মহুয়া ফুটছে ওই

বিপ্রদাশ বড়ুয়া
কচি পাতাসহ মহুয়া। ছবি : লেখক
কচি পাতাসহ মহুয়া। ছবি : লেখক

বসন্তের শুরুতে মহুয়ার পাতা হলদে হতে শুরু করে। হলদে হতে হতে ঝরে পড়বে। তার আগেই ডালের আগা থেকে মহুয়া ফুলের কুঁড়ি মুখ মেলবে। একই সঙ্গে ডালের শীর্ষভাগে কচি লাল পাতা গজিয়ে উঠবে। এক সঙ্গে অন্তত ২০-৩০টি লম্বাটে কলি ধূসর রঙের আবেশ নিয়ে প্রকাশ পাবে। ফুলের বোঁটা দু’ইঞ্চির মতো, শীর্ষ দেশে এক ইঞ্চির মতো দণ্ডটিও তেমনি সুচারু দর্শনীয়। কলিগুলোর অগ্রভাগের দণ্ডে ততদিনে এক থোকা লাল কচি পাতা অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। কলির নিচের পাতারা বাদামি হতে হতে টুপটাপ ঝরে চলছে। গাছতলার ঝরাপাতায় হাওয়া ছুটে এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে। পাতার শব্দও তেমনি আনন্দ-মৃত্যুপুরীর মতো খড়খড়ে খটখটে। হেঁটে যেতে যেতে পায়ের তলায় তাদের মৃত্যুসঙ্গীত প্রবল হয়ে ওঠে। ওই মরণসঙ্গীত আনন্দের। এই মৃত্যু আনন্দের, এই সঙ্গীত সৌন্দর্যবন্দনার।
ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে একটি একশো বছুরে মধুক বা মহুয়া গাছে এখন ঝরাপাতার সঙ্গীত শেষ হওয়ার দিন গুণছে। দু’একটি অপুষ্ট কলি ঝরে পড়েছে। গাছতলায় স’ায়ী পাকা মঞ্চ ও পাকা এই উঠোনে স্কুল অফিসের নিধু বড়-য়া আবছা ভোরে ঝাড় দেয়। তার সর সর সঙ্গীত আমার ভোরকে মাতাল করে তোলে। ততক্ষণে প্রথম পাখি কাক, দ্বিতীয় পাখি দোয়েল তখন ভোরের ডাকে মাতাল করে আমাকে নিদ্রাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। এরপর শালিকের চড়-ইয়ের পালা। ওদিকে বোধিবৃক্ষে শালিকের কলোনি। ওদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর কী মধুর সুরেলা। ওদিকে নিব্বুতি থেরো টবে জলসেচ দিচ্ছে।
মহুয়ার কলি পুষ্ট হচ্ছে আর সাতদিনের মধ্যে বাদুড় আসবে তীক্ষ্ণ সুরেলা গলায় বকুনি তুলে। খেয়ে-দেয়ে দু’ঘণ্টা মহুয়ার ডালে ঝুলে থেকে বিশ্রাম করবে। গুণে গুণে দু’ঘণ্টা চুপচাপ মৌতাত করবে। আমি তিন তলার সমুখ-বারান্দায় গিয়ে দেখি। অন্ধকারে চোখ দুটি ভূতের মতো জ্বলবে আলোর প্রতিফলন তুলে। ছবিতে ওদের শুধু দুটি চোখ কত তুলেছি! আমার পশ্চিমের বারান্দা তখন মহুয়ার গন্ধ ও বাদুড়ের ক্রেঙ্কার গানে উন্মাতাল। একটি মাত্র মধুক বৃক্ষ আপনার বাগান, ভিটে বা আঙিনা দেবে পাগল করে। আর তখন বসন্ত বাতাস উঠলে কেমন শোনাবে? ওই শব্দ শিল্পসঙ্গীত না শুনে থাকলে সখার গানের মর্মের হৃদয়বিদারও হবে না। গান যে আবেগের সুখাদ্য তাও উপলব্ধিতে ধরা দেবে না। মহুয়া বনে তখন রাত দুপুরে পাপিয়া ‘পিউ কাঁহা’ সঙ্গীত গাইবে। আধো চাঁদে যদি ঘুম ভাঙে তখন আপনি কার কথা ভাববেন! থাক ওসব আপনার মনের মাধুরীতে। মাধবীও তখন কাঁদে মধুরাত ভেবে, তারারা সব আকাশের ওপারে বিরহযাপন করবে। অথবা ‘মাধবী ফুটেছে ওই, তারা সব উঠেছে ওই, বলো আমি কি তোমার নই’ গান সুন্দরখানি! শীতের রাত ঘুমোবার হলে এমন বসন্তের রাত কি হবে? ভোর হবে- কী হবে এমন বসন্ত-বাতাসের রাতের শেষে! সব কথা কি শুধু আমিই বলব? পাঠিকা-পাঠক, আপনার কি কিছু বলার থাকতে নেই! এসব কথা নালিশ করে বলছি না জানুন।

আপনার মন্তব্য লিখুন