃসাহস। প্রকৃতপক্ষে বন্দুক যুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোন বড় ইয়াবা ব্যবসায়ী বা গডফাদার মারা যায়নি বা আটক হয়নি। ফলে আড়ালে থেকেই ওরা ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে নির্বিঘ্নে, অবাধে, বিভিন্ন উপায়ে।
“চট্টগ্রামে হওয়া মাদক মামলাগুলোতে শুধু বাহককে আসামি করে অভিযোগপত্র দিচ্ছে পুলিশ। এতে আড়ালে থেকে যাচ্ছেন পাচারকারী চক্রের গডফাদাররা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা নতুন বাহক দিয়ে চালু রাখছেন মাদক ব্যবসা। গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় মাদকের বিস্তার কমছে না বলে মনে করছেন সরকারি এক কৌঁসুলি”। খুব দুঃখজনক হলেও সত্য, অভিযোগপত্র ঘেটে দেখা যায়, শুধু বাহককে আসামী করা হয়েছে। এজাহারে যাঁদের নাম রয়েছে, অভিযোগপ্ত্েরও তাদের আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামিরা ইয়াবা কিংবা মাদকগুলো কার কাছ থেকে নিয়েছেন, কার কাছে পৌঁছানোর কথা, কে বা কারা তাঁদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছেন, তার কোনো বর্ণনা নেই অভিযোগপত্রগুলোতে।
অল্প সময়ের কারণে পুলিশের তদন্তের গভীরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে প্রভাবশালীরা, গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ইয়াবাব্যবসা বন্ধ করার জন্য মাদক মামলার সময় বাড়ানোর পাশাপাশি তদন্তের সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে তদারকির মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে মামলার গভীরে গিয়ে মূল পাচারকারী সহ সংশ্লিষ্ট গডফাদারদের শনাক্ত করা অতীব জরুরি বলে আইনজীবীদের অভিমত।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ সবাইকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। সামাজিক আন্দোলন, দেশের প্রতি মমত্ববোধ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজকে মাদকমুক্ত করার যুদ্ধ চলমান রাখার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ করতে হবে।
মাদকের কুফলের ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। তবে সবকিছুর মূলে মাদক ব্যবসায়ী, পাচারকারী, বাজারজাতকারী তিনি জনপ্রতিনিধি হউন কিংবা প্রভাবশালী হোন অবশ্যই বিচারের, আইনের ও কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে। মূল হোতারা যদি আড়ালে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় তাহলে ইয়াবার ছোবল থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও কোমলমতি সন্তানদের রক্ষা করা সম্ভবপর হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্তদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত।
আগামী প্রজন্মের জন্য সুখী সুন্দর-শুভ নিরাপদ এবং মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধ আপোষহীন গতিতে চলুক, দেশবাসী সেই প্রত্যাশা করে। জনস্বার্থে যতো শক্তিশালী, প্রভাবশালী, উঁচু মহলের মানুষ হোক না কেন সেই গড ফাদারদের আড়াল থেকে টেনে বের করে আনা অতীব জরুরি। না হলে থামবে না ইয়াবা পাচার এবং মাদক ব্যবসা।
থামবে না যুবসমাজের অধঃপতন এবং মানবিক বিপর্যয়। সুখী সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের সকলের সম্মিলিত দৃঢ় প্রত্যয়।