মধ্যপ্রাচ্যে নাটের গুরু ইসরায়েল

হোসাইন আনোয়ার

সম্ভবত আল-জাজিরা নেটওয়ার্কটি এখন সবচাইতে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যার কারণে সৌদি আরব, বাহরাইন, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ইসরায়েলও চাইছে আল-জাজিরা যেন বন্ধ রাখা হয়। ইসরায়েল আল-জাজিরাকে পছন্দ করছে না তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, কিন্তু সৌদিআরব, বাহরাইন, মিশর কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কি ক্ষতি করছে আল-জাজিরা তা কিন্তু বলছে না তারা। মনে হয় ইসরায়েলের ফাঁদে পা রেখেই সৌদি আরব তাদের ঘোষিত ১৩ দফায় আল-জাজিরাকে বন্ধের প্রস্তাব রেখেছিল। এখন সৌদি আরবের মতো ইসরায়েল আল-জাজিরার বিরুদ্ধে দাঁড়ালো। এতে সে জিনিসটা স্পষ্ট হলো, তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে নাটের গুরু হচ্ছে ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যে যত সংঘাত সংকট সবার মূলে রয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েল মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভেদ জিইয়ে রেখে পুরো ফিলিস্তিনকে গিলে খাবার এক অশুভ তৎপরতায় লিপ্ত।
ফিলিস্তিনের ইতিহাস বহু পুরোনো ইতিহাস। পবিত্র কোরআন, বাইবেল ও হিব্র বাইবেলেও (তাওরাত) এ অঞ্চল সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। ছয় শতকের পর ৪০০ বছর খলিফায়ে রাশেদিনের শাসন ছিল এ অঞ্চলে। প্রায় তিন হাজার বছর আগে এ অঞ্চলটিতে ছিল ইহুদি পৌত্তলিকেরা। পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম প্রভাব বিস্তার লাভ করলে এ অঞ্চলের ইহুদিরা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন আরব ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস বলে, ৭০৫ সালে সংস্কার করা হয় মুসলমানদের অন্যতম পবিত্রতম স্থান বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসা। প্রথম ক্রুসেডের পর খ্রিস্টানরা কিছুকাল এ অঞ্চল ধরে রাখলেও ১২ শতকে আবার মুসলমানদের অধীনে চলে আসে এ অঞ্চল। সেই থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে। আর সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল মুসলমান। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিনের একটি বাসস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা চালায় ফিলিস্তিনিদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও। ব্রিটিশদের সমর্থনে সেখানে ইহুদিরা বসতি স্থাপন করে। এরপর থেকেই শুরু হয় ইহুদিদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষ।
১৯২০, ২১, ২৮, ২৯ ও ৩৬ সালে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। এতে বহু মুসলমান মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করে প্রস্তাব পাশ করলে ১৯৪৭ সালের ১৪ মে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এরপর আমেরিকা ও ব্রিটেনের আস্কারা পেয়ে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিরোধী আগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হয়। ষাটের দশকে ইসরায়েল পারমাণবিক বোমার মালিক হয়ে যায়। ফিলিস্তিনিদের উপর নির্যাতন ও দখলদারিত্ব চলতে থাকে সমানভাবে।
ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। ১৯৬৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ইয়াসির আরাফাত ছিলেন এ সংগঠনটির চেয়ারম্যান। ১৯৯৩ সালে ইসরায়েলের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের সঙ্গে পিএলওর চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে অসলো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার রেফারি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর আইজ্যাক রবিন বলেছিলেন-ঞড় ঊাবৎু ঃযরহম ঃযবৎব রং ধ ংবধংড়হ ধহফ ধ ঃরসব ঃড় বাবৎু ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ঁহফবৎ যবধাবহ. অ ঃরসব ঃড় নব নড়ৎহ ধহফ ধ ঃরসব ঃড় ফরব, ধ ঃরসব ঃড় শরষষ ধহফ ধ ঃরসব ঃড় যবধষ…., ধ ঃরসব ড়ভ ধিৎ ধহফ ধ ঃরসব ড়ভ ঢ়বধপব. ঞযব ঃরসব ভড়ৎ ঢ়বধপব যধং পড়সব. (সূত্র : বিল ক্লিনটন, মাইলাইফ, পৃ-৫৪৪) তখনকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে রবিন হয়তো ভেবেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরোবিশ্বে শান্তির জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ইসরায়েল-প্যালেস্টাইনি সংকট সমাধানে এটাই বুঝি উপযুক্ত সময়। বিল ক্লিনটনও তখন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে মাত্র ক্ষমতায় এসেছেন। আশা করা গিয়েছিল তাঁর ক্যারিশমা, জনপ্রিয়তা এবং মধ্যপন্থানীতির কারণে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিকে একটা চুড়ান্ত মীমাংসায় হয়তো পৌঁছানো যাবে। তখন সব পক্ষই মোটামুটি একমত হয়েছিলেন যে, ইসরায়েলের পাশাপাশি প্যালেস্টাইনও একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে। এবং তাতে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে ইসরায়েলের যে সীমান্ত সীমানা ছিল, সেটাই হবে দুই রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সীমান্ত।
কিন্তু অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরের মাথায় এক ইহুদি চরমপন্থির গুলিতে রবিন নিহত হওয়ায় দৃশ্যপট পাল্টে যায়। এরপর ইহুদি জাতীয়তাবাদী এরিয়েল শ্যারন ক্ষমতায় আসেন এবং বর্তমানে ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের এই দুই নেতা পশ্চিম তীরে ব্যাপকহারে নতুন নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করে চলেছেন। যাতে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমান্ত মুছে সম্পূর্ণ জেরুজালেমসহ পশ্চিমতীরে আরও ব্যাপক ভূমি নিজেদের দখলে এনে আরব বিশ্বকে এমন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র উপহার দেয়া, যার হাত-পা-ভাঙা। বিকলাঙ্গ, নীরব, নিথর, অকার্যকর অর্ধমৃত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা উপহার দেয়া যার জনগণ কোনোদিনই ইসরায়েলের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাড়া না পাওয়ায় ইসরায়েল জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তর করতে পারেনি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলি আগ্রাসীবাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ইসরায়েল পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এবং কৌশলে (মুসলমানদের সঙ্গে মুসলমানদের) সৌদি আরবকে কাতারের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে ফিলিস্তিনিদের উপর তার অত্যাচারের মাত্রা ও আগ্রাসী তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কর্তৃক পশ্চিমতীরে আরও নতুন নতুন বসতি স্থাপনের যুদ্ধাংদেহী ঘোষণা দেখে মনে হচ্ছে বর্তমান সময় (ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার গদিতে থাকতে থাকতেই) তাকেই ইসরায়েল হয়তো তাদের চরম লক্ষ্য অর্জনের উপযুক্ত সময় হিসেবে মনে করছে।সেই সঙ্গে সৌদি আরবের সাহায্য নিয়ে ইসরায়েল আল-জাজিরাকে বন্ধ করে দিতে চাইছে।
একথা সত্য যে, কাতার সৌদি আরবের সঙ্গে গালফ সহযোগিতা কাউন্সিলের সদস্য হলেও বরাবরই তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইরান এবং শক্তিশালী দুই সংগঠন লেবাননের হিজবুল্লাহ্‌্‌ ও প্যালেস্টাইনের হামাসের সঙ্গে, যারা সব সময় ইসরায়েলের সকল দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনে ইসরায়েলি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরছে। তারা একই সঙ্গে ইরান ও সিরিয়ার আসাদের পক্ষে থেকে আসাদ বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আল-জাজিরার অপরাধ আল-জাজিরা হিজবুল্লাহ ও হামাসের পক্ষে সারাবিশ্বে এদের কার্যক্রম প্রচার করছে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখছে। আল-জাজিরা আদর্শগতভাবে ইসরায়েল বিরোধী অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। যা সৌদি সরকার বা তার কোনো গণমাধ্যম এ কাজটি করছে না। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, সৌদি জোটের ১৩ দফার মূল লক্ষ্য হল, হিজবুল্লাহ ও হামাসের উপর থেকে কাতারের সমর্থন সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা, ইরান থেকে কাতারকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং আল-জাজিরাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া। এটা করা হলে খুব দ্রুত প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলের উদ্দেশে সফল হওয়ার পথ সুগম হয়।
আমেরিকার বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদে আগামী চার বছরের মধ্যে ইসরায়েল তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য পূরণে পশ্চিম তীরে আরও চার থেকে ছয় লাখ নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করে ফেলবে। তাতে পশ্চিম তীরে অর্ধেকের বেশি জায়গা তাদের দখলে চলে আসবে। তখন দুই রাষ্ট্রে (প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল) সীমান্ত নির্ধারণের বেলায় নতুন বাস্তবতার জন্ম নেবে। তখন ইসরায়েল সেই বাস্তবতার পক্ষে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। আর এ কাজে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যে পূর্ণ সমর্থন দেবেন, তার ইঙ্গিত ইসরায়েলকে ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছেন।

লেখক : কলামিস্ট