ভিনসেন্ট ভ্যান গগের আপন দেশে

ইফতেখারুল ইসলাম
Untitled-1-copy

তাঁর শিল্পকর্ম আমাদের সবার অতি পরিচিত। তাঁর বিখ্যাত ছবিগুলোর ছাপানো কপি যত্রতত্র দেখা যায়। দেখা যায় নানা বই ও পত্র-পত্রিকায়, ক্যালেন্ডারে ও পোস্টারে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাড়ির বসবার ঘরে, দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো, নতুন ও উজ্জ্বল অথবা পুরনো বিবর্ণ ছবি। ছেলেবেলা থেকে এসব ছাপানো ছবি এত অজস্রবার দেখেছি যে মূল ছবি দেখে কতোটা ভালো লাগবে তা নিয়ে সংশয় ছিল। সে সংশয় কেটে যায় ১৯৯৬-৯৭ সালে কয়েকবার প্যারিসের ওরসে মিউজিয়ামের সংগ্রহ দেখে। আর এই শিল্পীর ছবি এবং জীবন আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে তার পরের বছরে। তখন আমি প্যারিসের বাইরে, শহর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে শিল্পীর শেষ জীবনের আবাস একটি ছোট্ট ঘর দেখতে যাই।
আমি যেখানে কাজ করি সেই ওষুধ কম্পানির হেড কোয়ার্টার প্যারিসে। শহরের একটু দূরে সার্জি নামের এক জায়গায় আমাদের একটা ট্রেইনিং কোর্স চলছিল। সেই কোর্সের অংশ হিসেবে একদিন আমাদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো মেইসো দা ভ্যান গগ-এ, ভ্যান গগের বাড়ি হিসেবে পরিচিত সেই পুরনো হোটেলে। সেখানে ভ্যান গগের ছবি ও জীবন সম্পর্কে বিশদ আলোচনা হয়। দেখানো হয় একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তারপর ঘুরে দেখি সেই বাড়ি আর পুরনো আসবাবপত্রে সাজানো ছোট্ট ঘরটি। সেই ছোট্ট ঘর আর তার ভিতরের কাঠের চেয়ার, টেবিল, খাট অমর হয়ে আছে। পৃথিবীতে আর কোনো চেয়ার-টেবিল-খাট এত বিখ্যাত হয়েছে বলে মনে হয় না। সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ ভ্যান গগের আঁকা সেই ছবি দেখেছে।
এর পরের বছরেই ১৯৯৯ সালে আমি প্রথম আমস্টারডামে যাই। সেখানকার কাজ শেষ হবার পর আমার প্রথম গন্তব্য হয় ভ্যান গগ মিউজিয়াম।
মাত্র সাইত্রিশ বছর বেঁচেছেন এ রকম আর কোনো শিল্পী শতবর্ষ পেরিয়ে এত আলোচিত আর এতটা বিখ্যাত হয়েছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এদিক থেকে মনে হয় ভ্যান গগ অদ্বিতীয়। তাঁর শিল্পকর্ম, জীবন, নৈরাশ্য ও সফলতা, সবকিছুই আজ একটা কিংবদন্তির অংশ হয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতো গবেষণা, আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে সেসবের পূর্ণাঙ্গ রচনাপঞ্জি তৈরি করাও দুঃসাধ্য। অথচ ভিনসেন্ট ভ্যান গগ (১৮৫৩-১৮৯০) যখন ছবি আঁকা শুরু করেন তখন অন্য কেউ দূরে থাক তিনি নিজেও ভাবেননি যে তাঁর মধ্যে রয়েছে এমন অসামান্য প্রতিভা আর এত বিস্ময়কর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিশ্রুতি।
তাঁর বহু ছবি আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। দেশে দেশে শিল্পানুরাগী মানুষের চোখে লেগে থাকে সেই অনন্য চিত্রাবলী। তাঁর ছবিকে নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয় এই শিল্পীর কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাঁর ছবি মানেই নিপুণ তুলির টান আর মৃত্তিকার রঙ থেকে বহুবর্ণে গাঢ় ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। ক্রমেই উজ্জ্বলতর রঙের ব্যবহার। নেদারল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের নিসর্গদৃশ্য তাঁর হাতে অমর হয়ে আছে। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মুখাবয়ব যেমন এঁকেছেন তেমনি এঁকেছেন অনেকগুলো আত্ম-প্রতিকৃতি। এঁকেছেন অতি সাধারণ কাঠের চেয়ার-টেবিল-খাট থেকে শুরু করে নানা বর্ণের ফুল আর সূর্যমুখী-শোভিত স্টিল-লাইফ বা স্থির-জীবন। ভ্যান গগের কথা মনে করতেই আমাদের চোখে ভাসে নক্ষত্রখচিত গাঢ় নীল রাত্রি, হলুদ-সবুজ-নীল মেশানো প্রকৃতি, সাইপ্রেস, মুলবেরি আর জলপাই গাছে বাতাসের দোলা, ঢেউ-খেলানো সোনালি শস্যখেত, কাক, চড়ুই, আর আইরিস অথবা সূর্যমুখীর উজ্জ্বল রঙ।
নাতিদীর্ঘ শিল্পীজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি এঁকেছেন গ্রামজীবন ও নিসর্গের বহু ছবি। প্রাক-ইমপ্রেশনিস্ট রীতির এসব ছবির বিষয়, রঙ এবং সার্বিক শৈলীতে ভ্যান গগের এক ধরনের বিশিষ্টতা চোখে পড়ে। তারপর প্যারিসে বসবাসকালে সমকালীন অন্যান্য শিল্পীর সংস্পর্শে আর ইমপ্রেশনিজমের প্রভাবে ক্রমশ বদলে যায় তাঁর ছবির দৃশ্যপট, ছোট-ছোট হয়ে যায় তুলির টান এবং উজ্জ্বলতর হয় রঙ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ইউরোপীয় চিত্রকলায় নেতৃস্থানীয় ও প্রতিনিধিত্বশীল কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম। এর অব্যবহিত পরেই অবশ্য তাঁর শিল্পশৈলী আবার বদলে যেতে থাকে। নিজের অনন্য পদ্ধতি পয়েন্টিলিজমের ধারায় উত্তর-ইমপ্রেশনিস্ট একটি নতুন যুগের সূচনা করেন তিনি।
ভ্যান গগের এই পরিক্রমণের ইতিহাস অনেকেরই জানা। পৃথিবীর অধিকাংশ বড় মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালায় তাঁর কোনো-না-কোনো বিখ্যাত ছবি দেখা যায়। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বড় শহরগুলোর মিউজিয়ামে দেখা যাবে এই শিল্পীর অন্তত একটি-দুটি পরিচিত ছবি। কিন্তু নেদারল্যান্ড হচ্ছে তাঁর জন্মভূমি। তাই আমস্টারডামের ভিনসেন্ট ভ্যান গগ মিউজিয়ামকে এমন এক সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে এই শিল্পীকে পরিপূর্ণভাবে চেনা যাবে। অনেক উপকরণ একসঙ্গে সঞ্চিত রয়েছে এখানে। আর এটিই সারা বিশ্বে ভ্যান গগের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। দুশোর বেশি চিত্রকর্ম, পাঁচশোর বেশি ড্রইং আর সাতশোর মতো চিঠি। সব মিলিয়ে তাঁকে ভালোভাবে চেনার এবং তাঁকে নিয়ে গবেষণা করার অপূর্ব সুযোগ। আসলে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ শিল্পীর নামে একটি একাডেমি তৈরি করে গবেষণা পরিচালনার কাজ করে থাকে। এই মিউজিয়ামেই আছে তাঁর প্রথম পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি, ১৮৮৫ সালের বসন্তকালে আঁকা দ্য পটেটো ইটার্স। আছে ১৮৮৮ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত সময়ে আঁকা তাঁর বিখ্যাত বেডরুম, সানফ্লাওয়ার, আইরিস, ইত্যাদি ছবি। আর আছে তাঁর শিল্পীর আত্ম-প্রতিকৃতি।
মিউজিয়ামটি পুরনো। শুরু থেকেই শিল্পীর জীবন আর পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই সংগ্রহশালার ইতিহাস। ভ্যান গগের ভাই থিওডোর ছিলেন ছবির ডিলার। শিল্পী নিজে তাঁর জীবনের একটা বড় সময়ের জন্য এই ভাইয়ের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতেন। ১৮৯০ সালে ভ্যান গগের মৃত্যুর পর তাঁর অধিকাংশ ছবির মালিকানা বর্তায় থিয়োর ওপর। এর মাত্র ছমাস পরেই থিয়ো নিজেও মারা যান। তখন এসব ছবির মালিকানা ও দায়িত্ব পান প্রথমে থিয়োর বিধবা স্ত্রী জোহানা (১৮৬২-১৯২৫) এবং পরে তার ছেলে ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গগ (১৮৯০-১৯৭৮)। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যেসব ছবি আর চিঠিপত্র পরিবারের সংগ্রহে ছিল তা তখনকার সদ্য-প্রতিষ্ঠিত ভিনসেন্ট ভ্যান গগ ফাউন্ডেশন কিনে নেয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আর মিউজিয়ামের জন্য বর্তমান ভবনটি তৈরি করে দেয় নেদারল্যান্ড সরকার। ১৯৭৩ সালে ভ্যান গগ মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে আরো বেশ কজন শিল্পীর অনেক শিল্পকর্ম এরা সংগ্রহ করেছে যা ভ্যান গগ এবং তাঁর সমকালীন ও পরবর্তী যুগের চিত্রকলাকে বুঝতে সাহায্য করে।
প্রথম জীবনে অন্য ধরনের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে চেষ্টা করেছিলেন ভ্যান গগ। ধর্মশিক্ষা নিয়েছেন এবং পৌরহিত্যের কাজ করতে চেয়েছেন। অল্পদিনেই এসব পেশায় ব্যর্থ হয়ে তিনি শুরু করলেন ছবি আঁকার কাজ। শিল্পকলায় সামান্য প্রশিক্ষণ আর অসামান্য হৃদয়াবেগ নিয়ে নিজের অনুভূতিকে সম্বল করে সাতাশ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকার কাজে মন দেন। আর তারপর এমন এক জায়গাতে পৌঁছেছেন যে উনবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব চিত্রকলার কোনো আলোচনাই আর সম্ভব নয় ভ্যান গগকে বাদ দিয়ে। তাঁর কিছু কিছু ছবি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছে। শিল্পীর পরিচয়চিহ্ন এবং জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে সেইসব বিখ্যাত ছবি। কিছু ফুল, বিশেষত কয়েকটি সূর্যমুখী, রাতের আকাশে কিছু তারা, হলদে রঙের কাঠের তৈরি একটা অতি সাধারণ খাট আর টেবিল-চেয়ার তারপর কিছু বাঁকাচোরা আত্ম-প্রতিকৃতি। এই ছবিগুলো দিয়ে ভ্যান গগ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। তাঁর প্রতীকের মতো এসব ছবি আসলে এঁকেছেন অনেক পরে, ফ্রান্সে বসবাস করার সময়। ইমেপ্রশনিস্টদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন ছোট ছোট ব্রাশ-স্ট্রোকে। আর তারপর পোস্ট-ইমেপ্রশনিস্ট শিল্পী হিসেবে তুলির আরো ছোট ছোট ফোঁটা দিয়ে ছবি আঁকার বিশেষ রীতি তৈরি করেছেন। পয়েন্টিলিজম নামে পরিচিত এই শিল্পরীতি। কিন্তু এসবের অনেক আগে নিজ দেশে থাকাকালে তাঁর ছবির ধরন অনেকটাই অন্যরকম ছিল।
তাঁর প্রথম পর্বের ছবির বিষয়বস্তু, নিসর্গ আর সাধারণ মানুষ, আমস্টারডামের কাছাকাছি অঞ্চলের গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা। এই মিউজিয়ামে প্রদর্শিত ছবির জঁর-বিভাগ করতে গিয়ে নিসর্গ, নগরদৃশ্য, স্থির জীবন, আত্ম-প্রতিকৃতির পাশাপাশি একটা বড় বিভাগ করা হয়েছে যার নাম চাষী-জীবন। ফসলের মাঠে পরিশ্রমী মানুষের ছবিগুলো এই বিভাগে অন্তর্ভুক্ত। এসব ছবির প্রথম দিকের কিছুটা অপরিণত এবং পরের কিছুটা পরিশীলিত রূপ আমাদের মতো দেশের মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে। এমনি একটি ছবি পটেটো ইটার্স।অল্প-আলোয় ক্লিষ্ট মানুষের অভিব্যক্তি। আমরা যারা দারিদ্র্য-পীড়িত ও শ্রম-ক্লান্ত মানুষের মুখের রেখায় এবং চোখের দৃষ্টিতে প্রশান্তির চিহ্ন আর বিশ্বাসের ছায়া দেখতে অভ্যস্ত তারা এসব ছবির বাস্তবতাকে অনুভব করি অন্তরে। এদের কিছু বিশেষত্ব আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকে। আঠারো বছর আগে একদিন আমস্টারডামের রাইখস মিউজিয়াম আর ভিনসেন্ট ভ্যান গগ মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে আমি মোহিত হয়েছিলাম। এরপর আবার সেখানে ফিরে গেছি কয়েকবার। আরো ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করেছি কিছু বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ ছবি। আমস্টারডামে যাবার আগে ভ্যান গগের অনেকগুলো ছবি দেখেছি প্যারিসের ওরসে মিউজিয়াম আর নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে। সেসব ছবির মধ্যে সহজেই সনাক্ত করা যায় ভ্যান গগ এবং তাঁর বর্ণাঢ্য কালপর্বকে। তাদের আবহ ও আস্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা।
চলবে