ভিক্ষুক ও হিজড়াদের পুনর্বাসনে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের নানা উদ্যোগ এবং এনজিওগুলোকে বেশ সক্রিয় দেখা গেলেও আদতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শহর জনপদে বাড়ছে ভিক্ষুক-দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। এখন যোগ হয়েছে হিজড়া।
হিজড়ারা তৃতীয় লিঙ্গের মর্যাদা পেয়েছে এই সরকারের আমলে। কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের বড় কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। এই দরিদ্র অসহায় শ্রেণীকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়।
সমাজের বিত্তবান ক্ষমতাশালী লোকেরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সরকার পক্ষ যখন সমস্যাকে গভীরভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ- তখন দেশজুড়ে ভিক্ষুকের উপদ্রব থামাবে কে? খোদ রাজধানীতে লাখো ভিক্ষুক নানা উপায়ে বিভিন্ন জনবহুল স্থানে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত । এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে সচেতন মানুষ এ ধরনের প্রশ্ন করতেই পারে।
ইসলামে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিকৃষ্টতম উপায় ও আত্মমর্যাদাহানিকর একথা বার বার উচ্চারিত হয় দেশের আলেম সমাজসহ নেতৃস্থানীয় লোকদের মুখে। অথচ দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে উপায়-কিনারা করতে না পেরেই যে দেশের গরিব ও অসহায় মানুষ ভিক্ষাবৃত্তির মতো অবমাননাকর পেশায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। যে দেশে নদী ভাঙনে প্রতিদিন কূল ঘেঁষে বসবাসকারী মানুষেরা ভিটেমাটি হারা হচ্ছে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস-বন্যায় বাস্তুচ্যুত হচ্ছে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ- এই যখন বাস্তবতা তখন শুধু শুধু ভিক্ষাবৃত্তির জন্য ভিক্ষুকদের দোষী-দায়ী করা কতটা যৌক্তিক তা নতুন করে ভাববার বিষয়।
মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য সামান্য জায়গা থাকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রকে যখন গণপ্রজাতন্ত্রী বলা হয় সেই রাষ্ট্রের জনগণের বৃহৎ একটি অংশের এতটুকু মাথা গোঁজার বাসস্থান থাকবে না-তা কিভাবে হয়। সরকার থেকে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর রূপরেখা কি? প্রতিরোধ প্রতিকারে আশু ও স্থায়ী পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট নয়। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কুটির শিল্পের উদ্যোগে সংযুক্তি ও গ্রামীণ কৃষি ও কৃষি সহায়ক নানাক্ষেত্রে এদের জন্য কর্মমুখি প্রকল্প নেয়া প্রয়োজন। বাঁচার কোনো অবলম্বন ও ভরসা না পেয়েই সে ভিক্ষাবৃত্তির পথে এসেছে।
ভিক্ষুকের উৎপাত, ছিনতাইকারীর ত্রাস, অপরাধীর অপরাধযজ্ঞের কবল থেকে যদি আমাদের বাঁচতেই হয়- আগে তার প্রতি মানবিক দৃষ্টি দিতে হবে। তার সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। তার স্বাভাবিক জীবন চলার পথ তৈরি করে দিতে হবে। তা না করে ভিক্ষুকের উৎপাত নিয়ে ‘ব্যানার হেডিংয়ে’ খবরের কাগজে নিউজ ছাপিয়ে, যত দোষ তার ওপর চাপিয়ে দিয়ে সমস্যার পাহাড়-দারিদ্র্যের ত্রাস-গ্রাস থেকে কোনোভাবেই পরিত্রাণ মিলবে না।
গরিব মানুষগুলোকে পুনর্বাসন, স্বাভাবিক জীবনের পথ তৈরি করে দেওয়ার কথাই বলে ইসলামের জাকাত দর্শন। এদের জন্য রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো অনুকম্প বা দয়া-দাক্ষিণ্যের আদৌ প্রয়োজন নেই। শুধু একটু দৃষ্টি দিন ইসলামের পরীক্ষিত অর্থনৈতিক দর্শন জাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে। এক হিসেবে দেখা গেছে, সঠিকভাবে দেশের বিশ লাখ ধনীর কাছ থেকে জাকাত সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হলে বছরে দশ হাজার কোটি টাকার বড় তহবিলের জোগান হতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচনে, গরিব-ভিক্ষুক পুনর্বাসনে জাকাত তহবিলের মাধ্যমে সঠিক পরিকল্পনা নেয়া হলে এক দশকেই দেশের দারিদ্র্য মুক্তি সম্ভব বলে অর্থনীতিবিদরাও এ বিষয়ে এখন একমত।
সমস্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়, জাকাতের টাকায় গরিব-ভিক্ষুক-আশ্রয়হারা মানুষকে পুনর্বাসনের কথা ভাবতে হবে গুরুত্বের সাথে। রাষ্ট্রকেই সব বঞ্চিত অধিকারহারা বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন ও অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।
লেখক : সাংবাদিক