মহিউদ্দিন চৌধুরী : ব্যতিক্রমী স্বাধীন রাজনীতিক

আবুল মোমেন
প্রিয় নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্য শোকবইয়ে লিখছেন ভক্তরা -হেলাল সিকদার
প্রিয় নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর জন্য শোকবইয়ে লিখছেন ভক্তরা -হেলাল সিকদার

চট্টগ্রামের প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। লালদিঘির ময়দানকে মাঝখানে রেখে চারদিকের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের ভিড়। এত বড় জানাজা চট্টগ্রামে স্মরণকালে আর হয়নি।
জানাজায় কেবল তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা ছিলেন তা নয়, দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এতে শরিক হয়েছিলেন। জানাজা এবং ম্যাক্স হাসপাতাল ও তাঁর চশমা হিলের বাড়িতে এক নজর এই জননেতার মরদেহ দেখার জন্যে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা ছুটে গিয়েছিলেন। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, নাগরিক সমাজের মানুষ নিজের মত করে হাজির হয়েছিলেন।
সত্যিকার অর্থেই শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় এবং গভীর বেদনায় মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিদায় জানিয়েছে চট্টগ্রামবাসী। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে মন্ত্রী হতে বলেছিলেন, তিনি রাজি হননি, তাঁকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাও তিনি নেননি। মহিউদ্দিন তাঁর শহর ও শহরবাসীকে ছেড়ে কোথাও যেতে রাজি হননি।
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনীতি চর্চার সূচনা হয় ছাত্র-জীবনে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে। সিটি কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসেন, ঘনিষ্ঠতা হয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে, বিশেষভাবে শ্রমিক নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর সাথে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শ্রমিক রাজনীতিতে জড়ান। তবে ছয় দফার আন্দোলন তাঁকে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত করে। মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছেন, আবার বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরে খুনি ও খুনিদের পৃষ্ঠপোষক সরকারের প্রতিরোধে কিছু করার জন্যে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দেশ ত্যাগ করেন। মৌলভী সৈয়দ, মহিউদ্দিন এবং আরো অনেক ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী দেশের টানে দুঃসাহসী ঝুঁকির পথে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে আবার আওয়ামী লীগ যখন ঘুরে দাঁড়াতে থাকে তখন মহিউদ্দিন চৌধুরীও দেশে ফিরে তাঁর প্রিয় চট্টগ্রামে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দ্রুত তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হয়ে ওঠেন। জেল জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। আমার বিবেচনায় মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর দলীয় গণ্ডি ছাপিয়ে ওঠেন ১৯৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ের পরে ত্রাণকাজ ও দুর্গত অসুস্থ মানুষের সেবা দানের মাধ্যমে। বিধ্বস্ত বাঁশখালীতে ত্রাণ দেয়ার পাশাপাশি অসুস্থ, বিশেষত মারাত্মক ডায়েরিয়ার আক্রান্ত মানুষদের শহরে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তিনি। এ সময় মহিউদ্দিন চটগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলকে একটি ফিল্ড হাসপাতালে রূপান্তরিত করে নিজে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা রোগিদের সেবা দিয়ে গেছেন। সেদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে তিনি মানবিক সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আর সেটা তাঁকে আওয়ামী লীগের গণ্ডি এবং দলীয় রাজনীতিবিদের পরিচয় ছাপিয়ে একজন সর্বজনীন মানবকর্মী ও প্রকৃত জননেতায় উন্নীত করে। এই ভাবমূর্তি তিনি কাজের মাধ্যমে অর্জন করেছেন এবং পরবর্তীকালেও কাজের মাধ্যমে তা রক্ষা করেছেন।
১৯৯৪ সনে প্রথমবারের মত মেয়ার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মহিউদ্দিন চৌধুরী বিজয়ী হন এবং এর পরে তিনদফায় একটানা ১৭ বছর মেয়র হিসেবে নগরবাসীর খেদমত করে গেছেন। তিনি নগরীর পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিয়েছিলেন প্রথমেই। তাঁর আমলে চট্টগ্রাম রাজধানী ঢাকার চেয়েও পরিচ্ছন্ন নগরী ছিল। তখন দলের নেতৃবৃন্দ ঢাকার মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য শহরের মেয়রদেরও চট্টগ্রামের মেয়রের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের উপদেশ দিতেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী যারা সমাজে মেথর বা ধাঙর হিসেবে পরিচিতি ছিল, ছিল দলিত অর্থাৎ সমাজে উপেক্ষিত মানুষ তাদের নামকরণ করলেন সেবক, সেবকদের কলোনির উন্নতি ঘটালেন, তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, অবস্থা এমন হয়েছিল যে কর্পোরেশনের সেবক পদে পরবর্তীকালে মুসলমান ও হিন্দু বাঙালিরাও আগ্রহী হয়ে যোগ দিয়েছিলেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্পোরেশনের পরিচালনাধীন হাসপাতাল ও মাতৃসদনের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন করে সাধারণজনের চিকিৎসা ও নারীদের প্রসবকালীন সুব্যবস্থা করে দেন। তিনি একাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপন করেছেন। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মানও বাড়িয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটি সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই স্কুল পরিচালনা করে আসছিল। মহিউদ্দিন চৌধুরী নতুন স্কুল স্থাপন এবং চলমান কিছু বেসরকারি স্কুল অধিগ্রহণ করে এ সংখ্যা শতের ওপরে উন্নীত করেন। এসব স্কুলের অনেকগুলোকে আবার ইন্টারমিডিয়েট কলেজে উন্নীত করেছিলেন। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কখনো অনিয়মের বা স্বজনপ্রীতি দুর্নীতির কথা শোনা যায় নি। তিনি খুঁজে খুঁজে বিভিন্ন সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকদের এসব কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত নগরীর সর্ববৃহৎ বেসরকারি প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যায়ের কথাও উল্লেখ করতে হবে। এখানে মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি সড়ক উন্নয়নেও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছিলেন। মামলা-মোকদ্দমার তোয়াক্কা না করে জনকল্যাণের কথা ভেবে তিনি রাস্তা চওড়া করেছেন, নতুন রাস্তা বানিয়েছেন।
জনস্বার্থে মহিউদ্দিন চৌধুরী কখনো আপোষ করেন নি, ক্ষমতার সাথে তো নয়ই, নিজ দলের সাথেও নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি কোম্পানির হাতে ন্যস্ত করার পরিকল্পনা প্রচার হওয়ার পরপর তিনি তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরিক হন, একসময় এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন সময় দলের বা দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেছেন, আন্দোলন করেছেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ কর্মময় রাজনৈতিক জীবনে প্রমাণ করেছেন যে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন। তাঁর সাহস ও জেদ, তাঁর কর্ম ও প্রাণশক্তি, তাঁর মানুষ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রবল, তাঁর জেদও প্রবল, হয়ত অনেক সময় অপর পক্ষের বক্তব্য, বয়স, প্রস্তাবের বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে বিবেচনায় নিতে পারতেন না। তবে তাঁর রাগ ও জেদ দ্রুতই পড়ে যেত, বৃহত্তর কল্যাণের কথাই প্রাধান্য পেত তাঁর বিবেচনা ও কাজে। আর সে কারণেই তাঁর মৃত্যু চট্টগ্রামবাসীকে এভাবে নাড়া দিয়েছে, এমন একটা শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে বাস করেও জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃত এক নেতা। এখানে থেকেও প্রতি বছর তিনই টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় আয়োজন করতেন। তাঁর মধ্যে নিজেকে ছাপিয়ে ওঠার, সমাজের ক্ষুদ্রতার গণ্ডি ভাঙার একটা প্রেরণা কাজ করত। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ মানুষ হলেও অসাম্প্রদায়িক মানবিকতায় বিশ্বাস করতেন। মেয়র হজ্ব কাফেলা তাঁর এক ব্যতিক্রমী কাজ। ক্ষমতা ত্যাগ করার পরও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বয়স্ক পুণ্যার্থীদের সন্তুষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি হিন্দু-বৌদ্ধদের জন্যেও তীর্থযাত্রার ব্যবস্থা চালু করেছেন তিনি।
আজ যখন রাজনীতিতে মূলত ক্ষমতার মোহে ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়ছে কিংবা রাজনীতিবিদরা নিজেরাও ব্যবসায়ী বা তদ্বিরকারীতে রূপান্তরিত হয়ে আখের গোছানোর পথে হাঁটছেন তখন একজন মহিউদ্দিন চৌধুরী এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বস্তুত রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের একটি ধারার অবসান হল। যাঁরা রাজপথে শ্লোগান দিয়ে, মিছিল করে, রাত জেগে পথে পথে পোস্টার লাগিয়ে কিংবা দিনে রাতে পথে-বাজারে মাইকিং করে, অসংখ্য পথসভা করে নিজেদের গড়ে তুলেছেন সেই রাজনীতিবিদ আজ আর সম্মুখ কাতারে নেই। উড়ে এসে জুড়ে-বসা ধনী রাজনীতিবিদদের ভিড়ে মহিউদ্দিন এক ব্যতিক্রম। তাঁর শক্তি নিজের রাজনৈতিক জীবন আর জনসমর্থন। ফলে তিনি দলের নেতা, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ রাঙানি, ধনীর অর্থবিত্তের মোহ কিছুতেই দমেন নি, আচ্ছন্ন হন নি। আদর্শ ও দল, নেতা ও সংগঠনকে কখনো ত্যাগ না করেও তিনি নিজেকে কখনো কোনো অন্যায়ের বা অন্ধ নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি হতে দেন নি। সংগঠন ও আদর্শে অবিচল থেকেও মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন স্বাধীন মানুষ, মাথা উঁচু করেই চলেছেন বরাবর।
মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। সেটা তাঁর জীবনে যেমন সত্য ছিল তেমনি সত্য হয়েছে মৃত্যুতেও। এমন জনসমাগম কোনো শেষকৃত্যে চট্টগ্রামের মানুষ দেখেনি। এই মৃত্যু যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে তাও যে বিশাল সেকথাও আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। তাঁর শূন্যতা কি আওয়ামী লীগে কি চট্টগ্রামের রাজনীতি ও নাগরিকজীবনে কি দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে সহজে পূরণ হওয়ার নয়।