ভোরের কর্ণফুলী পাড়

তাসনীম হাসান
shutki-bg20170110103352

ভোর ছয়টার কিছু পরের সময়। সূর্য উঠবে উঠবে বলে উঁকি দিচ্ছে পূবআকাশে। কর্ণফুলীর উত্তরপাড়ের নগর তখনো কিছুটা ‘ঘুমিয়ে’। কিন’ দক্ষিণপাড়ে শুরু হয়ে গেছে কর্মব্যস্ততা। নৌকা-জাহাজ থেকে বস্তায় বস্তায় নামছে মাছ-ছুরি, পোয়া, লইট্টা কিংবা ফাইস্যা। এরপর এই হাত-ওই হাত ঘুরে মাছগুলোর জায়গা হচ্ছে বাঁশের মাচার ওপর। কয়েক মাসের মাথায় পানি ঝরে এসব মাছ পরিণত হবে শুটকিতে। তারপর চাক্তাই হয়ে এসব শুটকি ছড়িয়ে পরে পুরো দেশে।
গতকাল মঙ্গলবার ভোরের চিত্র এটি। সেই চিত্রের আরও কিছু অংশ-পাশের কর্ণফুলী নদীর তীরে ভিড় করেছে নৌকা-জাহাজ। সেখান থেকে বস্তা ভরা মাছ পাড়ে তুলছেন জেলেরা।
সেখানকার একটি জাহাজে থাকা জেলে আব্দুর রহিম জানান, সোমবার রাতেই ফিরেছে তাদের জাহাজ। এবার ২০ মণ মতো-ছুরি, পোয়া, লইট্টা কিংবা ফাইস্যাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়েছে তাদের জালে। সেগুলো নিয়েই ফিরেছেন তারা।
হামিদ নামের আরেক জেলে বলেন, একবার মাছ ধরতে গিয়ে বঙ্গপোসাগরে কাটাতে হয় ২৬ থেকে ২৮ দিনের মতো। এরপর মাছ নিয়ে ফেরেন জেলেরা। ছুরি, পোয়া, লইট্টা কিংবা ফাইস্যা প্রজাতির কিছু মাছ কাঁচা বিক্রি করা হলেও বেশিরভাগ দিয়েই তৈরি করা হয় শুটকি।
কর্ণফুলীর দক্ষিণপাড়েই বেশিরভাগ শুটকি তৈরির আড়তের অবস’ান। এসবের বেশির ভাগই আবার ব্যক্তিমালিকানাধীন।
এর মধ্যে এস আলম মাঠ নামের একটি বিশাল খোলা জায়গার পশ্চিম কোণে আছে বড় একটি শুটকি আড়ত। এই শুটকির আড়তটি স’ানীয় শেখ আহমদের। গতকাল অবশ্য তাকে পাওয়া যায়নি। তার সহকারী হিসেবে আড়ত দেখার দায়িত্ব পালন করছিলেন তার ফুফাতো ভাই মোহাম্মদ সুমন।
মঙ্গলবারের ভোরে তার দম ফেলার ফুরসত নেই। শ্রমিকদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, জাহাজ থেকে মাছ বুঝে নেওয়া-কত কাজ তার। এর মধ্যেই দশ মিনিট সময় বের করে কথা বললেন মোহাম্মদ সুমন, ‘আমাদের আড়তে বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য সব মৌসুমেই শুটকি তৈরি করা হয়। বিশেষ করে রুপচাঁদা, ছুরি, পোয়া, লইট্টা, ফাইস্যা মাছের শুটকি তৈরি করি আমরা। তবে মুরগি ও মাছের খাবার হিসেবে তৈরির জন্য শাপলা, হাঙ্গরসহ আরও বেশ কয়েকটি মাছ শুকিয়ে নেওয়া হয়। মাছ সংগ্রহের জন্য আমাদের নিজস্ব জেলে নেই। তবে যেসব জাহাজ মাছ ধরতে যায় তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি করা থাকে। চুক্তি অনুযায়ী তারা প্রতিদিন ভোরে মাছ দিয়ে যায়।এরপর ভোর থেকেই মাছ শুকানোর কাজ শুরু হয়।’
এসব মাছ শুকাতে কতদিন লাগে? এমন প্রশ্নে সুমন বলেন, আমরা মাছকে বাতাস ও রোদের সাহায্যে শুকাই। একেবারে শুদ্ধভাবে শুকাতে কয়েক মাস পর্যন্ত লাগে। শুটকি তৈরি হওয়ার পর আমরা সেসব চাক্তাইতে বিক্রি করি। আবার কিছু কিছু শুটকি কক্সবাজারেও যায়। এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের তৈরি শুটকি।’
তাদের আড়তে শুটকি তৈরি করছিলেন ৩০ জনের অধিক তরুণ-তরুণী। তাদের হাতেই তৈরি হচ্ছে শুটকি।
শ্রমিকদের একজন রোকেয়া বেগম বললেন, ‘আমরা দৈনন্দিন হিসেবে এখানে শুটকি তৈরির কাজ করি। ভোর ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কাজ করি। এই হিসেবে আমাদের প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ টাকা ভাতা দেওয়া হয়।’

আপনার মন্তব্য লিখুন