মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ মে’র প্রথম সপ্তাহে

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর হবে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর। যেখানে প্রাথমিক অবস’ায় দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এ টার্মিনালে ৩২০-৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের। যেখানে ১৬ মিটার ড্রাফটের ৮ হাজার টিইইউস কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে। ২০২০ সালের আগস্টে এ বন্দরের ফিজিক্যাল ওয়ার্ক শুরু হবে। ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে একটি টার্মিনাল এবং ২০২৩ সালের শেষে এক মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এ বন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে মাতারবাড়িতে ১৬ মিটার ড্রাফট ও ২৫০ মিটার চওড়া একটি চ্যানেল নির্মাণের কাজও বর্তমানে চলছে। এ বন্দরের নকশার কাজে পরামর্শক নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ চূড়ান্ত করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
গতকাল সোমবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ‘স্টেকহোল্ডার কনসালটেইশন অন মাতারবাড়ি পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় বক্তারা একথা বলেন ।
কর্মশালায় চবক চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘২০৪১ সালের দিকে বর্তমান প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের কনইটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন টিইইউস থেকে ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন টিইইউস এবং জাহাজের সংখ্যা হবে ৮ হাজার ২০০টি। এ ব্যাপক সংখ্যক জাহাজ এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য আর একটি সমুদ্র বন্দরের বিকল্প নেই।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘ ইতিমধ্যে মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের ফিজিভিলিটি স্টাডি, দুটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং এবং একটি এ প্রাইজল মিশন সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে জাইকার সাথে ঋণ নেগোসিয়েশন কার্যক্রম শুরু হবে। জুনের মধ্যে ডিটেইল ডিজাইনের (ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন) ঋণ চুক্তি করা হবে। ২০২৩ সালের এ বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।’
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) জাফর আলম আরো জানান, মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর জাপানের কাশিমা বন্দর ও নিগাতা (পূর্ব) পোর্টের মডেলের আলোকে নির্মিত হবে। অর্থাৎ সমুদ্রের কিনারায় নয়, চ্যানেল তৈরি মাধ্যমে বন্দরকে সমুদ্রের সাথে যুক্ত করা হবে। এছাড়া চ্যানেলে যাতে পলি জমতে না পারে সে লক্ষ্যে ব্রেক ওয়াটার নির্মাণ করে পানির প্রবাহ রোধ করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, জাপান সরকারের সহায়তায় ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে ভিত্তি প্রস্তর স’াপন করেন। কয়লা আমদানি ও জাহাজ থেকে কয়লা খালাসের জন্য যে চ্যানেল এবং টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে, সে একই চ্যানেল ব্যবহার করে মাতারবাড়িতে একটি সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দেয়। তার প্রেক্ষিতে ১৬ মিটার ড্রাফট এবং ২৫০ মিটার চওড়া একটি চ্যানেল নির্মাণের লক্ষ্যে প্রাক-সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। জাপান সরকারের অর্থায়নে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মাতারবাড়িতে সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হবে এবং এর পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্র বন্দরের উন্নয়ন, আধুনিক কনটেইনারবাহী জাহাজ, খোলাপণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে জেটিতে ভিড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা, চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপ কমানোর সাথে সাথে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রফতানির চাহিদা পূরণ করা এবং মাতারবাড়ি ও মহেশখালী অঞ্চলে গড়ে উঠা শিল্পাঞ্চলগুলোকে পণ্য পরিবহনে সহযোগিতা করাসহ চারটি লক্ষ্য নিয়ে এ বন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কশপে প্রধান অতিথি ছিলেন বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বন্দর মেম্বার হারবার অ্যান্ড মেরিন কমোডর শাহীন রহমান, জাইকা বাংলাদেশ অফিসের রিপ্রেজেনটেইটিভ ওয়াথারু ওসাওয়া, টিম লিডার তাকাসি সিমাদা।
কর্মশালায় মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর নির্মাণ বিষয়ে ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করেন জাফর আলম। এ সময় তিনি বলেন, ‘মাতারবাড়িতে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে এ এলাকাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দর যে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, তার জন্য আর একটি বন্দর প্রয়োজন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাইকা এ বন্দর স’াপনে একটি সার্ভে রিপোর্ট তৈরি করে। তখন থেকে সেখানে চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।’
ভিডিও চিত্রে তিনি দেখান, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের বেশি জাহাজ ভিড়তে পারে না। যার ফলে মাদার ভেসেল বন্দরের জেটিতে আসতে পারে না। ফলে ফিডার জাহাজে করে কনটেইনার আনা নেওয়া করতে হয়। প্রতিদিন ৩৫০০-৩৮০০ টিইইউস আমদানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। অপরদিকে, মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দরে ১৬ মিটার গভীরতার জন্য মাদার ভেসেল ভিড়ার সুযোগ থাকায় এক সাথে ৮ হাজার কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে। একটি জাহাজেই চট্টগ্রাম বন্দরের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এর ফলে এখান থেকে ফিডার ভেসেলের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘ভিশন ২০৪১ অর্জন করতে হলে ১৪ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হবে। ‘পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’, ‘লালদিয়া টার্মিনাল’ ও বে টার্মিনালসহ তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০২৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর মাত্র ৭ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন কোন জায়গা নেই। তাই নতুন একটি সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা জরুরি।’
জাইকা বাংলাদেশ অফিসের রিপ্রেজেনটেইটিভ ওয়াথারু ওসাওয়া বলেন, মাতারবাড়ি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ফলে এখানে সমুদ্র বন্দরও বিশেষ গুরুত্ব পাবে।’