ভয়ের সংস্কৃতি ও জননিরাপত্তা

শাহাবউদ্দিন মাহমুদ

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের স্বাধীনতার যেমন ক্রমেই উন্মেষ ঘটেছে, তেমনি নিরাপত্তার ঘাটতি, ভয়ের সংস্কৃতি ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা’, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ অবশেষে ব্যক্তি বা মানব নিরাপত্তায় নিমগ্ন হয়েছে মানুষের কার্যবিধি। তাই আমরা দেখতে পাই ১৯৯০ সালে জাতিসঙ্ঘ মানুষের ‘মর্যাদার সাথে বসবাস’কে নিশ্চিত করতে চেয়েছে। ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসঙ্ঘ প্রণয়ন করে।
২০১২ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ‘মানবনিরাপত্তা’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর এই সংজ্ঞাকে জাতিসঙ্ঘের শীর্ষ সম্মেলন অনুমোদন করে। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তার ধারণাকে জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত করেছে। এ সব ক্ষেত্র হচ্ছে অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অর্থ রাষ্ট্রের নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা।
প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ব্যক্তিকে যেভাবে ভীতিমুক্ত দেখতে চেয়েছেন, জাতিসঙ্ঘের ওই সব কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রয়াস রয়েছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়া এবং সমাজে আতঙ্কের বিস্তার যে স্বাভাবিক ঘটনা নয় তা আমরা জানি। যে কোনো সমাজে, যে কোনো সময়ে আতঙ্ক হচ্ছে, তৈরি করা বিষয়। যদি কোনো সমাজে আতঙ্ক সর্বব্যাপী রূপ নেয়, তা হলে বুঝতে হবে সেই সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । আতঙ্ক যারা তৈরি করে, তাদের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে ভীত করা, নিঃসঙ্গ করা, প্রতিরোধের শক্তিকে দুর্বল করা। মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারের তরফ থেকে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। এ সব হচ্ছে- প্রতিরক্ষা বাহিনী,সীমান্ত রক্ষাবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের। যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনুপস্থিত সেখানে নিরাপত্তাবা যে কোনো কল্যাণ প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ব্যতীত যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; সেরূপ জনগণের সক্রিয় জাগরণ ব্যতীত নিরাপদ রাষ্ট্র নির্মিত হতে পারে না। নাগরিক সাধারণকে তাদের নিরাপত্তা, সম্পদ ও সম্মান লাভের জন্য অবশ্যই সংগঠিত প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী হতে হবে।
জনগণের নীরব ভাষাকে সরব করার দায়িত্ব গণতান্ত্রিক শক্তির। আমাদের জন্য কেউ গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার মতো বিষয়াবলিকে নিশ্চিত করবে না। নাগরিকদেরই নাগরিক নিরাপত্তার জন্য অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। জনগণ যদি ক্ষমতার উৎস হয় তাহলে তাদের বিজয় অনিবার্য।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজকে বিভিন্ন বলয়ে বিভক্ত করে ফেলার যে প্রবণতা দৃশ্যমান, তা সমাজে কেবল অসহিষ্ণুতার জন্ম দিয়েছে তা-ই নয়, একই সঙ্গে মানুষের অধিকারকেও সংকুচিত করেছে এবং তৈরি করেছে ভয়ের সংস্কৃতি। এই বিভক্তির বলয় থেকে যাঁরা সুবিধা নিচ্ছেন, তাঁরা ভেবে দেখতে অনাগ্রহী ভবিষ্যতে দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কিন্তু তাঁদের আগ্রহ-অনাগ্রহ ঘটনা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে না, সেটা নিশ্চিত। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস ও বিশ্বাসহীনতা কোনোটিই নাগরিকের বেঁচে থাকার, ন্যায়বিচার পাওয়া-না পাওয়ার শর্ত হতে পারে না। সবার উচিত ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যবস্থার জন্য সরব ও সক্রিয় হওয়া। যদি সেই আতঙ্কের পরিবেশ, সেই ভয়ের সংস্কৃতিকে পরাস্ত না করে, নাগরিকদের কেউই নিরাপদ হবেন এমন আশা করার কারণ আমরা দেখি না।
লেখক : শিক্ষক