মাতৃভাষা রোহিঙ্গা পড়াশোনা বার্মিজে

কামরুন নাহার সানজিদা

তাদের মাতৃভাষা রোহিঙ্গা। একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করেন এই ভাষাতেই। তবে যদি স্কুলে পড়াশোনা করতে চান, তাহলে পড়তে হবে বার্মিজ ভাষায়। স্কুলে পড়ানো বিষয়গুলোর সবকটি বইয়ের ভাষাই বার্মিজ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের বাইরে কোথাও প্রবেশাধিকার না থাকলেও তাদেরকে দীক্ষিত হতে হয় বার্মিজ ভাষাতেই। তবে এই দীক্ষাও দশম শ্রেণির পর আর করার সুযোগ নেই।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা আট লাখেরও বেশি। বিশাল এই জনসংখ্যার জন্য রাষ্ট্র থেকে শিক্ষাদানের কোনো ব্যবস্থা নেই। সাধারণ স্কুলেও তাদের পড়াশোনার সুযোগ নেই। প্রতিবেশী মগ শিশুটি সরকারি স্কুলে লেখাপড়া করতে পারলেও রোহিঙ্গা শিশুরা সেই স্কুলে পড়ার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায় এসব তথ্য। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে আহত স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে চমেক হাসপাতালে আছেন মোহাম্মদ শফি।
রাখাইনের বুথিডাং এলাকার সাঙ্গানার বাসিন্দা শফি সেখানেই একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি জানালেন, ‘সরকার থেকে রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর শিক্ষার জন্য কোনো সাহায্য না থাকলেও বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার সহযোগিতায় তারা পড়াশোনা করতে পারতেন।’
ডব্লিউএফপি (ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম), ইউনিসেফ, এসিএফ (অ্যাকশন একমনডেশন ফান্ড) ও এমএসএফ -এই চারটি সংস্থা রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য সহযোগিতা করে। এনজিওগুলোর দেয়া অর্থ সাহায্য নিয়ে নিজেরাই গাছ কেটে স্কুল তৈরি করতেন বলে জানান শফি। স্কুলের বই, খাতা, পেন্সিল, ব্যাগ এসবই স্কুলের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করা হতো।
তবে রেহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষিত হওয়ার দৌড় এইটুকুই। দশম শ্রেণির পর আর কোনো পড়াশোনাই করতে পারে না রোহিঙ্গারা। এর বাইরে পড়তে হলে হয় সরকারি কলেজ নয়তো রাখাইন রাজ্যের বাইরে। কিন্তু এই রাজ্যের বাইরে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। আর সরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তাদের ভর্তির সুযোগ নেই। অর্থাৎ দশম শ্রেণির পর তাদের পড়াশোনা বন্ধ।
শফি নিজেও পড়াশোনা করেছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে তিনি মেট্রিক পাস করেন। পাশের আকিয়াব শহরে কলেজ থাকলেও সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় আর পড়তে পারেননি।
‘পড়াশোনা আরো চালিয়ে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিলো আমার’, বলেন তিনি। ‘কিন্তু আকিয়াবে আমরা ঢুকতে পারি না। অনেকেই বাংলাদেশে চলে এসে পড়াশোনা করেছে। আমার ইচ্ছে থাকলেও টাকা ছিলো না। তাই আর পড়া হলো না। আমরা আট ভাই-বোন সবাই মেট্রিক পাস করেছি।’
রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি হওয়া স্কুলে সরকার বা বাইরে থেকে কোনো শিক্ষক না আসায় এই এলাকার মেট্রিক পাস করা ছাত্ররাই এখন সেখানে শিক্ষকতা করেন। নিজেরাই শিক্ষা দেন তাদের সন্তানদের। আর তার জন্য এনজিও সংস্থাগুলো তাদের পারিশ্রমিক দেয়।
রোহিঙ্গা ভাষা- যার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বেশি মিল রয়েছে, সেটিই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। অন্য কোনো ভাষায় তারা কথা বলতে পারে না। মাতৃভাষা হলেও বার্মিজ ভাষাতেই তাদের পাঠ্যপুস্তক পড়তে হয়। পড়াশোনাও করতে হয় বার্মিজ ভাষায়।
রোহিঙ্গা ভাষাটি অলিখিত হলেও এক সময় এটির বর্ণমালা ছিলো বলে জানান মোহাম্মদ শফি। তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আমার বাবার মুখে শুনেছি, অনেক আগে রোহিঙ্গাদের লেখার জন্য বর্ণমালা তৈরি হলেও সরকার থেকে এটি ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। ফলে আমাদের নিজস্ব কোনো লিখিত ভাষা নেই।’
তবে পড়াশোনা করে শিক্ষিত হলেও চাকরি করার সুযোগ নেই শফিদের। হালচাষ আর টুকিটাকি কাজ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ধান, মরিচ, সবজি, তরি-তরকারি এসব নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করেন। আবার মগ ব্যবসায়ীরাও এসে কিনে নিয়ে যায়।
শফি যেই স্কুলটিতে শিক্ষকতা করতেন, সেখানে ছাত্রছাত্রী ছিলো ৮০০ জনের বেশি। এইরকম নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তৈরি স্কুল রাখাইনে অসংখ্য। নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে প্রাণান্ত চেষ্টা তাদের। পূর্বপুরুষরা ভেবেছিলেন, অশিক্ষিত হওয়ায় তারা নিজেরা স্থায়ী হতে পারেননি। তাই অনুজদেরকে শিক্ষিত করতে চেষ্টা করেছেন। পালিয়ে আসার আগ পর্যন্ত শফির মেয়ে সালমা (১৩) নবম ও ছেলে আইয়ূব (১৭) দশম শ্রেণিতে পড়তো।
মলিন মুখে তিনি বলেন, ‘নিজে বেশি পড়তে পারিনি, তাদেরকে পড়াতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু ভাবছি, এখন ঘর নেই, বাড়ি নেই, কীভাবে তাদের পড়াবো?’