ভিনগ্রহের প্রাণি

আখতারুল ইসলাম

আসিফ ক্লাস সেভেনে পড়ে। তার ছোট ভাই আহাদ পড়ে ফাইভে। দু ভাই বন্ধুর মত। কম্পিউটার নিয়ে তাদের আগ্রহের শেষ নেই, আসিফের ইস্কুলে স্যারেরা যখন কম্পিউটারের গুরুত্ব ও ব্যবহার সম্পর্কে বলে, আসিফের কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। ইস্কুল থেকে ফিরে আহাদকে বলে, আহাদ বলে ভাইয়া পত্রিকাও দেখেছি আমাদের মত অনেকে কম্পিউটার গেইম, প্রোগ্রাম তৈরি করে।
হ্যাঁরে আহাদ, চল বাবাকে বলি।
আহাদ বলে, আচ্ছা ঠিক আছে বাবা অফিস থেকে এলে বলব, চল, মাকে বলি।
না না ভাইয়া মা বকা দেবে। বাবা অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হয় অন্য দিন ৫-৬ টার মধ্যে আসে আজ এল ঠিক নটা বাজার ১০ মিনিট আগে। আসিফ ও আহাদ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করছে যেন বাবা এলে দেখে, আর আবদার করলে তা যেন রক্ষা করে। বাবা হাত মুখ ধুয়ে আসিফ ও আহাদের পড়ার ঘরে এলে, খুশি হয় দু ছেলেকে পড়ায় দেখে।
আসিফ বলে, বাবা একটা কথা বলব।
ঃ বল, আসিফ।
বাবা আমাদের একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার কিনে দেবে।
আসিফের বাবা আনিসুর রহমান হঠাৎ ভাবছেন ছেলের মাথায় কম্পিউটারের ভূত চাপলো কীভাবে। আচ্ছা তা না হয় দেব। কিন্তু কম্পিউটার দিয়ে কী করবে।
আহাদ বলে, বাবা কম্পিউটারে কত কিছু করা যায়।
বাবা বলল, শোন আসিফ, আহাদ তোমরা এখনো ছোট, এখন পড়ালেখার সময়, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া কর, এসএসসি পরীক্ষার পর কম্পিউটার কিনে দেব।
হঠাৎ দু’ভাইয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়, যেন রাজ্যের সমস্ত কালো মেঘ মুখের ওপর জমে গাঢ় হয় যে কোন মুহূর্তে চোখের পানি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে।
ঃ আনিসুর রহমান, আসিফের মা, শোন।
ঃ হ্যাঁ আসছি।
ঃ এসে দেখে যাও, আসিফ ও আহাদের মন খারাপ।
ঃ কী হয়েছে।
ঃ দেখ্‌ দেখ্‌ তোমার ছেলেদের কাণ্ড।
ঃ মা বলে, কী করেছে ওরা।
ঃ ওদের নাকি কম্পিউটার লাগবে।
ঃ মা বলে, পড়ালেখা সব লাটে উঠবে।
আসিফ কেঁদে ফেলে না, মা, আমরা পড়ার সময় পড়ালেখা, ইস্কুলের সময় ইস্কুুলে যাব। পড়ালেখার কোন ক্ষতি হবে না। আহাদও এসে মায়ের আঁচল ধরে বলে হ্যাঁ মা, দাও না, একটা ল্যাপটপ, দিলে কি এমন ক্ষতি হয়। দেখবে আমরা আরো বেশি পড়ালেখা করব, ভালো ফলাফল করবো, ইস্কুল থেকে ফিরে অবসর পেলে, ইস্কুল বন্ধ হলে কম্পিউটারে কাজ করব, অন্য সময় না, আসিফও বলে হ্যাঁ বাবা।
আমিনুর রহমান, ছেলেদের এমন অবস্থা দেখে বলে, আচ্ছা ঠিক আছে কিনে দেব।
আমিনুর রহমানের ছোট ভাই আবিদুর রহমান জার্মান প্রবাসী। আসিফ ও আহাদের কম্পিউটারের প্রতি এতো আগ্রহের খবর শুনে একটা ল্যাপটপ পাঠায়।
আসিফ ও আহাদ ল্যাপটপ পেয়ে মহাখুশি, ফোনে চাচ্চুকে ধন্যবাদ দেয়। বাবা-মা ও ধন্যবাদ দেয়। বাবা আমিনুর রহমান চাকুরির সুবাদে কম্পিউটারের টুকটাক কাজ জানে, রাতে অফিস থেকে ফিরে আসিফ ও আহাদকে শেখায়। কিছুদিনের মধ্যে দু’ভাই মোটামুটি কম্পিউটারের ভাষা জ্ঞান শিখে নেয়। এখন আর বাবার সহযোগিতার প্রয়োজন হয় না।
ইস্কুল থেকে ফিরে দু ভাই ল্যাপটপ নিয়ে বসে মাঝে মাঝে ঝগড়াও হয় আসিফ ও আহাদের মধ্যে কারণ কে আগে চালাবে, কে গেইম খেলবে, কে ইন্টারনেট ব্রাউজ করবে। পরবর্তী দিনক্ষণ সময় ভাগাভাগি করে আসিফ বলে, দেখ আহাদ যদি আমরা ঝগড়া করি, আর তা যদি বাবা মা জানতে পারে তবে ল্যাপটপ নিয়ে ফেলবে। ভাইয়ের কথায় একমত হয় আহাদ।
আসিফ ল্যাপটপটা নিয়ে আহাদকে বলে, দেখ আহাদ এটা ছোট হলে কী হবে এর অনেক ক্ষমতা। অনেক কাজ করা যায়। পৃথিবীটা হাতের মুঠোয়। টাচ্‌ প্যাডে আঙুল দিয়ে আলতো ছুঁয়ে দিলে চোখের পলক না পড়তেই স্বপ্নের একটা জগৎ মনিটরে এসে যায়। রূপকথাকেও হার মানায়। বিশ্বের কত ইশকুলে লেখাপড়া, প্রাণিজগৎ, চিকিৎসা বিজ্ঞান- মুহূর্তে চলে আসে, গুগল, ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউব কি সব আজব এক জগৎ। যেন বিজ্ঞানের কল্পকাহিনি সায়েন্স ফিক্‌শন তা বাস্তবে। সব নতুন নতুন তথ্য, যেন আলাদিনের দৈত্য টাচ্‌ করার সাথে সাথে সব কিছু হাজির করে দেয়।
আহাদ ছোট চাচ্চুকে বলে, পৃথিবীর মজার মজার সব অ্যাডভেঞ্চার, তথ্য, ছবি, সিনেমা, মুভি, গ্রহ-উপগ্রহ, সাগর-সমুদ্র, নক্ষত্র, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্যনতুন তথ্য মেইল করতে, বা গুগল এ সার্চ করতে ভুল হলে শেখে নেয়, চাচ্চুও ভাইপোদের আবদার ফেলতে পারে না।
ছোট চাচা সায়েন্স ফিক্‌শন অনেক মুভি পাঠায়, আহাদ আসিফ যত দেখে ততই অবাক হয় বিচিত্র সব মনোমুগ্ধকর তথ্যবহুল ছবি।
একটা মুভি দেখছে আহাদ, আসিফ নিচে খেলতে যায়। মুভিটা হল-
“অদ্ভুত প্রাণী ডাইনোসরের মত বিশাল এক নদীর তীরে হাঁটছে, হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের পাদদেশ ধরে যাচ্ছে, পথে অ্যালবাট্রস জাতীয় তিনটি পাখি ডাইনোসরকে জিজ্ঞেস করছে, ভাই আমরা ট্রিটন গ্রহ থেকে এসেছি, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে। এই গ্রহের বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রটি কোথায়? ডাইনোসর কিছুটা অবাক হয়। বড় বড় হা করে বলল, বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র ঝজঝ এ যাবেন, (এস-আর এস মানে বিজ্ঞান গবেষণা স্টেশন?)
অ্যালবাট্রসরা বলল হ্যাঁ?
একটু বামে গিয়ে ঐ পর্বত দেখছেন, এর একটু পিছনে একটা বাড়ি আছে। তা হল ঝজঝ। ধন্যবাদ দিয়ে আলবাট্রসরা হাঁটতে শুরু করে।
কিছু দূর যেতে পাহাড়ের পদদেশে আলবাট্রসদের সাথে দেখা হয় একটা ঈগল পাখির। ঈগল বড় হলেও এর আকৃতি ছোট। বলল গবেষণা কেন্দ্র থেকে আমাকে পাঠিয়েছে আপনাদের নিয়ে যেতে, আপনারা ট্রিটন গ্রহ থেকে এসেছেন তাই না?
ঈগলের কথা শুনে আলবাট্রসরা বলে হ্যাঁ, চলুন। হঠাৎ, আসিফ রুমে ঢুকে বলে, আহাদ ল্যাপটপ বন্ধ কর। স্যার এসেছে পড়াতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্ধ করে দেয় ল্যাপটপ। স্যারের সামনে বসলেও মনে রেশ রয়ে যায় কাহিনিটির, কোন মতে মন থেকে মুছতে পারে না। কি চমৎকার মুগ্ধকর। জানলা দিয়ে বাইরে দেখে উদাস হয়ে ভাবে।
স্যার বলে কী আহাদ?
খেই হারিয়ে বলে না, স্যার কিছু না।
স্যার চলে গেলে আসিফকে বলে কাহিনিটি। ইশকুলের পড়া তৈরি করতে হবে বলে, আর দেখা হয় না মুভিটা। রাতে ঘুমাতে গেলেও অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে আহাদ, পাশে বড় ভাই আসিফ। আহাদ স্বপ্নের রাজ্যে, সব কিছু অন্য রকম মনে হয়। আহাদ দেখে, ঈগল পাখিটি আহাদের জানালার গ্রীলের কোটর দিয়ে ঢুকে তার রুমে। আহাদের ঘরে ছোট পাখার ঝাপটা ও একটা অদ্ভুত শব্দে আহাদের ঘুম ভেঙে যায়।
আহাদ ওঠে বসে, ঘরটা এক ধরনের নীল আলোতে ভরে যায়। আহাদ দেখল ছায়ার মত কী যেন তার ঘরে পড়ার টেবিলে পাশে নড়াচড়া করছে। হঠাৎ ভয় পেয়ে যায় আহাদ, চোর-টোর ঢুকেনি তো ঘরে, নাকি আগে থেকে ঘরের মধ্যে কেউ ছিল। ভয়ে হাত পা কাঁপতে থাকে, আসিফ পাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
আহাদ জড়োসড়ো হয়ে আসিফকে ডাকছে। ভাইয়া, ভাইয়া ওঠ। কিন্তু তার শব্দগুলো শোনা যাচ্ছিল না। কে যেন খামছে ধরেছে তার গলা। এতো জোরে ডাকছে তবু শুনছে না।
আহাদ দেখল, একটা ঈগল, ভাবছে ঘরে ঈগল আসবে কোথা থেকে, আবছা আবছা মনে পড়ে ল্যাপটপে দেখা সেই ছবি সায়েন্স ফিক্‌শন মুভির কথা তবু ভাবছে সেটা তো অন্য গ্রহের, সিনেমা কাহিনি, তা এখানে বাসায় আসবে কিভাবে, তাও এতো রাতে, আহাদ বলে, পাখি!! পাখি!!! ঈগল!! ঈগল, ঈগল।
পাখিটা বলে, শোন আমি পাখি না, আমি ট্রিটন গ্রহের প্রাণি। আহাদ আরো ভয় পেয়ে যায়। জোরে আসিফকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার শুরু করে আসিফ উঠতেই ঈগলটা জানালা দিয়ে উড়ে চলে যায়।
আসিফ ওঠে বসে কিরে আহাদ কি হয়েছে। ভাইয়া, ঈগল পাখি।
আসিফ বলে, কী বলছিস যা তা, ঈগল পাখি! এতো রাতে ঈগল আসবে কোথা থেকে। না ভাইয়া এটা আমাদের দেশের ঈগল পাখি না এটা ভিন্ন গ্রহের প্রাণি।
চিৎকার শুনে বাবা মাও এসে হাজির।
আমিনুর রহমান কি হয়েছে রে আসিফ, আহাদ চিৎকার করছে কেন?
জানি না। বাবা ও বলছে, ল্যাপটপে দেখা সাইন্স ফিক্‌শন মুভির ভিন্ন গ্রহের প্রাণি ছিল যার নাম ঈগল সেটা নাকি আমাদের রুমে এসেছে। আমিনুর রহমান দেখে আহাদ ঘামছে। বলছে বাবা কই ঈগল।
আহাদ বলল, বাবা চলে গেছে, পরে সব ঘটনা খুলে বলে।
তার মা বলছে ও ছবি দেখেছে তো মনের মধ্যে ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই ও স্বপ্ন দেখেছে। শোন আহাদ এটা তোমার স্বপ্ন ঘুমিয়ে পড়, বাবা মা চলে গেলে আসিফ ও আহাদ ঘুমিয়ে পড়ে।
দু’দিন পর ল্যাপটপ চালু করতেই দেখে মনিটরে সে ঈগলের ছবি, সাথে একটা ম্যাসেজ। “আমি ঈগল না। আমি এসেছিলাম তোমার সাথে কথা বলতে, তোমার সাথে মহাবিশ্বের বিভিন্ন চমকপ্রদ তথ্য শেয়ার করতে, তোমার বন্ধু হতে তোমার ল্যাপটপ ও বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ আমি আগে জেনেছিলাম। কিন্তু তুমি ভয় পেয়ে গেলে, যারা বিজ্ঞান শেখে, তাদের ভয় পেলে চলে? ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাও, আমি কোন একদিন আবার আসবো।”
তোমার ডাকা ঈগল। আহাদ গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে জানালা ধরে, কখন তার বন্ধু ঈগল আসবে।