রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগ

ভাসানচর বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলবে নৌবাহিনী

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া

প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে এদেশে আশ্রয় নেওয়া লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে অস’ায়ী ভাবে পুনর্বাসন করতে চায় সরকার। এজন্য দ্রুত এই দুর্গম চরে রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নৌবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে ভাসানচর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে রোহিঙ্গাদের দাবি তাদেরকে দুর্গম চরে না নিয়ে জাতিসংঘের সহায়তায় সরকার মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরে যেতে উদ্যোগ গ্রহণ করুক। যেহেতু সেখানে তাদের সহায় সম্পত্তি রয়েছে। কক্সবাজার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলছেন, বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এক জায়গাতে দীর্ঘস’ায়ী বসবাসের সুযোগ না দিয়ে প্রাথমিকভাবে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পুনর্বাসন করার সরকারের উদ্যোগ রয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ বাস’চ্যুত রোহিঙ্গার মধ্যে অন্ততপক্ষে ১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচরে অস’ায়ী আবাসন গড়ে তুলতে ২০১৭ সালে একনেক বৈঠকে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ভাসানচর ভাঙন প্রতিরোধসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা রয়েছে। সেখানে ১২০টি গুচ্ছগ্রামে ১৪৪০টি ব্যারাক হাউজ এবং ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

ভাসানচরে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের আয়ের উৎস সৃষ্টি করতে ছোট দোকান, বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি গরু মহিষ হাঁস মুরগি পালন, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ চাষ, কুটির শিল্পসহ নানা আত্নকর্মসংস’ান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও মিল্ক ভিটাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারি সংস’ার পাশাপাশি এনজিও সংস’াকে সম্পৃক্ত করা হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস’াপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসক কক্সবাজারকে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স’ানান্তরের এ পরিকল্পনা স’গিত রাখা হলেও গত বছরের আগস্টে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে এদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর ওই প্রকল্পটি আবারো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারের মধ্য সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেওয়ার বাস্তবতায় বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা নিয়ে শুরু হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সরকার প্রথম দফায় ১লাখ ৩ হাজার ২শ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স’ানান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে ২০১২ সালে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক ও সেক্রেটারি মো. নুরের সাথে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স’ানান্তরের বিষয় নিয়ে আলাপ করা হলে তারা জানান, অনেক কষ্ট, ত্যাগ তিতিক্ষা অতিক্রম করে সহায় সম্পত্তি ও স্বজনহারা রোহিঙ্গারা এখানে অনেকটা ভাল আছে। তারা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিকতায় জাতিসংঘ ও বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। যদি প্রত্যাবাসন শুরু হয় তাহলে তারা সহজে নিজ দেশে ফিরে যেতে সক্ষম হবে। এরমধ্যে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স’ানান্তর করলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ে পরিণত হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের স্বদেশে নাগরিক অধিকার নিয়ে ফেরানোর জন্য সরকার আন্তরিক। তাই ভাসানচরে স’ানান্তরের চাইতে রোহিঙ্গাদের সার্বিক বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তদারকি বৃদ্ধির পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প ত্যাগ করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না পড়তে পারে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া দরকার।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার মো. আবুল কালামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের লক্ষ্যে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স’ানান্তরের উদ্যোগ সরকারের রয়েছে। তবে এ উদ্যোগ কবে বাস্তবায়ন হয় তা এখন বলা যাচ্ছে না।