মঙ্গলবারের হাট

শামীম শিকদার
1

দায়িত্বের টানে হলেও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাতের কাজগুলো গুছিয়ে মাঠের কাজে সময় দিতে হয় আদিবের দাদুকে। ভোরে যখন আদিবের দাদু ঘুম থেকে উঠে হাতের কাজগুলো গুছিয়ে মাঠের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে তখন আদিব ঘুম ঘুম চোখে হাত বুলিয়ে দাদু দাদু বলে ডাকতে শুরু করে। সে প্রায় সময় দাদুর সাথে মাঠে যায়। কোন কাজ না করতে পারলেও এক পাশে বসে অনেকটা মনোযোগ সহকারে দাদুর কাজ করা দেখবে। দাদুর কাজ বলতে জমিতে সেচ দেওয়া, হাল চাষ করা, আগাছা পরিষ্কার করা, সার দেওয়া, বীজ বপন করা । এসব কাজে দাদুর নিত্যসঙ্গী হয় আদিব। দাদু যখন জমি চাষ করে তখন বাড়ি থেকে দৌড়ে দাদুর জন্য তৈরি পান নিয়ে মাঠে যাবে সে। জমির উপর পান হাতে আদিবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চাষ বন্ধ করে তার হাত থেকে পান নিয়ে চিবাতে চিবাতে নানান ধরনের গল্প বলবে। দাদুর মুখে গল্প শুনতে আদিবের বেশ ভালো লাগে। বিশেষ করে ভূত-প্রেতের গল্প। সন্ধ্যায় যখন তার ঘর ছেড়ে দাদুর ঘরে বসে ভূত-প্রেতের গল্প শুনে আদিব, তখন দাদুর খুব কাছে গিয়ে জড়সড়ো হয়ে বসে সে। গল্পের আকর্ষণীয় কিছু দিক সে তার দাদুকে বার বার জিঙ্গেস করবে। দাদু তার কথায় বিরক্ত না হয়ে দ্বিতীয়বার আরো বেশি আকর্ষণীয়ভাবে উপস’াপন করে তার আগ্রহের বিষয়গুলো।
আদিব বসুন্ধরা কিন্টারগার্টেন স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। সকাল সকাল স্কুলে চলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে বিকালে দাদুর সাথে সময় দেয়। আর যে দিন স্কুল বন্ধ থাকে সেদিন সারাক্ষণ দাদুর সাথে সময় কাটে তার। তার কাছে মনে হয় মা-বাবার চেয়ে তার দাদু বেশি আদর করে তাকে। বাবা বাড়ির বাইরে থাকে বলে তার দাদুকে বাড়ির কাজে সময় দিতে হয়। সাথে থাকে আদিব। ধানক্ষেত থেকে শুরু করে সকল প্রকার সবজিক্ষেত করে আদিবের দাদু। বাড়িতে খাবারের জন্য রেখে অবশিষ্ট যা থাকে তা বাজারে বিক্রি করে দেয় আদিব ও তার দাদু।
প্রতি সাপ্তাহে একদিন হাট বসে তাদের বাড়ির কাছে। সে হাটেই তারা দুজন যায় সবজি বিক্রি করার জন্য। দুপুরের খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে এক দু জন করে হাটে আসতে শুরু করে। যে সবার আগে আসে সে সবার আগে প্রথম সাড়িতে বসে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সাজানো হয় দোকানগুলো। আদিব স্কুল থেকে এসে দুপুরের খাবর খেয়ে দাদুর সঙ্গী হয় সে। তাদের বাড়ির পাশে প্রতি সপ্তাহে মঙ্গলবার হাট বসে। আদিব এ বারটির কথা কখনই ভুলে না কারণ, সে জানে তার দাদু হাটে যাবে আর তার দাদুর সাথে হাটে যেতে তার বেশ ভালো লাগে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামগ্রী নিয়ে হাটে আসে। খোলা আকাশের নিচে হাট বসার দৃশ্য যেন অন্যরকম একটি অনুভূতি। যারা হাটে আসে তাদের মধ্য থেকে অধিকাংশ মানুষের বয়সই তার দাদুর মতো। সিংহভাগ মানুষের মুখে থাকে তার দাদুর মুখের মতো পাকা দাড়ি। আদিবের দাদু সবজি বিক্রি করার সময় তাকে পাশেই বসিয়ে রাখে। সবজি বিক্রি করে যা টাকা পাওয়া যায় সব আদিবের হাতে দেয় তার দাদু। টাকার মালিক সে না থাকলেও খুশিতে তার মন ভরে যায়। যখন ক্রেতার তেমন চাপ থাকে না তখন পাশের দোকান থেকে আদিবের পছন্দের জিনিসগুলো এনে দেবে তার হাতে। আদিবের মা শত বারণ করলেও হাটে আসার বায়না কোনভাবেই কমে না তার। দাদুর আগে হেঁটে সে চলে আসবে। শুধুৃ বিক্রি করেই শেষ নয় তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তারা মঙ্গলবারের হাট থেকেই তারা কিনে আনবে। তাদের গ্রামের মধ্যে মঙ্গলবারের হাটটিই একটি অন্যতম হাট। সবজি ও মসলার জন্য এ হাটটি অন্যতম। গ্রামের যার ক্ষেতে যা ফসল চাষ করে তা মঙ্গলবারে বিক্রির জন্য রেখে দেয় তারা। সড়কের দুই পাশে সাজানো হয় দোকানিদের দোকান। যারা দোকান সাজিয়ে বসে তার মধ্য থেকে অধিকাংশ মানুষই কৃষক। যারা নিয়মিত দোকানি হিসেবে দোকান সাজিয়ে বসে তারা শুধু মঙ্গলবারের হাট নয় আশেপাশের গ্রামের প্রতিটি হাটেই যায় তাদের পণ্যসামগ্রী বিক্রি করার জন্য। যারা শুধু মঙ্গলবারের হাটে আসে তারা আদিবের দাদুর মতোই বিক্রেতা। গ্রামের হাটগুলোর দিকে তাকালে প্রাচীন যুগের বিনিময় প্রথার চিত্রটি ফুটে উঠে। খোলা আকাশের নিচে বট গাছের ছায়ায় যখন সবাই যার যার মতো গুছিয়ে বসে তখন সে দৃশ্যটি আদিবের বেশ ভালো লাগে। অচেনা মানুষের মুখ, নতুন নতুন তাজা সবজি ও মানুষের সমাগম যেন আরো বেশি করে আকৃষ্ট করে তাকে।
যদিও আগের মতো তেমন জমে না তাদের গ্রামের হাট তবু সে হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতা হয়ে অনেকেই আসে। আদিবের বাবা যেদিন বাড়িতে আসে সে দিন তার বাবার সাথে হাটে আসবে সে। বাবা তাকে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র কিনে দেবে। হাটের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যেতে যেতে তার পুরো হাত ভরে যাবে। বাবা যদি বাড়িতে না থাকে তবে তার দাদুর সাথে প্রতি হাটের দিন হাটে আসবে সে……..।