মশিহাটি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাদু

সাঈদুল আরেফীন
Boy-and-girl-looking-at-big-tree

কালিগঞ্জ উপজেলার মশিহাটি গ্রাম। ঝিনাইদহ সদর থেকে ম্যালা দূরে। রাস্তার দু’পাশে বিলের পানিতে টইটুম্বুর। আকাশের চারিদিকে শুধুই টুকরো টুকরো সাদা মেঘের আনাগোনা। সকাল থেকেই রোদের ঝিকিমিকি আর তাপে পুড়ছে সারা গ্রামের মাঠ ঘাট। ছুটির দিন বলেই কথা। রমজান ভোর বেলা থেকেই মার সাথে বায়না ধরেছে, ছোট বোন বন্যাকে নিয়ে গ্রাম ঘুরে বেড়াবে। বলতে না বলতেই নাশতা করেই দু’ভাই বোন হাত ধরাধরি করে দে ছুট। দু’দিকে সবুজের সারি। কোনখানে পাটের আঁশ ছড়াচ্ছে লোকজন। আবার দু’পাশে পাট শুকাতে দেয়া হয়েছে। ক্ষেত থেকে তুলে আনা পাট গাছ ডোবা জলাশয়ে পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে মাটি খড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। এইসব দৃশ্য দেখে পিচঢালা পথে হাঁটতে হাঁটতে বন্যা রমজানকে বলে ওঠে, মশিহাটি গিরামটা আর আগের মতো নাই রে ভাইয়া! আমরা বড় হতি না হতি কী সোন্দর গিরামটা সুন্দর হয়ে যাচ্ছেনে। আরে রাখ তোর গিরাম সোন্দর হইয়ে যাছছে। সবকিছুই হইয়েছে আমাগের দাদুর জন্যি। দাদু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিইলো বইলে। হেই জন্যিই এই রাস্তাডা পাকা হইয়ে গিইয়েছে। আর রাস্তাডার নাম হইয়েছে মুক্তিযোদ্ধা শামছুর রহমান সড়ক। বুঝতি পারতিছো এখন তুমি ? এই রাস্তা ধইরে হাইটতি হাইটতি তোর কিরাম লাইগতিছে। আমার তো এত্তো ভালা লাইগতিছে, কেবল দাদুর কতাই মইনে পড়ি যাছছে। দাদুর জন্যিই আইজ আমাগের অনেক কিছু হইতি লাইগছে। বাড়িডাও দাদু পাকা কইরি গিলো। সুন্দর একখান বাড়ি হইয়েছে। তুমার কিমুন লাইগতিছে ভাইয়া? সিইডা কী আর কইতি আছে?
দুই ভাইবোন পাকা সড়ক পেরিয়ে কতদূর যায়। আর দাদুর স্মৃতিগুলো স্মরণ করি যাচ্ছিলো। আজ যেনো ওরা ইচ্ছে পোষণ করেছে নিজেদের গ্রামই নয় পাশের গ্রামগুলোও ওরা ঘুরে বেড়াবে। ওরা হাঁটছে তো হাঁটছে। ওদেরই পাশ দিয়ে ভটভটি (শ্যালো মেশিনের ইঞ্জিন দিয়ে বানানো মানুষবাহী গাড়ি) চলে গেলো একখান। কিছুক্ষণ পরে গেলো ইজিবাইক। গ্রাম তো আর গ্রাম নেই। সবখানে অন্যরকম উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে গেছে। রমজান আর বন্যা এমনভাবে হাঁটা শুরু করলো যে থামতেই চায় না। কখন যে পাকা পথ পেরিয়ে ওরা পাশের গ্রামের মেঠো পথে ঢুকে গেছে খেয়ালই করতে পারেনি।
ভাইয়া দেখতি পারিছো কী সোন্দর শাপলা ফুটিছে বাওড়ে। মাছদিয়ার বাওড়ে সবাই মাছ ধরতিছে ছোট ছোট মাছ সব। বড়ো সোন্দর লাগতিছে। ওহ! ভাই তুমি আমারে একখান শাপলা তুইলে এনে দেও দিনি। যেই বলা সেই কাজ, ছোট বোনটার জন্য রমজান আর দেরি করেনি। বিল থেকে শাপলা তুলেই তার হাতে গুজে দিলো। শাপলা পেয়ে তো বন্যার খুশি আর ধরে রাখে কে? আবারও দুই ভাইবোন হাঁটতে লাগলো, পাশের গ্রাম পেরিয়ে ওরা রহমতপুরে এসে থামে। ওরা একে একে পাশের মুরাদগড়, রহমতপুর কাউদিয়া গ্রামের সবুজ দৃশ্য দেখতে দেখতে ধানক্ষেত আর কাশফুলের কাছে গিয়ে খুব মজা করে। কাশফুল আর কচুরি ফুল দেখাতে দেখাতে রমজান এবার বন্যাকে বলে, তুই বুঝিছিস ক্যান এইখানি তুরে নিইয়ে আইস্যে ঘুইরে ঘুইরে দেহাছছি। আমার তো কলেজে ভরতি হইতি হবি। সেই জন্যিই তুরে আমাগের আশপাশের গিরামের সবকিছুই দেহাতি চাছ্‌ছি।
এবার ইজিবাইকে ওঠে দুই ভাইবোন। বারোবাজারের হাট পেরিয়ে তাহেরপুর সড়ক ধরে গাড়ি এসে থামে সাতগাছিয়া মসজিদে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় সংরক্ষিত এই গায়েবী মসজিদগুলোতে গিয়ে একে একে গলাকাটা মসজিদ, সাতগাছিয়া পয়ত্রিশ গম্বুজ গায়েবী মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, পীরপুকুর মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, মনোহর মসজিদগুলো বন্যাকে দেখাতে পেরে পরিতৃপ্ত হয় রমজান। এবার রমজানের মধ্যেই চোখে মুখে এক ধরনের খুশির বার্তা বয়ে যায়। ঐতিহাসিক বারোবাজারের এই গায়েবী মসজিদের আশেপাশের মানুষ আমরা, রমজান বন্যাকে বোঝাতে চায়। আর বলে, আমাগের গিরাম আমাগের ইতিহাস আমরা যদি জানতি না পারি তাইলে পইরে এর চাইতি লইজ্জার আমাগের আর কিছুই নাই। এই জন্যিই বইন্যা তুরে আমি সবকিছু্‌ই দেহাতি চা্‌ইছি। এটা শুনেই বন্যা বলে ওঠে, অনেক বেলা হইই গিলো, চলো এইবার আমরা বাড়ি ফিরতি লাগি। মা, দাদি জানি আবার ছিন্তা করতি লাইগতিছে।
দুই ভাইবোনের ইতিহাস আর প্রকৃতির সাথে ঘুরে বেড়ানোর অদ্ভুত এইসব ব্যাপার আজকের নতুন নয়। এর আগেও দুই ভাইবোন বিভিন্ন মৌসুমে এভাবে ঘুরে বেড়ায় প্রকৃতি দেখে। ইতিহাসের সাথে পরিচিতি ঘটায় নিজেদের। সেই থেকে শীত মৌসুম এলে নিজেদের বাড়ির পাশেই বিস্তীর্ণ বিলে প্রতিদিন বিকেলে অতিথি পাখি দেখা তাদের নিত্য সখের ব্যাপার হয়ে যায়। আজও তারা কিছু কিছু গ্রামে বড়ো বড়ো বিলের পাশে ছুটে যায় অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্যে। বন্যা ও রমজানের গ্রাম দর্শনের অদ্ভুত ব্যাপারটা নতুন নয়, তাদের দাদু বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শামছুর রহমানই তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন এইসব। রমজান বারবার দাদুর কথাটাই স্মরণ করিয়ে দেয় বন্যাকে। ওদের দাদু বলতো, শহরের শিশুদের চাইতে ওরা সৌভাগ্যবান। ইট পাথরের চাপায় আজকাল শহুরে শিশুরা বন্দী জীবন যাপন করে। ওরা ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। সবুজ দেখতে পারে না। কাদা মাটি স্বচ্ছ জল কোনটার স্পর্শ নিতে পারে না। গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে দাদুর সেই সব কথা স্মরণ করে দুই ভাইবোন আবার ফিরে আসে নিজগ্রাম মশিহাটির বাড়ির আঙিনায়। বন্যাকে শাপলা হাতে দেখে দাদুমণি হাসতে হাসতে বলে, রমজান তুমি তাইলি তুমার দাদুর কতা মইনে কইরে গ্রাম ঘুইরে বেড়াইচছো।

আপনার মন্তব্য লিখুন