মন্দাতেও আস্থা অটল

নগরীর পাঠানটুলী সড়কে স্টিল আসবাবপত্রের দোকান-সুপ্রভাত

নগরীর পাঠানটুলী সড়কে স্টিল আসবাবপত্রের দোকান-সুপ্রভাত
নগরীর পাঠানটুলী সড়কে স্টিল আসবাবপত্রের দোকান-সুপ্রভাত
নগরীর পাঠানটুলী সড়কের স্টিল আসবাব ব্যবসায়ের বয়স ৪০ বছর। বর্তমান ২১ শতকে ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতায় ব্যবসায়ে চলছে মন্দাবস্থা। তবু ব্যবসায়ীরা আশায় রয়েছেন, সময়ের পরিবর্তনেও নিশ্চয়ই টিকে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা।
৮০’র দশক থেকে স্টিল আলমারির জন্য একনামে পরিচিত নগরীর পাঠানটুলী সড়ক। স্টিলের তৈরি টেকসই আলমারি, দোকানের শার্টার, নালা, পাইপ, দরজা, কেবিনেট, ওয়ারড্রোব তৈরি হয় এখানে। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের স্টিলের চাহিদা মেটানো হচ্ছে এ এলাকা থেকে।
পাকিস্তান আমলে হাতেগোনা কয়েকটি দোকান দিয়ে শুরু হয় এ ব্যবসার। বর্তমানে মোট ৩শ’ দোকান ও কারখানা রয়েছে পাঠানটুলী সড়কে। কারখানাগুলো অবস্থিত মোগলটুলী এলাকায়। বর্তমানে অবস্থিত স্টিল শিট ও আলমারির দোকানগুলো ধারাবাহিকভাবে ৩৫, কোনোটি ২০ বছর ধরে একই স্থানে ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রায় আড়াই যুগ ধরে পাঠানটুলী সড়ক স্টিল আসবাব ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।
কথা হয় স্টিল শিটের ব্যবসায়ী জিলানী স্টিল এজেন্সির প্রোপ্রাইটর মো.কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। প্রবীণ এ ব্যবসায়ী জানান, জাপান, কোরিয়া থেকে আমদানি হয় স্টিল শিট। চট্টগ্রাম ছাড়া ঢাকার ধোলাই খালও স্টিলের আলমারির জন্য প্রসিদ্ধ। শিট থেকেই তৈরি হয় আলমারিসহ অন্যান্য পণ্য। স্টিলের যাবতীয় পণ্যের মধ্যে আলমারির চাহিদাই বেশি। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে স্টিল ব্যবসাতেও। ফলে অনেকে ইতোমধ্যে ব্যবসা পরিবর্তন করে ফেলেছেন।
মো. কামাল উদ্দিন সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের স্টিল ব্যবসা বেড়েছে। পাঠানটুলী থেকে বহদ্দারহাট, মাদারবাড়ি থেকে শুরু করে মফস্বলেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। আগে প্রতি কেজি শিটের দাম ছিলো ৮০ হাজার টাকা। এখন প্রায় ২০ হাজার টাকা কমে গেছে। ব্যবসায়ে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি।’
স্টিলের আলমারির নামী ব্র্যান্ড, অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যবসায় প্রচারের অভাব, কাঠ ও প্লাস্টিক সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বর্তমানে মন্দাবস্থায় রয়েছে স্টিল আলমারির ব্যবসা। ব্যবসায়ীরা জানান, সম্মিলিত কোনো উদ্যোগ গড়ে না ওঠায় আধুনিকীকরণ হচ্ছে না স্টিল আসবাব ব্যবসায়ের।
ভারী ওজন, বেশি দাম :
ওজনে ভারী হওয়ার কারণে ক্রেতারা কিনতে চায় না স্টিলের পণ্য। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে স্টিল আলমারিগুলো ওজনে হালকা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একটি স্টিল আলমারির ওজন সর্বনিম্ন ৫০ কেজি। তবু কৃত্রিম কাঠের হালকা আসবাব বিক্রি, ব্র্যান্ডের স্টিল আলমারির বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় পাঠানটুলীতেও বিক্রি কমে গেছে।
গড়ে উঠেনি স্টিল আলমারির ব্র্যান্ড :
পাঠানটুলী এলাকার স্টিল আসবাব ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ‘ব্র্যান্ডের দোকানগুলোর শোরুম রয়েছে। পাঠানটুলীর স্টিল আলমারির ব্যবসা ঐতিহ্যবাহী হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো শোরুম গড়ে উঠেনি। তাদের তৈরি স্টিল আলমারির প্রযুক্তি, ডিজাইন, ফিনিশিং অনেক উন্নত মানের। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এ সম্পর্কিত কোনো প্রশিক্ষণ নেই।’
জিলানী স্টিল এজেন্সির পরিচালক নিজাম উদ্দিন সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ব্র্যান্ডের দোকানে স্টিল আলমারিগুলো তৈরি হয় অটোমেটিক মেশিনে। ব্র্যান্ডের আলমারির ডিজাইন আধুনিক। আর এখানে আমরাই মালিক, আমরাই ডিজাইনার।’ একমাত্র ব্র্যান্ড করলেই স্টিল ব্যবসা টিকে থাকবে বলে মনে করেন তরুণ এ ব্যবসায়ী।
সড়ক সম্প্রসারণে স্টিল ব্যবসার ক্ষতি
২০১৩ সালে পাঠানটুলী সড়ক সম্প্রসারণে কাজ সম্পন্ন হয়। এককালের সরু এ রাস্তাটি বর্তমানে প্রায় ২০ ফিট প্রশস্ত। কিন্তু এতে প্রায় ৪০টি দোকান বিলীন হয়ে যায়। বিদ্যমান দোকানগুলোর আকারও কমে যায়। ফলে ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে বলেই মন্তব্য অনেক ব্যবসায়ীর। স্টিল ফার্নিচার ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘সড়ক সম্প্রসারণের আগে ভেবেছিলাম ব্যবসায়ের লাভ হবে। ক্রেতা বাড়বে। কিন্তু সড়ক সম্প্রসারণের কারণে লাভের চেয়ে বরং ক্ষতিই হয়েছে। দোকানের আকার ছোট হয়েছে। মালামাল দোকানে রাখা যায় না। ক্রেতারা গোডাউনে গিয়ে পণ্য দেখতে চান না।’
পাঠানটুলীতে এ ঐতিহ্যবাহী স্টিল আসবাবপত্র ব্যবসায়ী ও কারিগরদের রয়েছে রয়েছে দুটি সমিতি; চট্টগ্রাম স্টিল ফার্নিচার মালিক সমিতি ও স্টিল ফার্নিচার কারিগর ঐক্য। কারিগর ও অন্যান্য স্টিল আসবাব ব্যবসায়ীদের দাবি, সমিতির থেকে ব্যবসায়ে আধুনিকীকরণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সড়ক সম্প্রসারণের পর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু সড়ক সম্প্রসারণের পরও সমিতি থেকে কোনো কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম স্টিল ফার্নিচার মালিক সমিতির সভাপতি মনির আহমদ সুপ্রভাতকে বলেন, ‘শুধু সড়ক সম্প্রসারণ নয়, নির্মাণাধীন কদমতলী ফ্লাইওভারের জন্যও পাঠানটুলী এলাকার স্টিল আসবাব ব্যবসায়ের ক্ষতি হয়েছে। ফ্লাইওভারের কারণে গাড়ি কম আসা যাওয়া করে। তাই ক্রেতা সমাগমও কম।’
তিনি বলেন, ‘কদমতলী ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আপাতত স্টিল ব্যবসায়ের জন্য কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে এ ধরনের ব্যবসায়ে শো-রুম প্রয়োজন। পাঠানটুলীতে জায়গা কম। এখানে শো-রুম করা সম্ভব নয়।’
কাঠের আধুনিক আসবাবপত্র দেখতে সুন্দর হলেও টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার বিশ্বাস, কাঠ, প্লাস্টিক উড, প্লাস্টিকের আসবাবপত্রের বদলে মানুষ আবার টেকসই স্টিলের আসবাব কিনবে। তিনি বলেন, কাঠে স্বল্প পরিমাণ হলেও পানি থাকে। ঋতুর পরিবর্তনে কাঠের আসবাবপত্রে কাপড় বা অন্যান্য জিনিস রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু স্টিল সর্বদা টেকসই। পাঠানটুলীতে দামও কম। ব্র্যান্ডের দোকানে দাম বেশি নেয়। তাই মানুষকে এখানেই আসতে হবে।’ পাঠানটুলী স্টিল আসবাব ব্যবসায়ীদের আশা, মন্দা কেটে গেলে হয়তো আবারও ফিরে আসবে স্টিল আসবাবের সোনালী সময়।

আপনার মন্তব্য লিখুন